রা জ নী তি
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নো রিটার্ন পয়েন্টের রাজনীতি
অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৪
বর্তমানে দেশে যে সংকট চলছে বিগত ৪১ বছরেও আর কখনো এ ধরনের সংকট দেখা যায়নি। এত লাশ, খুনোখুনি আর সংঘর্ষ বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। বাংলাদেশের এ সংকট তাত্ত্বিকভাবে আমরা রাজনৈতিক উন্নয়নের সংকট হিসেবে অভিহিত করতে পারি। রাজনৈতি উন্নয়নের সংকট নিয়ে যে সকল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চিন্তা-ভাবনা করেছেন তাদের মধ্যে জিএ অ্যালমন্ড, ডব্লিউ র্যাস্টো, লুসিয়ান ডব্লিউ পাই, লিওনার্দো বাইন্ডার, সিডনি ভার্বা উল্লেখযোগ্য। অ্যালমন্ড রাজনৈতিক সংকটগুলোকে ‘চ্যালেঞ্জ’ আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে ‘চ্যালেঞ্জ’গুলো হলো-(১) জাতি গঠন (২) রাষ্ট্র গঠন (৩) রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং (৪) বণ্টন। লুসিয়ান ডব্লিউ পাই রাজনৈতিক উন্নয়নের সংকটগুলোকে ‘সংকট’ হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। তিনি রাজনৈতিক উন্নয়নের সংকটসমূহকে ছয়টি ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো-(১) একাত্মতার সংকট (২) বৈধতার সংকট (৩) অনুপ্রবেশের সংকট (৪) অংশগ্রহণের সংকট (৫) সংহতির সংকট এবং (৬) বণ্টন সংকট।
উপরোক্ত সংকটগুলোর কোন না কোনটি বাংলাদেশের চলমান বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে যে সংকট চলছে সে সংকটকে রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘রাজনৈতিক উন্নয়নের সংকট’ হিসেবে আমরা অভিহিত করতে পারি। রাজনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি আজ ‘নো রিটার্ন পয়েন্টে’ চলে যাচ্ছে। সেজন্য আমরা দেখলাম বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ১ মার্চ এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সারাদেশে পুলিশ কর্তৃক নির্বিচারে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে মানুষ হত্যার নিন্দা জানিয়ে বললেন, “সরকার যে ভয়াবহ অবস্থার দিকে দেশকে ঠেলে দিচ্ছে, গণহত্যায় মেতে উঠেছে, তাতে দেশের দায়িত্বশীল সর্ববৃহত্ রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা নিশ্চুপ দর্শক হয়ে থাকতে পারি না। দেশবাসীকে এই সংকটের মুর্হূতে রাজপথে নেমে আসার ডাক দিচ্ছি”। বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমান সরকার ফ্যাসিবাদী কায়দায় ন্যায়বিচারের পরিবেশ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার উপরোক্ত বক্তব্যসমূহের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক সংকটের একটি সার্বিক চিত্রই সচেতন দেশবাসীর নিকট উন্মোচিত হয়েছে।
অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ বর্তমান সংকটের জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীকে দায়ী করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে চলেছেন এবং বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি কঠোর হাতে দমনের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ৭ মার্চের এক অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে নিয়ে যে ধরনের ভাষা প্রয়োগ করেছেন তাতে দেশে চলমান রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত হিসেবে অভিহিত করেছে সচেতন দেশবাসী।
গত কয়েকদিন যাবত্ দেশে যা ঘটছে তাতে মনে হচ্ছে দেশ ফ্যাসিবাদের দ্বারা আক্রান্ত। দেশের ইতিহাসে একদিনে এত লোক মারা যায়নি। সামপ্রতিককালে কোনো যুদ্ধেও এত লোক নিহত হয়নি। গণতান্ত্রিক শাসনামলে প্রধান বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে যেভাবে পুলিশ নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করছে তা গণতান্ত্রিক সমাজে নজিরবিহীন। এ ধরনের ঘটনা অতীতের বাকশালী শাসনামলকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে পুলিশ বাহিনী অতীতের রক্ষীবাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। রক্ষীবাহিনী যেমন ৭২-৭৫ সালে বিরোধী দলের সরকারবিরোধী আন্দোলন দমানোর জন্য প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করতো, তেমনি পুলিশ বাহিনীও একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সেজন্য বেগম খালেদা জিয়া পুলিশ, র্যাব ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে নির্বিচারে জনগণের ওপর গুলি ছোঁড়া বন্ধের আহবান জানিয়ে বলেছেন, গণবিচ্ছিন্ন ব্যর্থ সরকারের অন্যায় হুকুমে আপনারা গণহত্যাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন না।
