ঝালে ঝোলে অম্বলে

ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা মানুষের বিড়ম্বনা ও রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি সমাচার

এবারের ঈদ উত্সবটা শেষ হলো উত্কণ্ঠা আর বিড়ম্বনার মধ্যদিয়ে। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়িতে যাওয়া, ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরে আসার হিসেবটা গরমিল হয়ে যায় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের হরতালের কারণে। এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করার পর পরই দলটির নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা যথারীতি ব্যাপক ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। দলের পক্ষ থেকে ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবস থেকে দু’দিনের হরতালেরও ডাক দেয়া হয়। জামায়াতের এই কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষকে ব্যাপক ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে যাওয়ার সব আনন্দ মাটি হয়ে যায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে সীমাহীন বিড়ম্বনার কারণে। ঈদের ছুটি শেষে দু’দিনের হরতাল পার করে মানুষ যখন একযোগে ঢাকায় ফিরতে শুরু করে, তখন অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, সঙ্গে বর্ষা শেষের বৃষ্টিপাতে রাস্তাঘাট পিচ্ছিল ও কর্দমাক্ত হওয়ায় মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে যারপরনাই ভোগান্তির শিকার হতে হয়। আমাদের দেশে ‘মানবাধিকার’ নিয়ে অনেক ব্যক্তি ও সংগঠনকেই সোচ্চার হতে দেখা যায়, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে কর্মস্থলমুখী লাখ লাখ মানুষ যেভাবে নাকাল হলো, তাদের শান্তি-স্বস্তি-আরাম যেভাবে হারাম হলো, এ ব্যাপারে কাউকে কোনো কথা বলতে শোনা গেল না! নিজের ইচ্ছে ও পছন্দমতো নিরাপদে ঘরে ফেরা, তারপর নির্বিঘ্নে কর্মস্থলে পৌঁছানোটা তবে কী মানবাধিকার নয়? মানবাধিকার মানে কী শুধুই মার খাওয়া? মারা যাওয়া? ঘণ্টার পর ঘণ্টা আহার-নিদ্রা-প্রক্ষালন বাদ দিয়ে পথে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করা কিংবা যানবাহনের ভেতরে ঠায় বসে থাকাটা কী মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়? এটা যদি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হয়ে থাকে তাহলে এই অধিকার লঙ্ঘনের জন্য আমরা কেন সোচ্চার হচ্ছি না? কেন আমরা এই উত্সবকে পণ্ড করে দেয়ার হরতালের বিরোধিতা করছি না? হরতালকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছি না? প্রশ্ন হলো, আইনি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে জামায়াত এই হরতাল ডাকার অধিকার কোথায় পেল? কোনোমতেই জামায়াতের ডাকা এই হরতাল সমর্থন করা যায় না। জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে আদালত। এ সংক্রান্ত লড়াইটা আদালতেই হওয়া উচিত নয় কী? আদালতের বিষয় রাজপথে টেনে এনে দেশের কোটি কোটি মানুষকে জিম্মি করে হরতালের মতো চরম কর্মসূচি পালন করাটা কী যৌক্তিক? বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময়? হরতাল, সভা-সমাবেশ-প্রতিবাদ করাটাও নিঃসন্দেহে নাগরিক অধিকার। কিন্তু সব অধিকারেরই নিশ্চয়ই একটা সীমা আছে। যে কর্মসূচির কারণে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সীমাহীন-দুর্ভোগ ও যন্ত্রণা ভোগ করেন, তেমন কর্মসূচিকে আমরা আর কতকাল ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি’ হিসেবে চালিয়ে যাবো? এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দল, সরকার, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, সচেতন নাগরিকরা কবে কথা বলবেন? কবে মানুষকে যন্ত্রণা দেবার রাজনীতির অবসান ঘটবে? কবে? এদিকে আমাদের রাজনীতির আকাশে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ দিন দিন যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। শরতের