অষ্ট্রেলিয়ার আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৩, ২১:২০
আগামী ৭ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড। নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের সর্বত্র এখন রাজনৈতিক নেতাদের সরব উপস্থিতি; চলছে ব্যাপক গণসংযোগ। প্রয়োগ করা হচ্ছে আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার নতুন কৌশল ‘টেলিফোন টাউন হল’। এই পদ্ধতিতে সভা-সমাবেশ না ডেকে টেলিফোনে হাজার হাজার ভোটারকে সম্পৃক্ত করে রাজনৈতিক নেতারা গণসংযোগ করছেন, প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েল্স রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের একটি নির্বাচনী এলাকা হল এডেন-মনারো। নয়নাভিরাম বরফাবৃত পর্বত আর দৃষ্টিকাড়া সমুদ্র সৈকত সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক নিসর্গ এই এডেন-মনারোকেই এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ের কুরুক্ষেত্র হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ১৯৭২ সাল থেকে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আসন যে দলের অনুকূলে গেছে সেই দলই সরকার গঠন করে আসছে। যা অনেকটা বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনের সাথে তুলনা করা চলে। তাই এই আসন জেতার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধান দুই রাজনৈতিক দল। লিবারেল পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের নেতা টনি এ্যাবোট ইতিমধ্যে এডেন-মনারোতে ডজনখানেক সফর শেষ করেছেন। অন্যদিকে নির্বাচনে জিতলে ওই এলাকার সাংসদকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেয়ার আগাম ঘোষণা দিয়েছে সরকারি দল লেবার পার্টি।
ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মাথায় আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড। উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডের নেতৃত্বে লেবার পার্টি ২০১০ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। লেবার পার্টি ও বিরোধী দলীয় জোট ৭২টি করে আসন পায়। এভাবে ১৯৪০ সালের পর প্রথমবারের মত অস্ট্রেলিয়ায় ঝুলন্ত সংসদ বা হ্যাঙ পার্লামেন্টের সৃষ্টি হয়। তবে গ্রীন পার্টি এবং স্বতন্ত্র সাংসদদের সমর্থন নিয়ে অবশেষে লেবার পর্টি সরকার গঠন করতে সমর্থ হলেও জুলিয়া গিলার্ডের সরকার সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারেনি। জনমত জরিপে জুলিয়া গিলার্ডের গ্রহণযোগ্যতায় ধস নামলে নির্বাচনে ভরাডুবি থেকে লেবার পার্টিকে রক্ষা করার জন্য পার্টি রুমে নীরব অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো লেবার পার্টির হাল ধরেন কেভিন রাড। এ নিয়ে প্রাসঙ্গিক একটি কথা না বলে পারছি না। জনমত জরিপের ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতির পারদ উঠানামা করে, দলীয় ক্ষমতার মসনদে পরিবর্তন আসে। অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী পত্রিকাগুলোতে রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা, দলীয় প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রীর কর্মদক্ষতা নিয়ে নিয়মিত জরিপ চালানো হয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান জরিপ সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউজপোল, গ্যালোপ, রয় মর্গান, নিলসেন, গ্যালাক্সি রিসার্চ ইত্যাদি। বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিচালিত এই জরিপগুলোর ভবিষ্যদ্বাণীতে জনতার মতামতের যেরকম নিখুঁত প্রতিফলন ঘটে তা সত্যিই বিস্ময়কর। রাজনৈতিক দলগুলো জরিপের ফলাফলকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং তদনুসারে পার্টির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনে। জুলিয়া গিলার্ডের পতন অনেকটা সেই কারণেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনমত জরিপ বলতে গেলে অনুপস্থিত। আর পত্র-পত্রিকায় যে ক’টা জরিপ আমরা দেখি কোনো রাজনৈতিক দল সেগুলোর পরোয়া করে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে সেটা মানি। কিন্তু জরিপের ফলাফল যে পুরোপুরিই অসত্য সেটাও মানতে কষ্ট হয়। তাই পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত জরিপের ফলাফলকে রাজনৈতিক দলগুলো একটু সতর্কতার সাথে গ্রহণ করলে ক্ষতির চেয়ে লাভের মাত্রা বেশি হতে পারে বলেই মনে হয়।
