কুড়িগ্রাম জেলার পরিচিতি ইতিহাস-ঐতিহ্য
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:৩৩
বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রাম। এ জেলার পূর্বদিকে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা রাজ্য ও জামালপুর জেলা, উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার, জলপাইগুঁড়ি ও আসাম রাজ্য, পশ্চিমে লালমনিরহাট, রংপুর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণে গাইবান্ধা ও জামালপুর জেলা।
উত্তর জনপদের কুড়িগ্রাম জেলা অতি প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক আদিম সভ্যতার ইতিহাস, ঐতিহ্য আর স্বকীয়তার বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমোরসহ ১৬টি নদ-নদী বিধৌত জেলা কুড়িগ্রাম। সুদীর্ঘ সময়ের ভাঙ্গাগড়া, জয়-পরাজয়, আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে এ জনপদ এবং মানুষের জীবনধারা। নদ-নদী জনপদের সবকিছু গ্রাস করেনি, দেশি-বিদেশি শাসন-শোষণের কবলে পড়ে নিষ্পেষিত ও বিপর্যস্ত হয়েছে এই এলাকার মানুষগুলো। এতোকিছুর পরও থেমে থাকেনি এ জনপদের এগিয়ে চলা, এগিয়ে চলছে প্রতিনিয়ত লড়াই করে। আদিম যুগ থেকে এ জেলার অধিবাসীরা ঐতিহাসিক সকল ঘটনাবর্তের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক, উন্নয়ন, বিপ্লবাত্মক, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার গৌরবদীপ্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ থেকে তৈরি করেছে উত্তর জনপদের বৈচিত্র্যময় ইতিহাস।
প্রাগৈতিহাসিক আদিম সভ্যতার লীলাভূমি অতি প্রাচীন এই জনপদের ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা উপত্যকায় আদিম মানুষের প্রথম আর্বিভাব ঘটেছিল। কুড়িগ্রাম জনপদ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রকৃত সময় নিরূপণ করা না গেলেও অতি প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রমাণ ও নিদর্শন পাওয়া যায়। সুদীর্ঘ সময় পূর্বে কুড়িগ্রাম ‘কয়েরগঞ্জ’ বা ‘কুড়িগঞ্জ’ নামে পরিচিত ছিল। ‘কুড়ি’ শব্দটি অতিপ্রাচীন অনার্য জনগোষ্ঠীর বাণিজ্যিক পণ্য গণনার একক ছিলো। প্রমাণ আছে যে, আর্য সম্প্রদায় এ অঞ্চলে আসার পূর্বে অনার্যদের বসবাস ছিলো। নিগ্রো দ্রাবিড়-মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর মিলিত রক্তধারার মিশ্রণে যে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছে, যা অনার্য সভ্যতা বলে ইতিহাসে স্বীকৃত। প্রাচীন এ অঞ্চলের মানুষের চেহারা আকৃতি, রক্তে, ভাষায়, আচার-আচারণে প্রাগৈতিহাসিক জনগোষ্ঠীর ছাপ বিদ্যমান ও এর বৈশিষ্ট্য আজো অপরিবর্তিত। ১৭৬৫ সালে সম্রাট শাহ আলমের ফরমান মতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানী লাভ করে। এসময় বাহারবন্দ ও ভিতরবন্দ রংপুর ফৌজদারীর অধীনে ছিলো। ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে রাজত্ব চলে গেলে ব্রিটিশ সরকার ১৮৭৫ সালে ২২ মে (কারো মতে ২২ এপ্রিল) উলিপুর, চিলমারী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও কুড়িগ্রাম থানা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে কুড়িগ্রাম মহকুমা। ১৯৮৪ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় কুড়িগ্রাম জেলা (২৩ জানুয়ারি গেজেট প্রকাশ হয়)।
একনজরে কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রাম জেলার সৃষ্টি : ১৯৮৪ সালের ২৩ জানুয়ারি
আয়তন : ২২৪৫.০৪ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা : ২০,৬৯,২৭৩ জন, জনসংখ্যার ঘনত্ব : ৯২২ জন (প্রতি বর্গ কি:মি:)
মোট পরিবার : ৫,০৮,০৪৫ টি
সংসদীয় আসনসংখ্যা : ৪টি, মোট উপজেলা : ৯টি, মোট ভোটার সংখ্যা : ১২,২৪,৬৬১ জন, পুরুষ: ৫,৮৬,৪৮৩ জন, নারী: ৬,৩৮,১৭৮ জন, থানা (পুলিশ) : ১১টি (৯ উপজেলা থানা, কচাকাটা থানা ও ঢুষমারা জলথানা), ইউনিয়ন : ৭২টি, মৌজা : ৫৮৭ টি, গ্রাম : ১,৮৭২ টি, পৌরসভা : ৩টি,শিক্ষার হার : ৪২.৫%, মহাবিদ্যালয় : ৪৬টি, সরকারি: ৩টি, বেসরকারি: ৪৩টি, স্কুল এন্ড কলেজ: ১৩টি
মাধ্যমিক বিদ্যালয় : ৩৪১টি
সরকারি: ৫টি, বেসরকারি: ৩৩৬টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় : ১১৫৫টি, সরকারি: ১১৫৫টি
মাদ্রাসা: ২২২টি, কারিগরি ও শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ : ২টি (ভকেশনাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট), হাসপাতাল : ১টি
