আপন ভুবনে ‘নতুন’ আশরাফুল
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৩, ২১:৪৩
সোফায় বসলেই চোখে পড়ে দেয়ালে ঝোলানো কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো মাঝারি আকারের ইসএসপিএন-এর পোস্টারটা—যাতে আছেন ক্রীড়াবিশ্বের পাঁচ ‘আইকন’। দুপাশে চার মহারথী টাইগার উডস, শচীন টেন্ডুলকার, ডেভিড বেকহ্যাম ও মাইকেল শুমাখারের ছবি; মাঝে জ্বলজ্বল করছে মোহাম্মদ আশরাফুলের মুখটা!
কথা বলতে বলতে হঠাত্ পোস্টারটার দিকে চোখ গেল। পোস্টারটা দেখে আনমনেই একটা শব্দ করলেন তিনি। বাইরে অঝোর ধারায় ঝরতে থাকা বৃষ্টিতে শব্দটার অর্থ বোঝা গেল না। তবে মুখের ভঙ্গিটা দেখে মনে হল, হঠাত্ লাফিয়ে ওঠা বল খেলতে গিয়ে আউট হয়ে গেছেন আশরাফুল!
না, এখনো ক্রিকেট থেকে আউট হয়ে যাননি বাংলাদেশের সর্বকালের অন্যতম প্রতিভাধর এই ব্যাটসম্যান। ক্রিকেটের উপমা দিয়ে বলা যায় তার বিপক্ষে আউটের আবেদন এখন তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে; সারা বাংলাদেশ চেয়ে আছে লাল-সবুজ বাতির দিকে। কিন্তু আশরাফুল ‘ওয়াক’ করেছেন। আশরাফুল এখন হাঁটতে হাঁটতে প্রায় বাউন্ডারি দড়ির কাছে পৌঁছে গেছেন। আশরাফুল যেন মেনেই নিয়েছেন, তিনি আউট! ম্লান হেসে বললেন, ‘শাস্তি যাই হোক; মাথা পেতেই মেনে নেব। শাস্তি হবে জেনেই তো সব স্বীকার করেছি।’
ইএসপিএন-এর ওই পোস্টার, গণ্ডা গণ্ডা স্মারক স্ট্যাম্প, ট্রফি আর ক্রেস্টে সাজানো নিজের ড্রয়িংরুমে বসে গতকাল শুক্রবার কথা বলছিলেন আশরাফুল। মাঝে যে ঝড়টা গেল সেটা কিছুটা হলেও অন্তত শান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দুটি ম্যাচের স্পট ফিক্সিং বিতর্ক থেকে শুরু করে গোটা তিনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচেও কিছু অন্যায়ে আশরাফুলের জড়িয়ে থাকার বিতর্ক কাঁপিয়ে দিচ্ছিল বাংলাদেশকে। সে বিতর্ক এখনো ঝড় হয়ে ঘুরছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে। কিন্তু আশরাফুলের ভেতরের ঝড়টা একটু কমেছে।
আশরাফুল আগেও বলেছেন; কাল আবারো বললেন—সাধারণ মানুষের কাছে সব পাপ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার পর থেকে একটা প্রশান্তির মধ্যে আছেন। এই প্রশান্তির রূপটা ব্যাখ্যা করতে গিয়েও যেন একটু স্বস্তি পেলেন, ‘আকসু যেদিন প্রথম ডেকেছিল সেদিন থেকেই খুব মানসিক চাপের মধ্যে ছিলাম। আগেও অনেকবার মনে হয়েছে, মানুষকে সব বলে দেই। তারপর পত্রিকায় যখন খবর আসা শুরু হল, চাপটা সহ্য করতে পারছিলাম না। মানুষ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে ছিল, আমার রাতে ঘুম হতো না। তারপর মনে হল আমার নিজের জন্য, আমার ভক্তদের জন্য এবং ক্রিকেটের জন্য সবকিছু বলে ক্ষমা চাওয়া দরকার। তাই করেছি।’
এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ ছিল না, এটা বুঝতে আইনস্টাইন হতে হয় না।
আশরাফুল যেদিন সংবাদ মাধ্যমে সব বলতে নিচে নেমে আসছিলেন; আসলে তিনি লিফট ধরে নেমে আসছিলেন নিশ্চিত অর্থ আর খ্যাতির চূড়া থেকে। পৃথিবীতে হাজারটা নজির আছে, এ অবস্থায়ও সব অস্বীকার করে মিথ্য কথার খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা চালানোর। আশরাফুলও সেটা করতে পারতেন। তার ভক্তদেরও কারো কারো জিজ্ঞাসা—আশরাফুলের দরকার ছিল কী সত্যি বলে ফেলার!
