জনপ্রিয় পুস্তক অনুবাদ প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫২
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ করিতে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় গ্রন্থগুলি অন্যান্য ভাষায় এবং একইভাবে অন্যান্য ভাষার জনপ্রিয় পুস্তকসমূহ বাংলায় অনুবাদ করিবার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। শুক্রবার বাংলা একাডেমীর বইমেলা উদ্বোধনকালে তিনি যথার্থই বলিয়াছেন যে, বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলি অন্যান্য ভাষায় এবং অন্যান্য ভাষার গুরুত্বপূর্ণ বইগুলি বাংলা ভাষায় অনুবাদের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হইলে বাংলা ভাষা আরও সমৃদ্ধ হইবে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশের ছাত্র-যুবারা একদিন অকাতরে বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢালিয়া দিয়াছিল। আমাদের সংগ্রামী ছাত্র-যুবাদের সেই আত্মত্যাগ মহিমান্বিত হইয়া বিশ্বময় এ দেশকে গৌরবমন্ডিত করিয়াছে। আর তাহারই সূত্র ধরিয়া জাতিসংঘ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতিও প্রদান করিয়াছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, বাংলাদেশে মাতৃভাষার চর্চা এবং ইহাকে সর্বত্র চালু করার দাবি প্রচন্ডভাবে উপেক্ষিত থাকিয়া গিয়াছে। স্বাধীনতার পর চার চারটি দশক অতিবাহিত হইলেও এ ক্ষেত্রে আমাদের সংশ্লিষ্ট মহলের গড়িমসি কিংবা সদিচ্ছা বা আন্তরিকতার নিদারুণ দুঃখজনক অভাব বায়ান্নর আত্মদানের মহিমাকে খাটো করিয়াছে বৈ কি। বাংলা ভাষার চর্চার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য পুস্তকগুলির বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা আমরা উপলব্ধি করিতে ব্যর্থ হইয়াছি। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তিসমূহ কিংবা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বা পেশাগত জীবনে অতীব প্রয়োজনীয় পুস্তকগুলির বাংলায় অনুবাদ বিষয়েও হতাশাজনকভাবে নির্লিপ্ত থাকিয়াছি। ইহাতে আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রেতো বটেই এমনকি জ্ঞানচর্চা ও পেশাগত উত্কর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা রহিয়া যাইতেছে। অনুবাদকর্মের মাধ্যমে একদিকে তাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপনের মধ্য দিয়া উহার মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং অন্যদিকে বিদেশি পুস্তকের অনুবাদের মাধ্যমে মাতৃভাষায় জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত করার সুযোগ সৃষ্টি করাটা জরুরি।
চীন, জাপান, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমৃদ্ধ দেশ এই জাতীয় অনুবাদ রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় করা হইয়া থাকে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রাংকলিন পাবলিকেশন্স, ইউসিস এবং তদানীন্তন সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনী ইংরেজি ও রুশ ভাষার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের অনুবাদ বাংলার পাঠক সমাজকে উপহার দিয়াছে। তাহাছাড়াও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ভাষাতেও তাহাদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তিসমূহের অনুবাদ দেদার চলিয়াছে। ফলে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতি, মনন এবং ভাবনা ইত্যাদি সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা লাভ যেমন সহজ হইয়াছে তেমনি আবার মানব সমাজের মধ্যকার মৌলিক বিষয়গুলিও অনায়াসে স্থান করিয়া লইয়াছে পাঠক চিত্তে। ফলে আদানে-প্রদানে, গ্রহণে-বর্জনে পরস্পরের সংস্কৃতি সমৃদ্ধতর হইয়াছে আর মানুষে মানুষে প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবিক আবেগ-অনুভূতি গভীরতর হইবার অবকাশ পাইয়াছে।
সাহিত্য ও বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি অনুবাদ কর্মের মাধ্যমে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাঝে পাঠাভ্যাসের ব্যাপারে উত্সাহ জোগানো সম্ভব এবং একই সঙ্গে তাহাদের মাঝে উন্নত-উচ্চকিত মানবিক বোধ জাগাইয়া তোলা সহজতর। অবিশ্যি অনেকেই বর্তমানের প্রযুক্তির এই অবিশ্বাস্য উত্কর্ষের কারণে বই-পুস্তক প্রকাশের বা পাঠের আর তেমন কোন তাত্পর্য থাকিতেছে কিনা উহা লইয়া প্রশ্ন তুলিতে পারেন। কেননা, আমাদের চাহিদা মোতাবেক তথ্য এখন কম্পিউটারের কল্যাণে একেবারেই চোখের উপর সদাবিদ্যমান। কিন্তু এই সত্যকে মানিয়া লইয়াও বলা যায়, বইপুস্তক রচনা এবং অনুবাদ ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তা প্রযুক্তির উত্কর্ষের কারণে ফুরাইয়া গিয়াছে বা ভবিষ্যতে যাইবে এমনটি যাহারা মনে করেন তাহারা মানুষের আত্মিক চাহিদার বিষয়টিকে রীতিমত উপেক্ষা বা অবজ্ঞাই করেন কেবল। পুস্তকের চাহিদা না থাকিলে কেহ মৌলিক রচনা বা অনুবাদকর্ম কোনটিই প্রকাশের ব্যাপারে লগ্নি করিতে রাজি হইবে না ইহা সত্য বটে, কিন্তু তবুও কথা থাকিয়া যায়। উহা এই যে, বই-পুস্তক প্রকাশনায় সবসময় ব্যবসায়িক মানসিকতা খাটে না। বিশেষত শ্রেষ্ঠ বা উল্লেখযোগ্য বইয়ের পাঠক-চাহিদা থাকুক চাই নাই থাকুক, জ্ঞান অন্বেষণে ও সমাজের রুচি ও মানস গঠনে ঐ সব বইয়ের প্রয়োজনীয়তাকে কোনক্রমেই অস্বীকার করা যাইবে না। এমনকি উহা যদি সমাজের অল্পকিছু জ্ঞান অন্বেষু মানুষের চাহিদাই শুধু পূরণ করে, তবুও না।