আগমন-লগ্নেও আমাদের মনের আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে না। রাজনীতিতে বিরাজমান বিরোধ-সংঘাত তো মিটিয়ে ফেলা হচ্ছেই না, উল্টো এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ‘তৃতীয় শক্তি’র ভয় দেখাচ্ছে। উল্লেখ্য,আমাদের দেশে রাজনৈতিক শক্তির বাইরে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল কিংবা সেনাসমর্থিত অনির্বাচিত ব্যক্তিদের শাসনভার পরিচালনাকে ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে দেখা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগ-বিএনপি একমত হতে না পারার কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা ও রাজনৈতিক হানাহানির প্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত একটি অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দু’বছর ক্ষমতায় থাকে। তারপর থেকে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘তৃতীয় শক্তি’ একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে পরিণত হয়। আমরা এতদিন লক্ষ্য করেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহবান জানিয়েছেন। তিনি এই হুমকিও দিয়েছেন যে, বিরোধী দল যদি এই ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশ না নেয়, যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যায় তাহলে তৃতীয় শক্তি ক্ষমতা দখল করে নিতে পারে। তিনি একথাও বলেছেন যে, এবার তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় এলে দশ বছরেও ক্ষমতা ছাড়বে না। সম্প্রতি প্রধান বিরোধী দল বিএনপির এক শীর্ষ নেতাও তৃতীয় শক্তি নিয়ে কথা বলেছেন। গত শুক্রবার দুপুরে অনুষ্ঠিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে খালেদা জিয়ার কাছে ক্ষমতা যাবে—এটা ভেবে সরকার এখন নতুন চক্রান্ত শুরু করছে। তারা তৃতীয় শক্তির কাছে ক্ষমতা দিয়ে চলে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরা বিরাজমান বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ না নিয়ে একে-অপরকে তৃতীয় শক্তির ভয় দেখাচ্ছেন। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের সম্ভাবনা ক্রমেই উবে যাচ্ছে। পারস্পরিক কোনো শ্রদ্ধা-প্রীতি তো নয়ই, এক পক্ষ আরেক পক্ষের জন্য অপছন্দের কাজগুলোই বেশি বেশি করছে। এতে বিরোধ আরো বাড়ছে। যেমন, বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত্বার্ষিকীর দিন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন না করার বিষয়টি নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে সুধীমহলে অনেক আলোচনা হয়েছে। সবাই বলেছেন জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার এই ট্রাজিক দিনটিতে যেন বেগম জিয়া জন্মদিন পালন না করেন। কিন্তু বেগম জিয়া এবারও প্রায় দেড়মণ ওজনের কেক কেটে সাড়ম্বরে জন্মদিন পালন করেছেন। বিষয়টাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মোটেও ভালোভাবে দেখেনি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তো বলেই দিয়েছেন, ‘যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত্ বার্ষিকীতে কেক কেটে ফুর্তি করে, তাদের সঙ্গে আপস হবে না।’ বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে কিসের সংলাপ। তাদের সঙ্গে কি সংলাপ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব?’ এখন ব্যাপারটা যা দাঁড়াচ্ছে তাতে সংঘাত ছাড়া অন্য কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, এসব কথা বলে, আপোষ-মীমাংসার সব পথ বন্ধ করে ‘তৃতীয় শক্তি’র আগমনকেই কী অনিবার্য করে তোলা হচ্ছে না? ‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়’ বলে বাংলায় একটা প্রবাদ আছে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থা থেকে স্বাধীন হওয়ার পরও বারবার সামরিক শাসন দ্বারা নিপীড়িত ও নির্যাতিত হওয়ায় এ দেশের মানুষের মনে এই শাসন সম্পর্কে একটা ভীতি জন্মে গেছে। গণতান্ত্রিক শাসন বা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটু অনিয়ম ও বেনিয়ম দেখলেই আমরা ভয় পাই, এই বুঝি এর সুযোগ নিয়ে, দেশের অবস্থাকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে অনির্বাচিতরা ক্ষমতা ‘কেড়ে নিল’ এবং আইনের শাসনের বদলে শক্তির শাসন কায়েম করে ফেলল। জনগণের মনের এই ভীতিটার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশেও এখন রাজনৈতিক দলগুলো এক আত্মঘাতী ভূমিকায় নেমেছে। এমনিতেই আমাদের দেশ মীরজাফর-মোশতাকের দেশ। এখানে অনেক ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তি আছেন যারা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখেন না বলে বারবার অনির্বাচিত শক্তির কাঁধে বসে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চান। এ শ্রেণীর লোকেরা সারাক্ষণই দেশের রাজনীতিতে পানি ঘোলা করার তালে থাকেন এবং তৃতীয় শক্তিকে ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করে দেন। এখন যারা ত্রাতা তারাই যদি তৃতীয় শক্তির ভয় দেখাতে শুরু করেন, তাহলে তৃতীয় শক্তির আসন বুঝে নেয়া ছাড়া আর উপায় কী? রাজনৈতিক নেতাদের কে বোঝাবে সেই মিথ্যেবাদী রাখালের গল্পের কথা? বাঘ আসছে বাঘ আসছে বলে উপকথার মিথ্যাবাদী রাখাল বালক গ্রামবাসীকে ভয় দেখাতো। বাঘের পেটে কিন্তু তাকেই প্রথম যেতে হয়েছিল! আমাদের রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের বর্তমান আচরণ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অবশ্য জাতি হিসেবে আমরা বড়ই বিচিত্র স্বভাবের! আমরা ঝগড়া করি, কলহ করি, খুনোখুনি, মারামারি সবকিছুই করি নিজেদের মধ্যে। ভিনদেশ, ভিন জাতির প্রতিও আমাদের বৈরিতা আছে, তবে স্বজাতির প্রতিই আমাদের ক্ষোভ-বৈরিতাটা যেন বেশি। আমাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আমরা খুব সহজে ও তুচ্ছ কারণে ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়িয়ে যাই; কিন্তু পরে আর এই ঝগড়া নিজেরা মেটাতে পারি না। এজন্য তৃতীয় পক্ষের দরকার হয়। এই তৃতীয় পক্ষ বিদেশি হলেও আমাদের কোন আপত্তি থাকে না। এদেশে বিয়ে করতেও তৃতীয় পক্ষ বা ঘটক লাগে। সামান্য একটি গরু কিনতে গেলেও তৃতীয় পক্ষ দালালের শরণাপন্ন হতে হয়। এই তৃতীয় পক্ষ কালচারের কারণেই এদেশে শুধু একটা নির্বাচন করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান চালু করতে হয়েছে। এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে বৈঠক করছেন। বিদেশিদের প্রতিও আমাদের মাত্রাতিরিক্ত পক্ষপাত লক্ষ্য করা যায়। দেশি রেফারির তুলনায় তাই এখানে বিদেশি রেফারিরা মর্যাদা পায় বেশি। ঢাকার ফুটবল এবং ক্রিকেট লীগে নিম্নমানের বিদেশি খেলোয়াড়ের আধিক্য আমাদের বিদেশিদের প্রতি মোহেরই স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। দেশের ‘ঠাকুর’ ছেড়ে বিদেশের ‘কুকুর’ ধরতে আমরা বরাবরই অতি উত্সাহী। তাই তো আমাদের দেশের রাজনীতিতে এখনও বিদেশিদের, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আমরা সরকারের খারাপ কাজের সমালোচনা করলে কেউ তা পাত্তা দেয় না। কিন্তু বিদেশিরা সেই সমালোচনা করলে সবার মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এটা সম্ভবত আমাদের জাতিগত দোষ! ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যায়, বাঙালি বারবার বহিরাগতদের বশ্যতা মেনে নিয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ভিনদেশিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছে; কিন্তু নিজেদের মধ্যে কে প্রভু হবে—এ নিয়ে মরণপণ লড়াই করেছে। স্বজাতিপ্রীতি অপেক্ষা বাঙালির বিদেশিপ্রীতি সবসময় বেশি বলে মনে হয়েছে। শত্রুকে উচ্ছেদ করতেও বাঙালি বারবার বাইরের লোক ডেকে এনেছে। তাই তো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিরা বারবার হস্তক্ষেপ করলেও আমরা তা নীরবে মেনে নিচ্ছি! লেখক :কলামিস্ট