এই প্রশ্নটাই আশরাফুল খুব ‘ভালো প্রশ্ন’ বলে মনে করলেন না। প্রশ্নটা শুনে হাসলেন। বললেন, ‘এইসব আফসোস একটুও নেই। স্বীকার করে কী হারালাম, তার চেয়ে আমি বেশি বড় করে দেখছি, কী পেলাম। আমি সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। সেদিনই ফেসবুকে দেখেছি, হাজার হাজার মানুষ স্ট্যাটাস দিয়েছেন—মন থেকে ক্ষমা করে দিলাম। আমি মিথ্যা বলে সব চেপে রাখতে চাইলে এই আন্তরিক ক্ষমাটা তো পেতাম না।’
সমর্থকদের কাছ থেকে এই পাওয়াটা আছে; সেই সঙ্গে হারানোও নিতান্ত কম নয়। আপাতত তিনি প্রথমেই এক ধাক্কায় হারিয়ে ফেলেছেন সব ব্যস্ততা। প্রতিদিনের গত্বাধা অনুশীলন, জিম, প্রিমিয়ারের খোঁজ; এই যে নিয়মবাঁধা ব্যস্ততার জীবন, এসবই হঠাত্ নেই হয়ে গেছে তার জীবন থেকে।
একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন, একটা একটা করে চোখ বোলান পত্রিকায়, দেশ-বিদেশের খেলা দেখেন টিভিতে; এভাবেই চলছে জীবন। নিজেই বললেন, ‘আসলেই কিছু করার নেই। ইচ্ছে করেই কোথাও যাই না। নতুন ফোন নম্বর বেশি লোকে জানে না, তাই ফোনও খুব আসে না। এর মাঝে জাভেদ ভাই (জাভেদ ওমর বেলিম), সানি (ইলিয়াস সানি), দুই একজন এসেছিল। এছাড়া একেবারেই চুপচাপ সময় কাটাচ্ছি।’
আশরাফুল এমন নির্ভার হলেও তাকে নিয়ে যারা ভাবেন তারা অবশ্য পুরোপুরি নির্ভার থাকতে পারছেন না। আশরাফুলের সুহূদরা এখন তার সম্ভাব্য শাস্তির সঙ্গে তার নিরাপত্তা নিয়েও ভাবিত। কিন্তু আশরাফুল খুব একটা এ নিয়ে চিন্তিত নন। আবার দার্শনিক ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, ‘সাধারণ মানুষই আমার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। তারাই আমার কোনো ক্ষতি হতে দেবেন না।’
এসব নিরাপত্তা, কর্মহীনতা নিয়ে অনেক কথা হল। এর মাঝে একটা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠল—ভবিষ্যত্। এখন আশরাফুল কী করবেন? আশরাফুল জানেন না। ভবিষ্যত্টাকে ভবিষ্যতের হাতেই ছেড়ে দিলেন, ‘এখনো তো জানি না, কী শাস্তি হবে। শাস্তি ঘোষণা হলে তারপর সিদ্ধান্ত নেব। এখন আসলে কিছুই ভাবছি না। সব সময় ঠিক করে দেবে।’
এসব ভারি কথা আর চলতে পারল না। হঠাত্ পরিবেশটা হালকা করে দিতেই যেন ঘুম থেকে উঠে ছুটে এলো ছোট্ট তাবাসসুম; আশরাফুলের ভাতিজি। চাচুর কোলে উঠেই আবদার—চলো ক্রিকেট খেলি। আশরাফুল হেসে প্রতিবেদকের দিকে চেয়ে বললেন, ‘এই যে, একেবারে কিছু করি না, তা না। ওর সঙ্গে ক্রিকেট খেলে সময় কাটাই এখন।’
মুত্তিয়া মুরলিধরন, শেন ওয়ার্ন, স্টিভ হার্মিসনদের ঘাতক এখন তাবাসসুমের বোলিংয়ে ব্যাট চালিয়ে সময় পার করছেন।
সময়ের পরিহাস বোধ হয় একেই বলে!