আলোকপাত

শিশুদের পাঠ্যবহির্ভূত বই পাঠে আগ্রহী করে তুলতে হবে

হালে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা কিছুসংখ্যক উচ্চ মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত্ সুগম করে দিচ্ছে—তাতে হয়তো সন্দেহ নেই; কিন্তু এ শিক্ষা সমাজের মেধাবী শিশুদের তাদের মাতৃভাষায় সাহিত্য পাঠ থেকে যে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে তাও বাস্তব সত্য। এই শিক্ষা ধারার সুদূরপ্রসারী অবাঞ্ছিত ফল হবে সাহিত্যজগতে সুসাহিত্যিকের অভাব। প্রতিভাধর ছাত্র-ছাত্রী এই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও মাতৃভাষার মাধ্যমে পড়াশোনা করার প্রতি অনীহায় তাদের প্রতিভা মুকুলেই দিশাভ্রষ্ট হয়ে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জ্ঞানের প্রসার হয় বই পড়ার মধ্য দিয়েই। অধুনা অধিকাংশ শিশু পাঠ্যপুস্তকের পরিসীমায় তাদের পড়াশোনা সীমিত রাখতেই বেশি আগ্রহী। জ্ঞানার্জন তাদের অনেকেরই উদ্দেশ্য বলে মনে হয় না। গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পাঠ্যপুস্তক ধাতস্থ করে অথবা নোটবই মুখস্থ করে বেশি মার্কস পেয়ে ভালো ফল করা ও বিদ্যায়তন থেকে বেরিয়ে এসে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অন্বেষণ—এই তাদের প্রত্যাশা ও চরম লক্ষ্য। আজকাল ব্যাঙ-এর ছাতার মতো যত্রতত্র গজিয়ে উঠা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলোর মধ্যে কতকগুলো লব্ধপ্রতিষ্ঠ বিদ্যালয় ছাড়া বাকি সব স্কুল না যথাযথভাবে ইংরেজি শেখাচ্ছে, না ভালো করে বাংলা শেখাচ্ছে। ফলে এই সমস্ত বিদ্যার্থী তাদের ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত ইংরেজি বই অথবা মাতৃভাষার বই পাঠে সহজ ও সক্ষম হচ্ছে না। রয়েছে স্যাটেলাইট ও কেবল টিভির আকর্ষণ। আজকাল টিভি কালচারের যুগে একশ্রেণির শিশু রয়েছে যারা টিভি অ্যাডিক্ট হয়ে যাচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলো মেটাচ্ছে তাদের সব চাহিদা। খেলাধুলাপ্রেমীরা তাদের পছন্দের টিমগুলোর খেলা দেখে তৃপ্তিলাভ করছে। তাছাড়া মনোরঞ্জনের সব ব্যবস্থা তো টিভিতে রয়েছেই। এভাবে শিশুদের যা কিছু জানার টিভিই জোগান দিচ্ছে। তাদের বিরল অবসর সময় তারা এভাবেই কাটাচ্ছে। তারা জানে না অনুসন্ধিত্সু মনের চাহিদা বইও পূরণ করতে সক্ষম। ভাবতেও পারে না তাদের জানা-শোনার জগেক বই পাঠ আরও বিস্তৃত করতে পারে। বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা তাদের উপলব্ধিতে নেই। অভ্যাসও গড়ে উঠেনি। বই পড়ার যে আনন্দ সেটার আস্বাদনও তারা পায়নি। বইয়ের নীরব ভাষা যে তাদের মন ও হূদয়কে স্পন্দিত করতে পারে তাও তাদের অজানা। এরই নীরব প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে বই পড়ার শিশু-পাঠক সংখ্যা হ্রাস। এগুলোর সঙ্গে অধুনা সংযোজিত হয়েছে কম্পিউটার। কম্পিউটার যা এক সময় উচ্চ-মধ্যবিত্তদের বাড়িতেই শোভা পেত, হালে বিদ্যার্থীদের ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে। অনেক অভিভাবক রয়েছেন যারা শিশুদের হাতে এই যন্ত্রটি তুলে দিচ্ছেন। বই পড়ার চেয়ে কম্পিউটারের থ্রিল তাদের কাছে অনেক