কী হবে মিসরের

মিসর কি আরেকটি পতনের দোরগোড়ায়? কিছুদিনের জন্য শান্ত হতে না হতেই আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মিসর। আরব বসন্তের শীতল হাওয়ার রেশ কেটে গিয়ে কালবৈশাখী হানা দিচ্ছে বারবার। এমন অবস্থায় যে কোনো উপায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনাই দেশটির প্রেসিডেন্টের আসল মাথাব্যথা। গত সপ্তাহে জরুরি অবস্থা জারি করা নিয়েও দেশ এখন দ্বিধাবিভক্ত। মুহাম্মদ মুরসির বিরোধীরা বলে বেড়াচ্ছেন, নিজেকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলে প্রচার করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি বিপ্লবকে হত্যা করেছেন। অন্যদিকে, মুরসিপন্থিরা দাবি করেছেন, একদল সুযোগসন্ধানী মিসরের ক্রমশ মজবুত হতে থাকা অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় রীতিমতো শঙ্কিত। এদেরই মূল উদ্দেশ্য মিসরের শক্ত রাজনৈতিক ভিতকে ক্রমে দুর্বল করে তোলা। এরাই বিক্ষোভ ছড়াচ্ছেন। গত সপ্তায় কারফিউ আর জরুরি অবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সন্ত্রাস যে ভাবে শাসিয়ে গিয়েছে গোটা দেশকেই, তাতে উদ্বিগ্ন সেনাপ্রধান আবদেল ফাতাহ আল-সিসিও। দেশটির জনগণের স্বপ্ন ছিল গণতান্ত্রিক মিসরের। হোসনি মুবারকের পতনের মধ্যদিয়ে মিসর অনেকখানি এগিয়েছিল ওই স্বপ্নের দিকেই। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি বরাবরই বলে আসছেন, গণতন্ত্রের আলোর নিচেই পথ চলতে চান তিনি। তবে আদর্শ নেতা হিসেবে সার্বজনীন মনে ঠাঁই পাননি মুরসি। বরং চিহ্নিত হয়েছেন ‘হালের ফারাও’ হিসেবে। একটি নতুন ডিক্রি জারি করা এবং খসড়া সংবিধান পাস করাতে কম হিমশিম খেতে হয়নি মুরসি সরকারকে। তারপর যোগ হয়েছে নতুন সমস্যা। সমপ্রতি সেনাপ্রধান আবদেল ফাতাহ’র এক বিবৃতি বুঝিয়ে দিচ্ছে কী ভয়াবহ উত্তপ্ত অবস্থা মিসরের। এক বিবৃতিতে তিনি প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ক্রমশ পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। সামপ্রতিক পরিস্থিতি তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এই রক্তপাত ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট মুরসিকে অবিলম্বে কঠোর থেকে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ করতেই হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে অব্যাহত সংঘাত ও দেশ কীভাবে চলবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।’ আসলে মিসরের এই সমস্যা শুধু রাজনৈতিক নয়, নানাবিধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ও এই অস্থিরতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নিজেদের মধ্যে অনৈক্যও এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সমস্যার মূলে যাওয়ার চেষ্টা না করলে সেই দিন দূরে নয়, যে দিন মিসরের কোনও অস্তিত্বই হয়তো থাকবে না। গত বছর পোর্ট সাইদের একটি ফুটবল ম্যাচে দাঙ্গায় বহু ফুটবল অনুরাগী হতাহত হন। অভিযোগের তীর ছিল কায়রোর একটি ফুটবল ক্লাবের বিরুদ্ধে। প্রায় বছরখানেক মামলা চলার পর মিসরের আদালতে গত সপ্তাহে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়। আদালতের সেই রায়কে ঘিরে এ সময়ের যাবতীয় অশান্তির সূত্রপাত। অভিযোগ উঠেছে যে, গত সাত দিনে মোট যে ৪২ জনের (মতান্তরে ৬০ জন) মৃত্যু হয়েছে, নিহতদের অধিকাংশের দেহেই রয়েছে বুলেটের গভীর ক্ষত। প্রশাসনের দাবি, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতেই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু মিছিল চলাকালে