হায় আশরাফুল!

হাবিবুল বাশার সুমন ব্যাটসম্যান-অধিনায়ক হিসেবে যেমন খ্যাতনামা ছিলেন; রসিক মানুষ হিসেবেও তার পরিচিতি নিতান্ত কম নয়। যেকোনো বিষয়েই ছোট ছোট মজার মন্তব্য করে হাসতে ও হাসাতে তার জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু সেই হাবিবুল যেন হাসতে ভুলে গেলেন; ভুলে গেলেন কথা বলতেও। ফোন পেয়ে অনেকটা সময় চুপ করে থেকে শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন—আশরাফুল! পুরো বাংলাদেশের এখন এই হাবিবুল বাশারের মতো অবস্থা। পুরো বাংলাদেশই পারলে চিত্কার করে বলে—আশরাফুল, দাউ টু; তুমিও আশরাফুল! এখন বাংলাদেশ অন্তত ওয়ানডে ক্রিকেটে বেশ ভালো একটা শক্তিধর দল। কিন্তু বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ‘জায়ান্ট কিলার’ দল হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন এই মোহাম্মদ আশরাফুল। বাংলাদেশের প্রথম সত্যিকারের বড় তারকা ছিলেন এই আশরাফুল। আজ বাংলাদেশের প্রথম ‘পাপী’ ক্রিকেটার হিসেবে আত্মস্বীকৃতি দিলেন সেই আশরাফুল! ২০০১ সালে কলম্বোতে আশরাফুলের যখন অভিষেক হয়েছিল তখন হয়তো তিনিও কল্পনা করতে পারেননি ক্যারিয়ারটা তার এরকম আলোচনাময় হয়ে উঠবে। ১৬ বয়সে টেস্ট অভিষেকেই সেঞ্চুরি করে প্রথম আলোচনায় এসেছিলেন। বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় বড় বড় করে হেডিং ছাপা হয়েছিল—আশার ফুল! সুনীল গাভাস্কার, ইমরান খান থেকে শুরু করে শচীন টেন্ডুলকার পর্যন্ত নাম লিখিয়েছিলেন ‘আশরাফুল-ভক্ত’দের তালিকায়! আশরাফুলকে উদাহরণ মেনে সেমিনারে ক্রিকেট প্রতিভা নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন হর্ষ ভোগলে! এই যে উড়ন্ত সূচনা এটা আশরাফুল ধরে রাখতে পারেননি। আবার কখনোই ফুরিয়েও যাননি। আশরাফুলের এটাই ছিল ট্রেডমার্ক। দিনের পর দিন তিনি লোকদের আশায় রাখবেন এবং হতাশ করবেন। আবার যেদিন কেউ তাকে নিয়ে কিছু আশা করবে না; সেদিন আশরাফুল অতিমানবিক এক ইনিংস খেলবেন—এই যেন আশরাফুল। সেই যে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো সেঞ্চুরি, ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রামে ১৫৮ রানের টেস্ট ইনিংস, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নটিংহামে ৯৮ রানের অভিনব ইনিংস, গায়ানায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো ৮৭ রানের ইনিংস; এরকম সোনায় মোড়ানো বাঁধিয়ে রাখার মতো ইনিংস আশরাফুলের ঢের আছে। ক্যারিয়ারে ৬১টি টেস্ট খেলে ২৭৩৭ রান, ১৭৭টি ওয়ানডে খেলে ৩৪৬৮ রান এবং ২৩টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৪৫০ রান করেছেন। তিন ধরনের ক্রিকেটে যথাক্রমে ২১, ১৮ ও ৮টি উইকেট নিয়েছেন আশরাফুল। কিন্তু আশরাফুল শুধু এই ইনিংসগুলো খেলা তারকা নন, তাকে শুধু এই পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যাবে না। ওই যে, তার সঙ্গে আসলে দর্শকের সম্পর্ক ছিল ভালোবাসা-অভিমান মেশানো। আশরাফুল নিজেই বিসিবি অফিসে বসে একদিন বলছিলেন, ‘আমি বাদ পড়লে লোকে আমার পক্ষে চিত্কার করে। দলে ঢুকলে আমার বিপক্ষে চিত্কার করে।’ কেন এমন করে? কারণ ওই যে চরম অধারাবাহিকতা। আশরাফুল বিষয়ে এর আগ পর্যন্ত যাবতীয় লেখার অন্যতম বিষয়ই ছিল এই অধারাবাহিকতা। কিছুতেই যেন পরপর চারটে ইনিংস ভালো খেলবেন না বলে একটা প্রতিজ্ঞা ছিল। তারপরও আশরাফুলকে মানুষ ছুঁড়ে ফেলতে পারতো না আরেকটা ম্যাজিকের আশায়। সর্বশেষ গলে ১৯০ রানের একটা ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন। তারপর বেশ কয়েকটা ইনিংস চুপ করেছিলেন। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম আরেকটা আশরাফুল-ম্যাজিক দেখার জন্য। এ কী ম্যাজিক দেখালেন আশরাফুল! বিপিএল কেলেঙ্কারিতে আশরাফুলের নাম যখন এলো তখনো আসলে লোকে বিশ্বাস করতে পারেনি। এমনকি তিনি আকসুর কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে যখন খবর এলো তখনো লোকে বিশ্বাস করতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে রোজ কাতারে কাতারে প্রার্থনা দেখা যেত—খবরগুলো যেন ভুল হয়। আশরাফুল নিজেই পানি ঢেলে দিলেন সব প্রার্থনার গোড়ায়। আশরাফুল নিজেই জানালেন, পাপ করেছেন তিনি। আশরাফুল নিজেই বুঝিয়ে দিলেন, সত্যিই ক্রিকেটে আর বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। ঠিক এই সময় হ্যানসি ক্রনিয়ে আর মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের স্মৃতি ফিরে আসে। ২০০০ সালে ক্রিকেটের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দুজন মানুষ নিজমুখে স্বীকার করেছিলেন, তারা পাপ করেছেন। সারাবিশ্ব সেদিন একবার বিশ্বাস হারিয়েছিল। বাংলাদেশের সে সময় সেই শোকে পড়তে হয়নি। এবার বাংলাদেশ তার আদরের ধন আশরাফুলকে দিয়ে বিশ্বাস হারালো। এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামনে চ্যালেঞ্জ, কী করে বিশ্বাস ফেরাবেন তারা! এক নজরে মোহাম্মদ আশরাফুল পুরো নাম : মোহাম্মদ আশরাফুল জম্ম : ৭ জুলাই,১৯৮৪,ঢাকা ব্যাটিং : ডান-হাতি ব্যাটসম্যান বোলিং : ডান-হাতি স্পিনার দল : বাংলাদেশ জাতীয় দল, এশিয়া একাদশ বাংলাদেশ এ, সেন্ট্রাল জোন (বাংলাদেশ), ঢাকা বিভাগ, ঢাকা গ্লাডিয়েটর্স, ঢাকা মেট্ট্রো, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। ক্যারিয়ার টেস্ট ম্যাচ ইনিংস রান সর্বোচ্চ গড় ১০০ ৫০ উইকেট ক্যাচ ৬১ ১১৯ ২৭৩৭ ১৯০ ২৪ ৬ ৮ ২১ ২৫ ওয়ানডে ম্যাচ ইনিংস রান সর্বোচ্চ গড় ১০০ ৫০ উইকেট ক্যাচ ১৭৭ ১৬৯ ৩৪৬৮ ১০৯ ২২.২৩ ৩ ২০ ১৮ ৩৫ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ ইনিংস রান সর্বোচ্চ গড় ১০০ ৫০ উইকেট ক্যাচ ২৩ ২৩ ৪৫০ ৬৫ ১৯.৫৬ ০ ২ ৮ ৪ প্রথম শ্রেনী ম্যাচ ইনিংস রান সর্বোচ্চ গড় ১০০ ৫০ উইকেট সেরা ক্যাচ ১৩৩ ২৪৫ ৬৯১৮ ২৬৩ ২৯.০৬ ১৮ ২৮ ১৬১ ৭/৯৯ ৬৭ টেস্ট অভিষেক : শ্রীলংকা-বাংলাদেশ, কলম্বো, ৬-৮ সে্বেম্বর, ০০১ ওয়ানডে অভিষেক : জিম্বাবুয়ে-বাংলাদেশ, বুলাওয়ে, ১১এপ্রিল, ২০০১ টি-টোয়েন্টি অভিষেক : কেনিয়া-বাংলাদেশ, নাইরোবি, ১ সে্বেম্বর, ২০০৭ প্রথম শ্রেনীতে অভিষেক : ২০০০/০১