বেশি। বস্তুত কম্পিউটার ও টিভি কালচার বই পড়া কালচারের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছে। উল্লেখিত অভিভাবকদের উচ্চাশা শিশুদের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে একেবারে শৈশব থেকেই। তাদের কাছে চিত্ত হতে বিত্ত অনেক বড়। বিত্তার্জন থেকে বর্তমান জড়বাদী সমাজজীবনে অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে শিশুরা তা শৈশবেই অভিভাবকদের কাছ থেকে পাঠ নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠছে। ভাবছে অধিক পড়াশোনা না করে যথাযথ পাঠ্যবইনির্ভর পাঠই অধিক ফলপ্রসূ। উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ ও সমাজে উঁচু স্তরে প্রতিষ্ঠা লাভই তো বড় কথা। এভাবেই শিক্ষার্থীরা নিজেরা বই পড়া থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। তাতে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য যে মনের বিকাশ, পাঠ্যপুঁথিগত বিদ্যা থেকে সেটা হচ্ছে না। শিক্ষক, অভিভাবক ও শিশুরা সবাই সমাজে বাস করেন। তাই সমাজের প্রতিও তাদের দায়-দায়িত্ব রয়েছে। তাদের বুঝতে হবে ও শিশুদের বোঝাতে হবে যে, বিত্ত কখনো চিত্ত থেকে বড় হতে পারে না। বিত্তার্জন কখনো হবে না জ্ঞানার্জনের বিকল্প। ব্যক্তিগত জীবনে বিত্তের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। জীবনে প্রতিষ্ঠাও সবাইর কাম্য এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য প্রচেষ্টা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাও জরুরি। কিন্তু তাই বলে জ্ঞান আহরণে উপেক্ষা করা চলে না। পড়াশোনার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন হয় এবং সেই জ্ঞান আলোকিত করে অন্তরকে। সেই জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করে সমাজকে উদ্ধার করতে হবে আমাদের বর্তমান অ্যকুইজিটিভ সমাজের আদর্শ ও প্রয়োগ থেকে। যারা ভাবেন পৃথিবীর সবকিছু অর্থই নির্ধারিত করে তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। শুধু অর্থনীতির উপর যদি সমাজ স্থাপিত হয় তাহলে অর্থনৈতিক আদর্শেই সমাজ পরিচালিত হবে। এই আদর্শে পরিপুষ্ট জীবনে অন্তহীন সুযোগ-সুবিধা এনে দিলেও দেখা দেবে জীবনযন্ত্রণা। মানব সম্পর্ক সেখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। জন্ম নেবে শুধু আত্মসেবার মানসিকতা ও দ্বন্দ্ব-দ্বেষ, হবে একে অন্যের শিকার, চলবে শোষণ। এক একটি মানুষ পরিণত হবে এক একটি দ্বীপে। তাই তো স্বার্থ অন্ধকার সমাজ চলেছে মাত্স্যন্যায়। সে অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হবে সমাজে জ্ঞানের বিস্তার এবং সেটা বই পড়ার মাধ্যমেই সম্ভব। তাই শিশুদের বই পড়তে প্রত্যুত্সাহ দিতে হবে। অর্থকরী বিদ্যায় অর্থ ঠিকই আহরিত হবে, সমৃদ্ধিও হয়তো আসবে; কিন্তু তমসাচ্ছন্ন হূদয়ে আসবে না সুখ ও শান্তি। আমাদের ভুললে চলবে না—সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেক আমরা পরের তরে। বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে গড়তে হবে হূদ্যতা। এই সুনিবিড় পারস্পরিক সম্পর্ক পুষ্পিত হোক—এই হবে আমাদের সুরভিত প্রত্যাশা। লেখক:সাংবাদিক