বিরোধীরা পুলিশের দিকে যে ভাবে পাথর ছুঁড়তে থাকে, তাতে আত্মরক্ষার তাগিদে বাধ্য হয়েই পুলিশকে গুলি চালাতে হয়। সুয়েজ খাল সংলগ্ন শহর পোর্ট সাইদ, ইসমাইলিয়া ও সুয়েজে দফায় দফায় প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। প্রত্যেকের মুখে ছিল প্রশাসন-বিরোধী স্লোগান। কেন্দ্রীয় স্কোয়ার থেকে বের হয়ে ওই মিছিল ছড়িয়ে পড়ে শহরের নানা প্রান্তে। মুরসি জামানার পতনের সঙ্গে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়। গত শনিবারও মিসরের রাজধানী কায়রোর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বাইরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত একজন নিহত হয়। এদিন কায়রো ছাড়াও মিসরের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিক্ষোভ হয়। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তুলেছে— প্রেসিডেন্ট মুরসি বিপ্লবের আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার তত্পরতায় লিপ্ত রয়েছেন। জানুয়ারির ২৫ তারিখ ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের বিদায়ের তৃতীয় বছর। সেই তাহরির স্কোয়ার, দু’বছর আগে যেখানে হোসনি মোবারকের বিদায়ের আগে ঘরে না ফেরার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ভিড় করেছিল হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষ, শুক্রবার সেখানেই অসংখ্য তরুণ নেমেছেন নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানাতে। তা জানাতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছেন তারা। মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ও তার দল মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে অনেক দিন ধরেই। মুরসি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অন্তত দুটি বড় কারণে রাজপথে নামেন বিরোধী দলের সমর্থকরা। এক ডিক্রির মাধ্যমে মুরসি নিজের এবং তার দলের ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বৈরতন্ত্র কায়েমের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই জারি করা হয়েছে ডিক্রিটি। এ নিয়ে যখন মিসর উত্তপ্ত তখনই মুরসি সরকার নেয় নতুন সংবিধান চূড়ান্ত করার উদ্যোগ। প্রস্তাবিত সংবিধানে সংখ্যালঘু এবং নারীদের অধিকারকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম গুরুত্ব দেয়াসহ বেশ কিছু অভিযোগে বিরোধী দল এবং সংখ্যালঘু সমপ্রদায়গুলো সেই সংবিধান কার্যকর না করার দাবিতে আরো জোর বিক্ষোভ শুরু করে। তারপরও সংসদে উত্থাপন করে সংবিধানটির অনুমোদন নিয়েছেন মুরসি। বিরোধীদের দাবিকে কার্যত আমলে না নিয়ে গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে নতুন সংবিধানকে কার্যকর করার পথে সাংবিধানিক সব বাধাও দূর করে ফেলেছেন। এমন পরিস্থিতিতেই মিসর উদযাপন করছে হোসনি মোবারক বিরোধী আন্দোলনের সূচনার দু’বছর পূর্তি। সরকার বিরোধীরা মনে করছেন দু’বছরে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যগুলোর একটিও পূরণ হয়নি। তাই তাহরির স্কোয়ারে শুক্রবারও দেখা গেছে ‘এই সরকারের পতন চায় জনগণ’ লেখা শত শত ব্যানার। দু’বছর আগে এমন ব্যানারই লেখা হয়েছিল হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে। মিসরের জনগণের জন্য যে খুব ভালো একটি প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থা উপহার দিতে পারছেন না ড. মুরসি, তারই প্রতিফলন বার বার যেন দেখা দিচ্ছে কায়রোর পথে ঘাটে। প্রায়শই তাই জনমানসের স্বপ্নভঙ্গের বেদনার নীল উত্তাপ বের হচ্ছে কায়রোর রাজপথে।