এবারের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রধান দলের শীর্ষ নেতার দু’জনই উচ্চশিক্ষিত। বিরোধী জোটের নেতা টনি এ্যাবোট অক্সফোর্ড শিক্ষিত অর্থনীতি ও আইনে ডিগ্রীধারী একজন রোড্স স্কলার। এছাড়া রোমান ক্যাথলিক ধর্মীয় কলেজ থেকে খৃষ্টান যাজক হবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও রয়েছে তার। তবে ধর্ম ও সামাজিক ইস্যুতে টনি এ্যাবোটের রক্ষণশীল মতাদর্শ অনেক ভোটারের পছন্দ নয়। অন্যদিকে মেধাবী ছাত্র হিসাবে লেবার পার্টির নেতা কেভিন রাডেরও যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। অনার্স মার্কস নিয়ে তিনি প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। কেভিন রাড চাইনিজ ভাষায় পারদর্শী। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন চীন সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ম্যান্ডারিন ভাষায় অনর্গল কথা বলে তিনি রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সাধারণ ভোটাররা বিশেষ করে এশিয়ান বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যে জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে উদারপন্থী হিসাবে পরিচিত কেভিন রাড বিরোধী জোটের নেতা টনি এ্যাবোটের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে আছেন। ক্ষমতায় আসার দু’মাসেরও কম সময়ের মধ্যে কেভিন রাড হতাশায় নিমজ্জিত লেবার পার্টির নির্বাচনী প্রচারণায় যেরকম প্রাণসঞ্চার করেছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। ভোটারদের মধ্যে কেভিন রাডের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এর একটি অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচনের আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইস্তাহার পরিষ্কারভাবে জনগণের কাছে তুলে ধরে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে দেয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোত্থেকে আসবে তারও একটা রূপরেখা তুলে ধরে। ফলে অবাস্তব এবং মিথ্যে আশ্বাসের কোনো সুযোগ নেই। এবারের নির্বাচনী ইস্যুর শীর্ষে রয়েছে নৌকায় চড়ে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে আসা শরণার্থী সমস্যা, কার্বন/মাইনিং ট্যাক্স এবং অর্থনীতি। শরণার্থী সমস্যা সমাধান করার জন্য লিবারেল পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের জিরো টলারেন্স নীতি ভোটারদের জোর সমর্থন পেয়েছে। বিরোধী জোটের নীতি অনুযায়ী নৌকায় চড়ে আসা কোনো শরণার্থী অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার সুযোগ পাবে না। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অবতরণ করার পর তাদের অস্থায়ী প্রটেকশান ভিসা দেয়া হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর পরই বিরোধী জোটের এই নীতিকে মোকাবেলা করার জন্য কেভিন রাড ত্বরিত পদক্ষেপ নেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে আগত শরণার্থীদের অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে না রেখে পাপুয়া নিউগিনিতে পাঠিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ নিয়ে ওই দেশের সাথে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করেন। ফলে এখন থেকে কোনো শরণার্থী অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পাবে না। তবে চাইলে তারা পাপুয়া নিউগিনিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন। এই চুক্তি মোতাবেক নৌকাভর্তি বেশকিছু শরণার্থীকে ইতিমধ্যে পাপুয়া নিউগিনিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে শরণার্থী ইস্যুতে বিরোধী জোটের অর্জনকে রুখে দিতে সমর্থ হয়েছেন কেভিন রাড।
এবারের নির্বাচনে ক্লিয়ার ফেভারিট বলে কেউ নেই। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের লক্ষণ সুষ্পষ্ট। নিউ সাউথ ওয়েল্স রাজ্যে অস্ট্রেলিয়ার এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের বসবাস। তাই কেবল সিডনী শহরের কিছু প্রান্তিক আসনের ভোটাররাই ঘুরিয়ে দিতে পারেন জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল। গতবারের মত ঝুলন্ত পার্লামেন্টের ফাঁদে আটকে যাবার দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পেতে সচেষ্ট দুই প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ লেবার পার্টি ও লিবারেল পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরাধী জোট, এবার কোনো রকমের ঝুঁকি নিতে রাজী নয় তারা। তাই সিডনী শহরের ভোটারদের মন জয় করতে নেয়া হচ্ছে অভিনব প্রচারণার কৌশল। নির্বাচনের আরো একমাস বাকি। ভোটযুদ্ধে ত্রিশদিন অনেক দীর্ঘ সময়। তাই এবারের নির্বাচনে জয়ের মালা টনি এ্যাবোট না কেভিন রাডের গলায় পরবে সেটা জানার জন্য সেপ্টেম্বর ৭ তারিখের রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক :সিডনি প্রবাসী প্রকৌশলী