বর্তমানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সরকার অব্যাহতভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হলেও সরকারের গুম-হত্যা, দুর্নীতি-দুঃশাসন, মামলা-হামলার প্রতিবাদকারী বিরোধী দলগুলোকে সরকার এই বিচারের প্রতিপক্ষ হিসাবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থেকেছে। এই বিচার মুক্ত, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হওয়ার সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরামর্শ অগ্রাহ্য করে এবং ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারকদের একটি গোষ্ঠীর দাবি বিবেচনায় রেখে রায় প্রদানের আহ্বান জানিয়ে সরকার নিজেই প্রকৃতপক্ষে বিচারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। অপরদিকে সরকার অব্যাহতভাবে অহিংস প্রতিবাদে বাধা দিয়ে এবং রাজনীতিবিদসহ ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে জেল-জুলুমের মাধ্যমে দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েকদিনে সংঘটিত হয়েছে নজিরবিহীন এই হত্যাকাণ্ড, যা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অগ্রহণযোগ্য।
এ সময় নারী, শিশু, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ আহত হয়েছেন অসংখ্য নিরীহ প্রতিবাদকারী। আক্রান্ত হয়েছে মন্দির, মসজিদ, প্যাগোডাসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। দেশের জনগণ এ সকল ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং সকল হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জনগণ মনে করছে সরকার নিজেদের পাহাড়সম ব্যর্থতা আড়াল করতে এবং বিরোধী দলের গণতন্ত্র রক্ষার (!) চলমান আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতেই এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এর সর্বশেষ প্রমাণ হচ্ছে সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আহূত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলে বিনা উস্কানিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলা এবং পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা। এছাড়াও গত ৬ মার্চ বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশে বিনা উস্কানিতে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে নেতাকর্মীদের আহত করে সমাবেশ ভণ্ডুল করে দেয়। এছাড়াও সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেয়ার জন্য খালেদা জিয়াকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক সংকটের পরিচয় বহন করে।
সরকারবিরোধী দলের প্রতি কঠোর অবস্থান, নির্বিচারে হত্যা, গ্রেফতার এবং প্রতিক্রিয়ায় দেশব্যাপী ঘনঘন হরতালের ফলে আমদানি-রফতানি থেকে শুরু করে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একদিকে সরকার সমর্থকদের রাজপথ দখলে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে সহিংস জামায়াত-শিবিরের মারমুখী অবস্থান, পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে যা ঘটছে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত বলে মনে হচ্ছে। অনেকে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের ফলে ১/১১-এর চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের বিষয়ে তাদের উদ্বেগের কথা বিবৃতির মাধ্যমে সরকারকে জানিয়েছেন। বাংলাদেশে ৪৩টি দেশের কূটনীতিকরাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট তাদের উদ্বেগের বিষয়টি অবহিত করে সংলাপের মাধ্যমে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধানের কথা তুলে ধরেছেন!!!
বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের ডামাডোলে আগামী নির্বাচন কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে সে বিষয়টি পেছনে চলে গেছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দ!াবির আন্দোলনকে সুকৌশলে পেছনে ফেলার জন্য নিজেরাই এই সংকট সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলও বিষয়টি উপলব্ধি করে বর্তমানে কঠোর অবস্থানে চলে গেছে। প্রধান বিরোধী দলের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওযায় তারা এখন সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেজন্য বিরোধী দল সারাদেশে ‘গণতন্ত্র রক্ষামঞ্চ’ গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছে। তাহলে এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে এখনো সময় আছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সকরকে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিরোধী দলের চেয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিরোধী দলকে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছেন; কিন্তু সে প্রস্তাবও বিরোধী দল আস্থায় নিতে পারছে না। বিরোধী দল বলছে, কেবলমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলেই আলোচনা হতে পারে। কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে সবকিছু না করে বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এটা না করলে দেশ ও জাতি আবারও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে, যাতে লাভবান হবে সুযোগের সন্ধানে বসে থাকা তৃতীয় পক্ষ।
লেখক :সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সাভার, ঢাকা।