এক বিদেশির চোখে সোনার বাংলার উদ্দীপক স্বপ্ন
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৯
দেশকে লইয়া স্বপ্ন অনেকেই দেখিয়া থাকেন। তবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিবার সামর্থ্য সকলের থাকে না। আবার এই ধরনের স্বপ্ন দেখা যত সহজ, সেই স্বপ্নে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে উজ্জীবিত করিয়া তোলা ঠিক ততটাই কঠিন। অতি বিরল সংখ্যক মানুষই এই অসাধ্য সাধন করিতে পারেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সোনার বাংলার অসাধারণ স্বপ্ন-ছবিটি প্রথম প্রবলভাবে মূর্ত হইয়া উঠিয়াছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে। গানটি শুধু যে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের দুর্লভ মর্যাদা লাভ করিয়াছে তাহাই নহে, একই সাথে কবিগুরুর অঙ্কিত সেই স্বপ্ন-ছবিটি প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে স্থায়ী আসন করিয়া লইয়াছে বহু আগেই। সেই স্বপ্নের পথ ধরিয়াই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশ নামক স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছি—যাহা এই জনপদের শত শত বত্সরের ইতিহাসে অনন্য ঘটনা হিসাবে স্বীকৃত হইয়াছে সর্বমহলে। তবে বঙ্গবন্ধু শুধু এই অর্জনেই তৃপ্ত হন নাই। বন্ধ করেন নাই তাঁহার দিগন্তছোঁয়া স্বপ্নের পাখা। তিনিই প্রথম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত সহায়সম্পদহীন হতদরিদ্র এই দেশটিকে সোনার বাংলায় পরিণত করার স্পর্ধা প্রকাশ করিয়াছিলেন। তখন ইহাকে শুধু যে অসম্ভব স্বপ্ন বলিয়াই মনে হইয়াছিল তাহাই নহে, বরং ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নামের অবজ্ঞাসূচক আখ্যাও জুটিয়াছিল দেশের ললাটে। ইতোমধ্যে আমরা অনেক আগাইয়া গিয়াছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অর্জনও সাধিত হইয়াছে। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে সোনার বাংলার সেই স্বপ্ন যেমন উধাও হইয়া গিয়াছে, তেমনি নিজেদের সকল ব্যাপারে সার্বক্ষণিক ও সর্বব্যাপী এক হতাশা ও নেতিবাচকতাই হইয়া উঠিয়াছে আমাদের নিত্যসঙ্গী। বিস্ময়করভাবে এইক্ষেত্রে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসাবে যেই মানুষটি ক্রমাগতভাবে সকলের সপ্রশংস মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া চলিয়াছেন তিনি কোনো বাঙালি বা বাংলাদেশি নহেন। তিনি আটলান্টিকের ওপারের সাদা চামড়ার একজন মানুষ।
আমেরিকায় জন্ম ও শিক্ষা গ্রহণকারী ষাটোর্ধ্ব বয়সী এই মানুষটির নাম ড্যান মজীনা। পেশায় কূটনীতিক। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসাবে বাংলাদেশে আসিয়াছেন ২০১১ সালের মে মাসে। এই অতি অল্প সময়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে উচ্চ আশাবাদী একজন মানুষ হিসাবে তিনি সুপরিচিত হইয়া উঠিয়াছেন। তিনি অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার কথা বলিয়া আসিতেছেন। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়া আসিতেছেন এই দেশের মানুষের উদ্যম, সৃজনশীলতা ও কর্মোদ্দীপনার। আর ইহা যে কথার কথা মাত্র নহে—অকাট্য যুক্তি এবং অতুলনীয় আন্তরিকতার সহিত তাহাও তিনি প্রমাণ করিয়া চলিয়াছেন। বাংলাদেশ আগামীর ‘এশিয়ান টাইগার’ হইতে প্রস্তুত— এই অভিমত ব্যক্ত করিয়া সমপ্রতি তিনি আবারও বলিয়াছেন যে, দেশটিকে সোনার বাংলা হিসাবে গড়িয়া তোলা অসম্ভব নহে। কারণ বাংলাদেশের সামনে দুর্নীতি প্রতিরোধ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ, জ্বালানি ও শাসন ব্যবস্থার অর্থবহ উন্নয়নসহ যেই চ্যালেঞ্জগুলি রহিয়াছে তাহার প্রত্যেকটিই মোকাবিলা করা সম্ভব বলিয়া তিনি মনে করেন। প্রসঙ্গত তিনি ইহাও স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন যে, বিশ্বের বহু দেশের ক্ষেত্রে এই কথাটি প্রযোজ্য নহে।
একজন বিদেশি কূটনীতিকের পক্ষে যতদূর বলা সম্ভব তিনি তাহা বলিয়াছেন। সর্বোপরি, তাঁহার এই বলা যে বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতাপ্রসূত তাহাতেও সন্দেহের কোন অবকাশ আছে বলিয়া মনে হয় না। এখন ইহাকে গ্রহণ করা না করা একান্তই নীতিনির্ধারকদের নিজস্ব ব্যাপার। তবে বাংলাদেশের সামনে যে অমিত সম্ভাবনার হাতছানি তাহা যেমন দিবালোকের মতো সত্য, তেমনি এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়িত করিবার ক্ষেত্রে বিরাজমান বাধাগুলি দূর করিতে না পারিলে পরিণতি যে মোটেও শুভ হইবে না তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই।