বিপিএলই এখন বিসিবির প্রধান ‘যন্ত্রণা’!

অভিজ্ঞ সাংবাদিকরাও মনে করতে পারছেন না, শেষ কবে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের কোনো ব্যাপারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এতো সাংবাদিক একত্র হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সংবাদ সম্মেলন কক্ষের ধারণক্ষমতার চেয়ে ঢের বেশি সাংবাদিক কাল প্রবল উত্তেজনা নিয়ে জড়ো হলেন; উদ্দেশ্য আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের (আকসু) রিপোর্ট সম্পর্কে জানা। কিন্তু বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন হতাশ করলেন। জানালেন, আরও একটা জেরা বাকি থাকায় এখনও আকসু তার রিপোর্ট জমা দেয়নি। অন্তত আরও ৫-৬ দিন লাগবে রিপোর্ট হাতে পেতে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) স্পট ফিক্সিং ও ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে রিপোর্ট হাতে পেলেই সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হবে এবং দ্রুততম সময়ে অভিযুক্তদের বিপক্ষে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেই জানালেন বিসিবি সভাপতি। তবে রিপোর্ট না পেলেও কিছু ব্যাপার সভাপতি কাল পরিষ্কার করে দিলেন। প্রথমেই তিনি পরিষ্কার বর্ণনা করলেন, কিভাবে আকসু এই তদন্ত শুরু করল। এরপর নিশ্চিত করলেন যে, আশরাফুল আকসুর কাছে তার নামে অভিযোগ স্বীকার করেছেন। সেই স্বীকৃতির ভিত্তিতে তদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত আশরাফুলকে সব খেলা থেকে দূর রাখারও সিদ্ধান্ত জানানো হল; অবশ্য দিন শেষ হওয়ার আগে আশরাফুল নিজে সংবাদ মাধ্যমের কাছেও সব অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে জাতির কাছে ক্ষমাও চাইলেন। এসবের পাশাপাশি পাপন নিশ্চিত করলেন, আকসু বিপিএল নিয়ে এই তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশের কয়েকটি আর্ন্তজাতিক ম্যাচ নিয়েও সন্দেহজনক কিছু তথ্য পেয়েছে। সেগুলো নিয়ে আইসিসির উদ্যোগে ব্যাপকতর তদন্ত হবে বলে জানালেন সভাপতি। আর সবকিছু পাশাপাশি বিপিএল চালু রাখতে চাইলেও মানলেন যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এখন প্রধান যন্ত্রণার নাম হয়েছে বিপিএল। সভাপতির ভাষায় এই ‘পেইন টুর্নামেন্ট’ বিপিএলের প্রথম আসর থেকেই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সন্দেহ ছিল। পাপন বললেন, তিনি সভাপতি হওয়ার পর আইসিসি সভায় গিয়েই এই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন যে, প্রথম বিপিএলের যে অভিযোগ উঠেছিল, তার পুরো রিপোর্ট কই? সে সমস্যার সমাধান করতে না পেরেই বিসিবি দ্বিতীয় বিপিএলকে অন্তত নিষ্কলুষ করতে আকসুর কাছে হাত বাড়ায়, ‘আমাদের নিজেদের এখনও সে রকম কোনো দুর্নীতি দমন ইউনিট নেই। তাই আমরা বিপুল ব্যয়ে আকসুকে ভাড়া করি; প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। তারা এর বিনিময়ে এবারের বিপিএলের প্রতিটা ম্যাচে নজর রেখেছে। ফাইনাল শেষে আমাদের জানিয়েছে, এবারের আসরে বেশ কিছু খেলোয়াড় ও ম্যাচ সন্দেহজনক। আমাদের বলেছে, তদন্ত করবো কি না? আমরা সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দিয়েছি। সেই থেকে শুরু হয়েছে এই পর্বটা।’ সেই পর্বে আকসু দফায় দফায় তদন্ত করতে গিয়ে একটার পর একটা চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছে বলেই বললেন পাপন। স্বীকার করলেন যে ব্যাপারটা আর বিপিএলে শুধু আটকে নেই, ‘এটা বলা ভালো যে, এবারের তদন্তটা ছিল শুধু বিপিএল নিয়ে। কিন্তু এখানে কয়েকটা আইসিসি ম্যাচ সন্দেহের তালিকায় চলে এসেছে। নিয়ম অনুসারে এটা আমরা আইসিসিকে জানাবো; আন্তর্জাতিক ম্যাচ নিয়ে তাদেরই উদ্যোগে তদন্ত করবে।’ আরও তদন্ত হতে পারে বিপিএল নিয়ে রিপোর্ট পাওয়ার পর। যদিও নিয়ম অনুযায়ী এরকম রিপোর্ট বা প্রমাণিত অভিযোগ পেলে বিসিবির ‘এন্টি করাপশন কোড’ অনুযায়ী একটা দশ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল করার কথা। কিন্তু বিসিবি সভাপতি বলছেন, ‘ট্রাইব্যুনাল হয়তো করা হবে। কিন্তু সেটার ফল পেতে কত সময় লাগবে; কে জানে। তাই আমরা অভিযোগের স্বপক্ষে প্রমাণ পেলে আমাদের যা করণীয় করে ফেলবো। আমরা বোর্ড অথরিটি। ক্রিকেটীয় শাস্তিটা দেয়ার অধিকারও কি আমাদের নেই?’ সব মিলিয়ে বোর্ড সভাপতির কথায় বোঝা গেল, তিনি কঠোর পদক্ষেপও নিতে চান। যেমন বলছিলেন, বিপিএল বন্ধ করে দিতেও তার আপত্তি নেই। কিন্তু এটা করে হেরে যেতে চান না তিনি, ‘বিপিএল তো একটাই পেইন। আমি সভাপতি হওয়ার পর থেকে অন্য কিছু ভাবার সুযোগই পাচ্ছি না এই বিপিএলের জন্য। এটা বন্ধ করে দিলেও এমন কোনো ক্ষতি নেই। তবে সেটা তো পালিয়ে যাওয়া হল। এখন ফিক্সিং তো সব ধরনের ক্রিকেটেই হচ্ছে। ফলে সব ক্রিকেট তো বন্ধ করে দেয়া যাবে না। তাই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে।’ পাশাপাশি তথ্য হিসেবে পাপন জানালেন, দলগুলোর অনিয়ম, নির্দেশ না মানা এবং খেলোয়াড়দের টাকা না দেয়া নিয়েও তারা ক্ষুব্ধ। ইতিমধ্যে দলগুলোকে দু দফা উকিল নোটিশ পাঠানোর পর এখন মালিকানা স্থগিতের ব্যাপারেও চিন্তা করছেন তারা। মোদ্দা কথা, বিপিএলটা পরিষ্কার করতে চায় বোর্ড। ক্রিকেটের জন্যও সেটা জরুরী ব্যাপার।