আড়াই বছরেও কাটেনি শেয়ারবাজারের মন্দা
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৩, ২৩:১৯
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মার্জিন লোন (বিনিয়োগকৃত অর্থের বিপরীতে দেয়া ঋণ) দিয়ে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা আটকে গেছে। ফলে এ প্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ বাড়াতে পারছে না। উপরন্তু টানতে হচ্ছে সুদের বোঝা। তাই শেয়ার বাজার উন্নয়নে চলতি বাজেটে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারছে না।
শেয়ার বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বড় ভূমিকা রাখতে হয়। কিন্তু মার্জিন লোনের কারণে চাপে থাকা মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো বড় ধরনের বিনিয়োগে আসতে পারছে না। ফলে দু-একদিন বাজারের লেনদেন ভালো হলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। আড়াই বছরেও কাটানো সম্ভব হয়নি শেয়ার বাজারের মন্দা।
মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস সূত্রে জানা গেছে, এ প্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়া মার্জিন লোনের মধ্যে কম-বেশি ৭ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ইক্যুইটি (বর্তমান মূলধন) ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। ফলে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ঋণের বড় একটি অংশ নন-পারফর্মিং ঋণে পরিণত হয়েছে। এ ঋণগুলো থেকে তারা কোনো প্রকার আয় করতে পারছে না। কিন্তু তহবিলের জন্য মূল কোম্পানিকে বড় অঙ্কের সুদ দিতে হচ্ছে। এটা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যাদের পরিশোধিত মূলধন কম, তাদের জন্য এ চাপটা আরো বেশি। এদিকে মার্চেন্ট ব্যাংকের মূল আয় আসে মার্জিন ঋণ সেবা থেকে। কিন্তু এ সেবাতে আয়ের পরিবর্তে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির ফলে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বিনিয়োগ ও মুনাফার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
মার্জিন লোন রুলস-১৯৯৯ অনুযায়ী ঋণ গ্রহণকারীর ইক্যুইটি ১২৫ শতাংশের নিচে নেমে আসলে ফোর্সড সেল ও ট্রিগার সেল (বিনিয়োগকারীকে না জানিয়েই তার শেয়ার বিক্রি) করার নিয়ম রয়েছে। এমনকি তা করতে নির্দেশই দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও এ নিয়ম স্বীকৃত। অথচ ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে ফোর্সড সেল ও ট্রিগার সেলকে অনৈতিক আখ্যা দিয়ে তা না করতে অনুরোধ করা হয়। বিএসইসি (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) এর বিরোধিতা না করে তারাও অর্থমন্ত্রীর সাথে সুর মিলিয়ে একই অনুরোধ করে। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অর্থমন্ত্রী ও বিএসইসি’র আইনের বাইরে গিয়ে এ ধরনের ভুল মতামতের কারণেই বাজারে দীর্ঘ মেয়াদী মন্দা দেখা দিয়েছে। সে সময় ট্রিগার সেল করা হলে বিনিয়োগকারীরাও কম ক্ষতিগ্রস্ত হতো। পাশাপাশি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। ফলে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস এবং বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আসতে পারতেন। যা বাজারকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতো। কিন্তু চলতি বছরের বাজেটে শেয়ার বাজারের জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না কেবল এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ-বিমুখতার কারণেই। যার নেপথ্য কারণ হলো মার্জিন লোনের চাপ।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি এ হাফিজের কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। অন্যথায় আখেরে এর ফল ভালো হয় না। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া হলে এখন বাজার পরিস্থিতি আরো ভালো হতে পারতো উল্লেখ করে এ হাফিজ আরো বলেন, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো কখনোই তাদের গ্রাহকের খারাপ চায় না। তাদের স্বার্থ চিন্তা করে ফোর্সড সেল ও ট্রিগার সেল করা হলে গ্রাহকরা (মার্জিন ঋণে ইক্যুইটি নেতিবাচক হওয়া গ্রাহক) অন্তত কিছু টাকা নিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু এখন তারাও কোন টাকা পায়নি। মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারী ও এ প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বিনিয়োগে আসতে পারছে না।
ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঋণ রিসিডিউলের জন্য ঋণ হিসেবে ৯০০ কোটি টাকার তহবিল দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কারণ এ তহবিল মোট আউটস্ট্যান্ডিং পোর্টফোলিও’র ৮ শতাংশেরও কম। অর্থাত্ অবশিষ্ট ৯২ শতাংশই থেকে যাচ্ছে আগের অবস্থায়। তাছাড়া অনেকেই এ তহবিল ব্যবহারও করতে পারবে না। ফলে এ ঋণাত্মক ইক্যুইটির হিসাবগুলোতে প্রাণ ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব কম।
মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো যখন সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে সে সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএসইসি কয়েক ধাপে মার্জিন ঋণের ঋণাত্মক ইক্যুইটির প্রভিশনিং করতে বলেছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে শেয়ার বাজার প্রত্যাশা অনুযায়ী ঊর্ধ্বমুখী না হলে একটা বড় অঙ্কের প্রভিশনিং করতে হবে তাদের। এ জন্য হয়তো অনেক মার্চেন্ট ব্যাংককে নতুন করে মূলধন বিনিয়োগ করতে হতে পারে। কিন্তু ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে এখন আইনি সীমাবদ্ধতা থাকায় এক্ষেত্রে অনেকেই হিমশিম খাবে।
আইডিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুনিরুজ্জামান এসব প্রসঙ্গে বলেন, আইন অনুযায়ী মার্চেন্ট ব্যাংকের দেয়া মার্জিন লোন নন-পারফর্মিং হওয়ার কোন সুযোগই ছিল না। কিন্তু বিএসইসি’র অনুরোধ রাখতে গিয়ে তা হয়েছে। কিন্তু এ ঋণের প্রভিশনিং নিয়ে আইনগত কোনো ব্যাখ্যা নেই। তাই এক্ষেত্রে প্রভিশনিং কিংবা অ্যাকাউন্টিং কীভাবে হবে, এ বিষয়টি অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। মুনিরুজ্জামান আরো বলেন, প্রভিশনিং করতে গেলে প্রথমদিকে কিছুটা চাপ পড়লেও আখেরে সেটিই ভালো হবে। কারণ এতে বছর বছর সুদ গুনতে হবে না। তাই প্রভিশনিং করতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে চাপ পড়লেও পরবর্তীতে লেনদেন করা সহজ হবে। তবে এ জন্য মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেয়া প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়ে যাবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ার বাজারের দীর্ঘ মেয়াদী ও স্থায়ী উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। এ জন্যই ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে লেনদেনে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এর অংশ হিসেবেই ঋণাত্মক ইক্যুইটিতে আটকে থাকা টাকা লেনদেনযোগ্য করা দরকার। এ জন্য প্রয়োজনে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল করে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে ঋণ দেয়া যেতে পারে। যেন এ প্রতিষ্ঠানগুলো মার্জিন লোনের চাপ থেকে মুক্ত হতে পারে। তবে মার্জিন লোনের চাপ মুক্ত হতে ঋণ গ্রহণকারী বিনিয়োগকারীদেরও অংশগ্রহণমূলক ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিএমবিএ সভাপতি এ হাফিজ। তিনি বলেন, যাদের ইক্যুইটি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে কিংবা কমে গেছে। তারা আলোচনার ভিত্তিতে সমাধানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু যাদের ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে তারা অনেকক্ষেত্রে যোগাযোগই রাখছেন না।