‘আমি বিশ্বাস করি না আশরাফুল এসব বলেছে’
প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৩, ২২:১২
প্রচণ্ড রোদে তখন চরাচর পুড়ে যাওয়ার অবস্থা। ধানমণ্ডির চার নম্বর স্টেডিয়ামে অনানুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন শেষ করে খালেদ মাসুদ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। হঠাত্ এগিয়ে এলেন ক্রিকেট অঙ্গনের দারুণ পরিচিত মুখ, ‘ফা’ ডাক নামের প্রায় বাক-প্রতিবন্ধী এক ক্রিকেটকর্মী। কাছে এসে ঝট করে পাইলটকে জড়িয়ে ধরলেন। আধো আধো শব্দে কান্না জড়ানো গলায় ফা বললেন, ‘পাইলট, তুমি তো ক্যাপ্টেন। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।’
পাইলটও আবেগী হয়ে পড়লেন। নিজেকে সামলে শুধু বললেন—বিশ্বাস রাখো।
এমনিতে তো খালেদ মাসুদ পাইলটের ক্যারিয়ার বলে, তাকে পুরো বাংলাদেশ সবসময়ই ‘ফা’-এর মতোই বিশ্বাস করে এসেছে। কিন্তু আজ সেই বিশ্বাসের কথাটা অনেকের মুখ ফুটে বলা লাগছে। কারণ, অবিশ্বাসও তৈরি হয়ে গেছে দেশজুড়ে। দেশজুড়ে আসলে তৈরি হয়েছে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের এক দোলাচল।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসটা যাদের হাত ধরে শক্ত হয়েছে, সেই খালেদ মাসুদ পাইলট, খালেদ মাহমুদ সুজন, মোহাম্মদ রফিক এবং মোহাম্মদ আশরাফুল এখন নাকি স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত! বাংলাদেশের এসব স্মরণীয় ক্রিকেটার যে অভিযুক্ত, এটাই এখনও প্রমাণিত নয়। এখনও আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিট (আকসু) থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট আসেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছে। ফলে এদের বিরুদ্ধে অভিযোগটা এখনও ‘শোনা কথা’র চেয়ে বেশি কিছু নয়।
কিন্তু ব্যাপারটাকে ‘শোনা কথা’ বলে চুপ থাকতে পারছেন না এই সাবেক-বর্তমানরা। কারণ, তাদের নাম এসেছে পত্রিকায়, ছবি ছাপা হয়েছে; একরকম প্রশ্ন উঠে গেছে তাদের নিয়ে। এই প্রশ্ন ওঠায় যারপরনাই বিস্মিত পাইলট। কাল ধানমন্ডিতে অনানুষ্ঠানিক এই সংবাদ সম্মেলনে বারবার সেই বিস্ময়ের কথা বললেন পাইলট, ‘আমি তো খুবই অবাক। আমার এত্তোবড় একটা ছবি ছাপানো হয়েছে; মনে হয়, কি যেন বিশাল অন্যায় করেছি। অথচ রিপোর্টে কী আছে? আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমি আশরাফুলকে কার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। এর আগেও আমার সম্পর্কে কিছু নেই, পরেও নেই। এইটুকু তথ্যের ওপর ভর করে এতো বড় একটা ঘটনা! আমি কিছু করলে তার ধারাবাহিকতা থাকবে না? আমি অন্যকে পরিচয় করিয়েই চুপ থাকব? আমি ওই কথিত সময়ের পরেও তিন বছর ক্রিকেট খেলেছি। উইকেট কিপিং বা ব্যাটিংয়ে আমি কোনো অন্যায় করেছি? করলে রিপোর্টে তার উল্লেখ কই?’
রিপোর্টের এসব মৌলিক ব্যাপার নিয়ে খালেদ মাসুদের অজস্র প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ওঠা ওই ‘অভিযোগ’-এর জবাবও পরিষ্কার করে দিলেন মাসুদ। তিনি আসলে অভিযোগটাই ‘হাস্যকর’ বলে মনে করছেন। আশরাফুলকে ‘বুকি’র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার অভিযোগ ছিল তার নামে। সেটার ব্যাপারেই যুক্তি দিয়েই মাসুদ বললেন, ‘এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ। পরিচয় তো করাতেই পারি? আমি কি করে জানবো, কে বুকি? বুকি তো কারো শরীরে লেখা থাকে না। দেশে-বিদেশে আমরা ক্রিকেট খেলে বেড়াই। হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। এর মধ্যে কেউ আশরাফুল বা কারো সঙ্গে পরিচিত হতে চাইতে পারে বা এমনিতেই মুখোমুখি হলে হাত মিলিয়ে দিলাম; এমন তো প্রতিনিয়তই হয়। এই পরিচয়ের পর আপনি তার সঙ্গে কী করলেন, সে দায় তো আপনার। আমি যদি তাকে বলতাম যে, এই হল বুকি, তুমি এর সঙ্গে অমুক কাজটা করো; তাহলে সেটা অপরাধ হত।’
পাইলট অবশ্য এটাই বিশ্বাস করেন না যে, আশরাফুল তার নামে এমন অভিযোগ করতে পারে। তার অনুমান খুব সোজা, ‘আমি বিশ্বাস করি না, আকসুর কাছে বা কোথাও আশরাফুল এসব পুরোপুরি মিথ্যা কথাবার্তা বলেছে। আমার ধারণা সে কোনোভাবে ফাঁদে পড়েছে। যদি এসব বলেও থাকে ফাঁদে পড়ে বলেছে।’
এরপর পাইলট পর্যায়ক্রমে তার বিরুদ্ধে ‘পরোক্ষ’ একটা অভিযোগও খণ্ডালেন। বলা হচ্ছিল, ২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে নিজেদের শততম ম্যাচে আশরাফুল স্পট ফিক্সিং করেছিলেন পাইলটের পরিচয় করিয়ে দেয়া বুকির মাধ্যমে। এখানে ফিক্সিংয়ের ধরনটা অবিশ্বাস্য বলেই বললেন পাইলট, ‘বলা হয়েছে আশরাফুল নাকি প্রথম ১৫ ওভারে কমপক্ষে ৬০ রান করার নিশ্চয়তা দিয়েছিল? তখনকার ভারতের বোলিংয়ের বিপক্ষে তখনকার বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান এই নিশ্চয়তা দিয়ে মাঠে নামতে পারত? এরকম ফিক্সিং হলে তো বোলারদের তরফে হতে হবে। আচ্ছা, এরপর ব্যাটসম্যানরাও যদি জড়িত থাকে; তাহলে আশরাফুল কী করে এই নিশ্চয়তা দেয়? সে ব্যাট করে চার নম্বরে। তার পক্ষে এই দায়িত্ব নেয়া সম্ভবই না। সে ক্ষেত্রে টপ অর্ডারের বাকী তিন জনকেও নিশ্চয়ই কন্টাক্ট করতে হবে!’
এসব যুক্তি দেয়ার পাশাপাশি পরিষ্কার করে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করলেন এবং ঘটনার পুরো তদন্ত আশা করলেন, ‘আমাদের ক্রিকেটারদের অভিভাবক বিসিবি। আমি আশা করবো, তারা সব ঘটনা তদন্ত করবেন। আমি এই অপমানের বোঝা কাঁধে নিয়ে চলতে চাই না।’
সেটা বাংলাদেশও চায় না।