এল ক্লাসিকো দর্শন
ন্যু ক্যাম্পেও ‘ব্ল্যাকে’ টিকিট মেলে
সমীর কুমার দে, বার্সেলোনা (স্পেন) থেকে
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৩
কালোবাজারে টিকিট কেনার ব্যাপারে আমাদের দেশের ফুটবল অনুরাগীরা এক সময় অভ্যস্ত ছিল। তাই বলে ন্যু ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত এল ক্লাসিকো লড়াইয়েও ‘ব্ল্যাকে’ টিকিট মিলবে? বাস্তবে তাই হয়েছিল গত মঙ্গলবার রাতে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যকার খেলাটিতে। বাংলাদেশ থেকে এসে এরকম একটা ফুটবল ম্যাচ দেখতে চাইলেও জানা গেল আগেভাগেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তাছাড়া এই বার্সেলোনাতেই চলছে মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস, যাতে যোগ দিয়েছেন ১২৫টি দেশের ৭৫ হাজার অতিথি। তাই এখানে আসা অতিথিরাও এল ক্লাসিকো দেখার একটা সুযোগ নিতে চেষ্টা চালান। জানা গেল, খেলাটির টিকিট নেই চারদিন আগে থেকেই। তারপরও খোঁজ নিয়ে দেখা গেল কোথাও বিক্রি হচ্ছে না টিকিট। ১১১টি কাউন্টারের সব বন্ধ এবং কেবল আগেভাগে টিকিট ক্রয়কারীরাই সারিবদ্ধভাবে ভেতরে ঢুকছেন। সঙ্গে থাকা ডেইলি স্টারের রিপোর্টার ফজলুর রহমান বেশ হতাশ। ন্যু ক্যাম্পে বসে বার্সা-রিয়াল ম্যাচ দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে এমন কথা দেশ থেকে আসা সহকর্মীরা কেউই বিশ্বাস করতে চাননি। তারপরও ফজলু ছিল আত্মবিশ্বাসী। তাই ওকে নিয়েই মাঠে যাওয়া।
হঠাত্ করেই ভেতর থেকে খেলা শুরুর বাঁশি বাজালেন রেফারি। বাইরে তখনও অনেক মানুষ। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। স্টেডিয়ামে বসে বার্সা-রিয়াল ম্যাচ দেখার সুযোগ মনে হয় মিললো না। পাবে বসে খেলা দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় এক স্প্যানিশ এসে আধো আধো ইংরেজিতে বললো, তোমরা দু’জন খেলা দেখবে নাকি। বললাম হ্যাঁ। তখন আগন্তুক জানালো, কোন টিকিট দেয়ার পরিবর্তে তিনি কার্ড দিয়ে আমাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দেবেন। এজন্য প্রত্যেককে ২০০ ইউরো করে দিতে হবে। আর আসন পছন্দ হলেই কেবল সে অর্থ নেবে। তার কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। কারণ এখানেও কি ‘ব্ল্যাকে’ খেলা দেখা যায়? আর এরকম একটা ম্যাচ দেখতে তো ২০০ কেন, ৫০০ ইউরো দিয়েও ভেতরে ঢুকতে প্রস্তুত আমরা। শেষ পর্যন্ত সাহস করে দু’জনেই ওর সঙ্গে ঢুকে পড়লাম। মাঠের মাঝখানে সিট, তাও আবার খুব কাছে। পরে জানলাম ওই স্প্যানিশ বার্সা সমর্থকগোষ্ঠীর সদস্য। ওরা বেশ কিছু ফ্রি টিকিট পায়। কিন্তু এখানে ‘ব্ল্যাকে’ টিকিট নেয়া লোকের সংখ্যা খুব বেশি না হওয়ায় ওদের কার্ডগুলো থেকে যায়। সেদিনের খেলার ফল তো এখন সবার জানা। তাই রিয়াল মাদ্রিদের কাছে স্বাগতিক বার্সেলোনার হারের এই ম্যাচে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। সেটি হলো দ্বিতীয়ার্ধে ১২ মিনিটের মধ্যে রোনালদো দ্বিতীয় গোল করলে ধারে-কাছেই বসা স্প্যানিশ এক দর্শক খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং নিজের মাপলারে আগুন ধরিয়ে নিচে ফেলে দেন। মুহূর্তের মধ্যেই অর্ধশত পুলিশ এসে ঘিরে ফেলল গ্যালারির ওই অংশটুকু। আমরা তো তখন ভয়েই শেষ। কারণ পকেটে টিকিট নেই। সঙ্গে পাসপোর্টও আনিনি। এখন কি হবে? ভাগ্য ভালো পুলিশ কিছুই বলেনি। এর মধ্যেই আরেক গোল। বোর্ডে তখন দেখাচ্ছে বার্সা ০ রিয়াল ৩। হতাশ বার্সা সমর্থকরা মাঠ ছাড়তে শুরু করলো। কিন্তু কেউই মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তাদের গালি দিচ্ছে না। শুধুমাত্র কিছুক্ষণ পরপর শ্লোগান উঠছে বার্সা বার্সা বলে। পাশের ওই উত্তেজিত দর্শকের কাছে প্রশ্ন ছিল— দল হেরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তারপরও তোমরা তাদের গালি দিচ্ছ না কেন? তখন সে বললো— তাদের এই আশার জায়গা তৈরি করে দিয়েছে এই প্লেয়াররাই। তাদের কেন গালি দেব? আজ পারেনি আরেকদিন পারবে? ওই দর্শক নিজের নাম শেষ পর্যন্ত বলেননি। শুধু বললেন, পুওল, পিকে, জাভি, ভলদেস, জর্দি আলবা, পেড্রো এরা সবাই বার্সা শহরের ছেলে। আর ইনিয়েস্তার বাড়ি মূল শহরের উপকণ্ঠে। মেসিকেও তারা ঘরের ছেলে বলেই মনে করেন। এই শহরেই বড় হয়েছে মেসি। এদের নিয়েই কাতালানদের গর্ব। এরা পরাজিত হলে-বিশেষ করে রিয়ালের কাছে হারলে খুবই কষ্ট পান, কিন্তু খেলোয়াড়দের কষ্ট দেয়ার মতো কথা তারা বলতে চান না। যদিও জর্দি আলবা সেদিন এক গোল করে ব্যবধান কিছুটা হলেও কমাতে পেরেছিলেন।