বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহলের সমস্যা
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:৩৮
ছিটমহল আভিধানিক অর্থে দ্বীপায়নিক রাজ্য। তবে ভারত-বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো সমতল ভূমির উপর অবস্থিত বলে এ ধরনের ছিটমহলের ক্ষেত্রে যা বোঝায় তা হচ্ছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভূখন্ড পার্শ্ববর্তী দেশের ভূমি পরিবেষ্টিত। এই ছিটমহলগুলোর সৃষ্টি সম্পর্কে জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে মোঘল সেনাপতি মীর জুমলা কোচবিহার রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। এ সময় কোচ রাজা মোঘলদের বশ্যতা শিকার করে ‘করদ’ রাজ্যে পরিণত হয়। সে সময় মোঘল অধীকৃত অঞ্চলের ১১১টি এলাকার অধিবাসী কোচ রাজার বশ্যতা শিকার করে তার রাজ্যে প্রজা হিসাবে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করে তার রাজ্যভুক্ত হয়। তখন তাদের বলা হতো রাজগীর। তখন থেকে ঐ এলাকার অধিবাসিগণ রাজগীর নামে পরিচিতি লাভ করে।
অনুরূপভাবে কোচ রাজার রাজ্যভুক্ত ৫৩টি (বর্তমান দহগ্রাম আঙ্গরপোতাসহ) এলাকার অধিবাসী মোঘলদের বশ্যতা শিকার করে, তাদের অধিকৃত অঞ্চলে সম্পৃক্ত থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তারাও ঐ রাজ্যভুক্ত থেকে যায়। তখন থেকে তারা মোঘলাম নামে পরিচিতি লাভ করে। এভাবেই তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী থেকে যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময় কোচবিহার রাজা ভারতের সাথে সম্পৃক্ত হলে তার অধিভুক্ত এলাকাগুলো ভারতের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ১১১টি ছিটমহল ভারতীয় ছিটমহল হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।একইভাবে ভারতের অভ্যন্তরে ৫৩টি ছিটমহল বাংলাদেশি ছিটমহল হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় ছিটমহলগুলো হলো দাশিয়ারছড়া, লোকসংখ্যা- ৭,১৩১, কালমাটি, লোকসংখ্যা-৯৯, সাহেবগঞ্জ, লোকসংখ্যা-১৪৮, শেউটিকুরশা, লোকসংখ্যা ২২৮, বড়গাওচুলকা -৯১, ছোট গাওচুলকা-(১)-১০২, ছোট গাওচুলকা (২)-লোকসংখ্যা-৯,, দিঘলটারী (২)-লোকসংখ্যা-৪২, দিঘলটারী(১)-১১০, ছোট গারলঝোরা(২)-লোকসংখ্যা-১৪৭, ছোটগারলঝোরা-(১) ১৯৩।
অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশি ছিটমহলগুলো হলো-পোয়াতুরকুটি, লাকসংখ্যা-২৫১১, পশ্চিমবাকালিরছড়া, লোকসংখ্যা-৭৭৭, মধ্যবাকালিরছড়া, লোকসংখ্যা-১৬৫, পূর্ব বাকালিরছড়া, লোকসংখ্যা-৬১, মধ্য মশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা-৪৫৭, মধ্য ছিটমশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা-২৪, পশ্চিম ছি মশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা-৩০, উত্তর ছিটমশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা- নাই, কচুয়া, লোকসংখ্যা-৪৭০, উত্তর বাশজানি, লোকসংখ্যা নাই, ছাট তিলাই, লোকসংখ্যা-১৫, দ: মশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা-১৬৭১, প: মশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা-১৪৩, পূর্ব ছিট মশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা নাই, পূর্ব মশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা-৩৪২, উত্তর মশালডাঙ্গা, লোকসংখ্যা নাই, ফুলবাড়িতে ছিট চন্দ খানায় লোকসংখ্যা-৩২২ জন, ছিটকরলায়-৬৬৫ জন, ছিট মোস্তাফি-৯৮৮৫ জন।
ছিটমহলবাসীর সমস্যা হলো এরা রাষ্ট্রের নাগরিকত্বহীন জনগোষ্ঠী। সেখানে নেই কোন প্রশাসন। সুদীর্ঘ ৬৫ বছর যাবত্ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও নাগরিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে এরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ না থাকায় জনগোষ্ঠী অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে। চিকিত্সা ক্ষেত্রেও তারা সুবিধাবঞ্চিত। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছিটমহলে কিছু ছেলে-মেয়ে বাংলাদেশের ঠিকানা ব্যবহার করে বাংলাদেশে লেখাপড়া করলেও ভারতের অংশে বাংলাদেশি ছিটমহলের সে সুবিধা নেই। ছিলমহলের সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৫৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যা নেহেরুনুন চুক্তিনামে পরিচিত। চুক্তি অনুসারে ছিটমহলগুলি বিনিময় করার সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ১৯৭৪ সালে নতুন করে চুক্তি হয়। যা “ ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি” নামে পরিচিত। এ চুক্তির সূত্রের ভিত্তিতে ১৯৯২ সনে ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যথাক্রমে শ্রী নরসীমা রাও এবং বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের লোকসভায় এ বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বহু চেষ্টা করেও ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় কমিটি ব্যর্থ হয়েছে।