মিসর পরিস্থিতি :গণতন্ত্রের সংকট
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৪
মিসরে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুসরি ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছেন প্রায় আড়াই মাস পূর্বে। তাহার পর হইতে অস্থির মিসর অস্থিরতর হইয়া উঠিতেছে। গত বুধবার ভোর হইতে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিত ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসি সমর্থকদের সংঘর্ষের ভয়াবহ রূপ এই যাবত্কালের সকল সহিংসতাকে ছাড়াইয়া গিয়াছে। মিসরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ওই একদিনেই সারা দেশে নিহত হইয়াছেন ৫২৫ জন, যাহার ভিতরে রহিয়াছেন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় অর্ধশত সদস্য। তবে মুসলিম ব্রাদারহুড বলিতেছে ‘ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের’ কথা। তাহাদের হিসাবে নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারের কম নহে কিছুতেই। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে যে, এক্ষণে মিসরে এক মাসের জন্য জরুরি অবস্থা ও বিভিন্ন অঞ্চলে কারফিউ জারি করা হইয়াছে। তাহার পরও বিক্ষোভ, সংঘর্ষ স্তিমিত হয় নাই।
মাত্র দুই বত্সর পূর্বে নীলনদের দেশে আরব বসন্তের পর একসময় গণতন্ত্র আসিয়াছিল। বত্সর ফুরাইতে না ফুরাইতে সেই গণতন্ত্র নির্বাসিত হইয়াছে। গণতন্ত্র চর্চার অভ্যাস তৈয়ার করিতে যে ‘সময়’ দিতে হয়, তাহা মিসরে ফুরাইয়াছে অকস্মাত্, বিশেষ কিছু কারণে। যে আরব বিশ্ব গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির অভিযোগে বিদ্ধ ছিল, সেই বিশ্বেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আলোকবর্তিকাটি জ্বলিয়া উঠিয়াছিল তাহরির স্কোয়ারে, ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারিতে। মোহাম্মদ মুরসির শাসন লইয়া যাহা কিছু অভিযোগ এবং বিক্ষোভ তৈয়ার হইয়াছিল, তাহার সমাধানের পথও গণতান্ত্রিক উপায়েই সম্ভব ছিল। যেইভাবে পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে হইয়া থাকে, রাজনৈতিক আন্দোলন, আলোচনা কিংবা নূতন নির্বাচনের মাধ্যমে—এইখানেও তাহা হইতে পারিত। কিন্তু হয় নাই ভিন্ন কারণে। সাদা চোখে বলা হয়, মিসরের জনগণের নাভিশ্বাস উঠিয়াছে দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনেতিক দুরবস্থার কারণে। একসময় মিসর ছিল উঠতি অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ। ২০১১ সালের ‘বিপ্লবের’ পূর্বে ২০০৮-এ যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশ, ২০১৩ সালে তাহা ২ শতাংশের নিচে নামিয়া আসিয়াছে। নীলনদের অববাহিকায় ক্রমাগত পলি জমিতেছে, তাহার সহিত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমশ বৃদ্ধি ঘটায় লবণাক্ততা বাড়িয়া যাইতেছে। দেশটির অর্থনীতির ১০ শতাংশই পর্যটন খাতের সহিত জড়িত, গত কয়েক বত্সরের অস্থিরতায় তাহাতেও ধস নামিয়াছে। সব মিলিয়া ভালো নাই মিসরবাসী। আর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি সেই খারাপ থাকা দশার উন্নয়ন ঘটাইতে পারেন নাই, বরং যুক্ত করিয়াছেন নূতন নূতন জটিলতা। তাহারই পরিণতিতে মিসর আজ ভয়ঙ্করভাবে সংক্ষুব্ধ, উত্তাল।
এই সকল সাধারণ কারণ, আমরা যাহা সাদা চোখে দেখিতে পাইতেছি, তাহা হিমবাহের উপরিভাগ মাত্র। আড়ালে রহিয়াছে সিংহভাগ। বিশ্বের ছোট মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর নিজস্বতা অনেক ক্ষেত্রেই আজ ফ্যাকাশে। তাহাদের নেপথ্যে থাকে পরাক্রমশালীরা। ছোট দেশগুলি কীভাবে চলিবে, কী হইবে তাহাদের শাসনব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি সেই শক্তিধররাই নির্ধারণ করিয়া থাকেন। সুতরাং এইসকল দেশের জনগণ বহু সাধ করিয়া গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট দিয়া কাহাকেও ক্ষমতায় আনিলেও নির্বাচিত নেতৃত্বই যে দেশটির শাসনকর্তা হইবেন এই নিশ্চয়তা বা তৃপ্তি খুব সুলভ নহে এখন। শক্তিধরদের অপছন্দ হইলে জনগণ যাহাকেই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন করুক না কেন, তাহার পতন অনিবার্য প্রায়। হয় একটু আগে, অথবা পরে। ১৯৯১ সালে আলজেরিয়ায় সাধারণ নির্বাচনে যাহারা বিজয়ী হইয়াছিলেন তাহাদের ক্ষমতার অলিন্দেই ঢুকতে দেওয়া হয় নাই। যদিও তাহার ফলে ১৯৯১-পরবর্তী সময়ের গৃহযুদ্ধ আলজেরিয়ায় প্রায় এক লাখ মানুষ প্রাণ হারাইয়াছিলেন। কিন্তু নেপথ্য শক্তিধরদের তাহাতে কী-ই বা আসিয়া গিয়াছে? এক্ষণে যেই বিপুল বারুদস্তম্ভ জমিয়া উঠিতেছে মিসরের জনমানসে এবং যেইভাবে এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হইতেছে, তাহা শক্তিধরদের উদ্দেশ্য হাসিল ভিন্ন আর সকল মানবিক অনুষঙ্গের মূলে কুঠারাঘাত করে। আরো বড় প্রশ্ন হইল, শক্তিধরদের নেপথ্য অঙ্গুলিনির্দেশেই যদি ‘গণতন্ত্র’ পরিচালিত হয়, এবং তাহার দশা যদি এইরূপ হয়, তবে সংজ্ঞা অনুযায়ী গণতন্ত্র শব্দটি অভিধান হইতে তুলিয়া দেওয়াই কি সমীচিন নহে?
তবে এ জগতে কাহারো রাজত্ব মহাকালব্যাপী হইতে পারে না। জগতের ভারসাম্য রক্ষার্থে তাহা প্রয়োজনীয়ও বটে। কোনো পক্ষই চিরকাল বসিয়া বসিয়া শুধু মার খাইবে না, ইহাই সৃষ্টিতত্ত্বের পরম সৌন্দর্য। সৃষ্টিতত্ত্বের অন্তর্নিহিত দর্শন আমাদের সেই পরম সত্য প্রতিনিয়তই নানা উপায়ে জানাইয়া দেয় যে, এ জগতে যে যত বড় প্রতাপশালী হউক না কেন, তাহার রাজপাটে একদিন গোধূলি ঘনাইয়া আসিবেই। সুতরাং তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে। এবং যিনি গোকুলে বাড়িছেন, তিনিও একদিন শক্তিহীন হইবেন। যাহারা অত্যাচারের শিকার এবং যাহারা শিকারী, সকলের জন্যই ইহার ভিতরে লুকাইয়া রহিয়াছে গভীর সত্য। এই সত্য দর্শনের জন্য চক্ষুষ্মান হওয়া দরকার আমাদের সকলের।