নার্সিং ট্রেনিং ইন্সটিটিউট : ১টি
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : ৯টি
মোট জমির পরিমাণ : ২২৯০০০ হেক্টর।
ঐতিহাসিক স্থান ও নিদর্শন
জেলা প্রতিনিধি
এছাড়াও কুড়িগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থান জানান দেয় অতীত ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে। ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ভিতরবন্দ রাজবাড়ী, উলিপুর মুন্সিবাড়ী, চিলমারী নদীবন্দর, ধামশ্রেণী সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, উলিপুর জমিদার বাড়ী, কাজী মসজিদ, জিয়া পুকুর, চান্দামারী মসজিদ, মেকুরটারী মসজিদ, পাঙ্গা রাজবাড়ী, ঘড়িয়ালডাঙ্গা জমিদারবাড়ী, ধরলা সেতু, ভিতরবন্দ রাজবাড়ী, নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ী, দাসিয়ার ছড়া ছিটমহল, বঙ্গ সোনাহাট স্থলবন্দর, সোনাহাট রেলওয়ে ব্রীজ ইত্যাদি।
উলিপুর মুন্সিবাড়ী :ইঙ্গ-ভারতীয় স্থাপত্যের নিদর্শন উলিপুরের মুন্সিবাড়ী। এই প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন সম্পর্কে নানা উপাখ্যান ও লোকগাথা প্রচলিত আছে।
উলিপুর জমিদার বাড়ী :১৮৮৪ থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণকান্ত নন্দীর স্ত্রী মহারানি স্বর্ণময়ী জমিদার হিসেবে জমিদারি পরিচালনা করেন। তার আমলেই ১৮৬০ সাল থেকে ১৮৬৮ সালের মধ্যে উলিপুরে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে তার নামে স্কুলটির নামকরণ করা হয় উলিপুর মহারানি স্বর্ণময়ী হাই ইংলিশ স্কুল।
ধামশ্রেণী সিদ্ধেশ্বরী মন্দির :রানি সত্যবতী তার আমলে এই মন্দির নির্মাণ করেন। এখানে বৈশাখ মাস জুড়ে মেলা বসে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ আসেন পূজা অর্চনা করতে।
গবিন্দজিউ নাট্য মন্দিরঃকাশীমবাজার এস্টেটের মহারাজা মনিন্দ চন্দ নন্দী এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
কাজী মসজিদ :উলিপুরের দলদলিয়া ইউনিয়নে এই মসজিদটিকে ঘিরে নানা কিংবদন্তী রয়েছে। প্রতি শুক্রবার বিভিন্ন মনস্কামনা পূরণের প্রত্যয় নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর নারী-পুরুষ শিরনী (পায়েস, খিচুরীসহ নানা খাদ্যসামগ্রী) নিয়ে যান।
চিলমারী নদীবন্দর :ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। একসময় নদীবন্দর হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি ছিল। এখানে ভাসমান তেল ডিপো রয়েছে।
চিলমারী অস্টমীর স্নান ও মেলা :সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রতিবছর সর্বপাপক্ষয়ে পুণর্ব্বসুনক্ষত্রযুক্ত বৃষ লগ্নে অষ্টমী তিথীতে পূণ্যস্নান করতে যান পাপমোচনের আশায়।
ঐতিহাসিক পাঙ্গা রাজবাড়ি
আলতাফ হোসেন সরকার
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে কুচবিহার রাজা নর-নারায়ণের মৃত্যু হলে, পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষার্ধে অর্থাত্ মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে অনিরুদ্ধ অভিষেক করে, পাঙ্গা রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। এ কারণে অনিরুদ্ধ পাঙ্গা রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। অপরদিকে প্রয়াত রাজ নর-নারায়ণের পুত্র লক্ষী নারায়ণ কুচবিহার রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। কুচবিহারের কোচ রাজারা সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তার পরবর্তী দত্তক পুত্র বংশধরগণ কুচবিহার রাজ্য পরিচালনা করেন। বর্তমানে পাঙ্গা সীমান্তবর্তী কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলা শহরের উত্তরে ৫ কিলোমিটার এবং ভারতের কুচবিহার হতে দক্ষিণে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পাঙ্গা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা । উল্লেখ্য যে, পাঙ্গা রাজ্যটি প্রত্যন্ত মফঃস্বলে অবস্থিত থাকার কারণে তত্কালীন এই ক্ষুদ্র রাজ্যটির প্রতি অনেক ঐতিহাসিকের দৃষ্টি নিবদ্ধ হতে পারিনি। আর এ কারণেই পাঙ্গা রাজবংশের ইতিহাস সঠিক সন-তারিখ লিপিবদ্ধ পাওয়া যায়নি। ফলে পাঙ্গা রাজবংশের অনেক ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। পাঙ্গা রাজত্বের শেষার্ধে রাজবাড়ীতে সিংহাসন নিয়ে নানা রকম ষড়যন্ত্রের তুফান বইতে থাকে। ফলে পাঙ্গার হূত গৌরব আনয়ন সম্ভব হয়নি।