অযত্ন আর অবহেলায় উলিপুরের ঐতিহাসিক নিদর্শন মুন্সিবাড়ী

কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ধরনীবাড়ী ইউনিয়নে ৩৯ একর জমির উপর মুন্সিবাড়ীটি নির্মাণ করা হয়। সঠিক দিনক্ষণ জানা না থাকলেও এ অঞ্চলের জমিদার বিনোদ লাল মুন্সির তত্ত্বাবধানে বাড়ীটি নির্মাণ করা হয় বলে জানা যায়। জমিদার বিনোদলাল মুন্সি নিঃসন্তান হওয়ার কারণে তার মৃত্যুর পর দত্তক পূত্র ব্রজেন্দ লাল মুন্সি জমিদারির দায়িত্ব পান। কিন্তু নিয়তি বড় নিষ্ঠুর। স্ত্রী শ্রীমতি আশালতা মুন্সিও জন্ম দিতে পারেননি কোন সন্তান। এ অবস্থায় ব্রজেন্দ লাল মুন্সি মারা গেলে তার স্ত্রীর নিকট আত্মীয় বিহারী লাল মুন্সি জমিদারির দায়িত্ব পান। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কোন এক সময়ে রাজশাহীর সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির নামে সম্পত্তিসহ বাড়ীটি বিক্রি করে দিয়ে চলে যান বলে এলাকায় জনশ্রুতি আছে। সাইফুল ইসলাম বাড়ীটির দখল নিতে গেলে এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে তিনি ব্যর্থ হন। আদালতের আশ্রয় নেন সাইফুল ইসলাম। দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া শেষে আদালত মুন্সিবাড়ীসহ ৩৯ একর জমি সরকারি সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেন। শুরু হয় অযত্ন আর অবহেলার পরিক্রমা। পরে ৭ একর ৮২ শতক জমির উপর নির্মিত হয় ইসলামিক মিশন কার্যক্রম। মূল ভবনসহ অবশিষ্ট জমির দায়ভার পরে ধরনীবাড়ী তহশিল অফিসের উপর। প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় ঐতিহ্যবাড়ী মুন্সিবাড়ীটি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। দরজা জানালা থেকে শুরু করে বাড়ীর মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে স্মৃতিবিজড়িত এ বাড়ীটির সৌন্দর্য্য। এক সময় দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী এসে এর সৌন্দর্য্য অবলোকন করতো। বর্তমানে এর জীর্ণশীর্ণ বেহাল দশা দেখতে কেউ আসে না। পথচারীরা শুধু যেতে যেতে বলেন, এটাই ছিল মুন্সিবাড়ী। স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পায়নি এ বাড়ীটিও। ‘আমাকে রক্ষা করুন’ ঐতিহ্যের ভারে নুয়ে পড়া মুন্সিবাড়ীর প্রতিটি দেয়ালের এ আকুতি কেউ শোনেনি, হয়নি এর সংস্কার। কবে হবে তাও জানে না কেউ। সরেজমিন মুন্সিবাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, মনোরম সৌন্দর্য্য নির্মাণ করা এ বাড়ীটির নষ্ট হওয়া অবকাঠামো। দেখলেই মনে হবে কোন শিল্পীর হাতে আঁঁকা এযেন এক ধ্বংসযজ্ঞের ছবি। তহশিলদার যে রুমে বসে অফিসের কাজ করেন সে রুমে রক্ষিত ব্রজেন্দ লাল মুন্সির প্রতিকৃতি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক-হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়স্থল ভেবে বাড়ীটি আক্রমণ করে। আর পাক হানাদার বাহিনী এ রুমে রক্ষিত ছবিটি বেয়নট দিয়ে ছিঁড়ে দেয়। যা আজও মুক্তিযুদ্ধের পাকহানাদার বাহিনীর নির্মমতার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দৃশ্যমান। প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না হলে ঐতিহ্যবাহী মুন্সিবাড়ীটি স্মৃতির অন্তরালে চলে যাবে। এলাকাবাসীর মতে, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংস্কার করলে এর কারুকার্য খচিত নিদর্শন রক্ষা করা সম্ভব হবে। তা না হলে মুন্সিবাড়ীটি শুধুই স্মৃতি হয়ে থাকবে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে।