ক্রোধের সংস্কৃতি

‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন!’ সত্যিই তো এমন অনেক ঘটনাই তো আমরা প্রত্যক্ষ করি শুধুমাত্র নিজেকে সংবরণ করতে না পারার কারণে ‘অন্যায়কারী’ উল্টো কথা শুনিয়ে মাথা উঁচু করে চলে যায়— পার পেয়ে যায়। তাই বলে সঠিক সময়ে উচিত কথাটি বলার কৃতিত্বও কম নয়। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র; ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠীতে রয়েছে পক্ষ-প্রতিপক্ষ। পারস্পরিক বোঝাপড়া, আচরণ তাদের রুচিবোধ ও মর্যাদা নির্ধারণ করে। প্রাচীনকাল থেকে বংশগত ঐতিহ্যের বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্ব পায়। আমরা প্রায়শই বস্তি এলাকায় অপ্রীতিকর পারিবারিক আচরণ নিয়ে কটাক্ষ করি, যদিও উঁচু তলার অনেক নাটকীয় ও বর্বর ঘটনা শুনে তাজ্জব হয়ে যাই। এরই মাঝে আমরা সম্ভ্রান্তদের মানবিক জীবন-যাপনে মুগ্ধ হই। দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার চার দশক পরও আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এতটুকু বনেদী হয়ে উঠতে পারিনি। জাতি হিসেবে আমরা ভাগ্যবান। পাইনি স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ। অতিবিপ্লবী কিংবা ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর আধিপত্য নেই সরকার ও বিরোধী দলে। প্রায় একই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী প্রধান দু’টি দলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রাষ্ট্র ক্ষমতা। এরপরও যদি আমরা গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করতে না পারি তবে কি তা ইঙ্গ-মার্কিন প্রভু কিংবা উর্দি পরা গোষ্ঠী এনে দিবে? যে উন্নয়ন করলে পকেট ভারী করা যায় আমরা শুধু সেদিকে ব্যস্ত—তবুও তো উন্নয়ন। অসাধু সহকরী কর্মকর্তা বাড়ি-গাড়ি, বিত্ত-বৈভব নিয়ে সমাজসেবা করে—সত্, নিরীহ কর্মকর্তা পারিবারিক গঞ্জনায় অনিশ্চিত জীবন-যাপন করে। কেউ ব্যবসার নামে ব্যাংকের টাকা লুটপাটের মচ্ছব বসায়, অনেক উদ্যোক্তা পুঁজির জন্য ফাইল চালাচালির হয়রানিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ, ঘর-সংসার ত্যাগ করে অনেক রাজনীতিক নির্বাচনের সময় শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে বঞ্চনার শিকার হন, কোটি টাকায় টিকেট কিনে নেন লুটেরা ব্যবসায়ী। কেন নিজেদের সংবরণ করতে পারে না আমাদের জিম্মি করে রাখা প্রধান দু’টি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব? আমি তো ১৬ কোটি মানুষের চরিত্র সংশোধনের দায়িত্ব নিতে পারি না। তবে এটুকু আশা করতে পারি আমার দলে শুদ্ধি অভিযান হলে এর প্রভাব পড়বে বিরাট জনগোষ্ঠীর উপর। সরকারের উপর বিরোধী দলের অনেক ক্ষোভ। অন্যদিকে সরকার সাধ্যমত আক্রোশ মিটিয়ে যাচ্ছে বিরোধী দলের উপর। বিরোধী দল প্রতিশোধের অপেক্ষায় বা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। সরকার আতঙ্কে আছে—এই সরবে তো জাপটে ধরবে। তো চাই সব ধরনের সতর্কতা। এসব কথায় বোধ করি উভয় তরফ থেকেই জোর আপত্তি আসবে। কারণ বিরোধী দল ইতিমধ্যে বলেই দিয়েছে—আমরা আগামীতে আরো সংযত, গঠনমূলক ও নিজেদের শুধরে কাজ করব। আবার সরকারও সাফ জানিয়ে দিয়েছে—তারা গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, যথাসময় এবং বিধি মোতাবেক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে কেন এত ভয়, এত সংশয়। একমুষ্টি চাল দিলে পাল্লা যদি ভারী হয় সেই একমুঠো চালের জন্য কাড়াকাড়ি! আমার নিজের অর্জন নিয়ে গর্ব করার, দায়িত্ব পালনের ফুরসত নেই। জনপ্রিয়তার তুমুল প্রতিযোগিতায় কেউ আগে-পিছে থাকতে পারে। কেউ সরকারের দায়িত্ব নিবে, কেউ দায়িত্বশীল বিরোধী দলের আসনে বসবে। কিন্তু আমরা কেউ স্বৈরাচারকে জেলে ঢুকাই, কেউ ক্ষমতার অংশীদার বানাই। কেউ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সাথে সাথে বিশেষ প্রতিপক্ষকেও বিনাশ করার চেষ্টা করি, কেউ ইতিহাসের ধূম্রজাল তৈরি করে চিহ্নিতদের আড়াল করি। মোসায়েবঘেরা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আপনার অন্যায় ও আত্মঘাতী কাজকে কখনো ‘মেকিয়াভেলীর সনদ’ দিয়ে, আবার লোক দেখানো মডেল কর্মসূচিকে ‘আব্রাহাম লিংকনের সনদ’ দিয়ে শতভাগ সঠিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সব আমলে হয়েছে— এখনো হচ্ছে। তাই প্রধান দু’দলের শীর্ষ নেতৃত্বকেই খুঁজতে হবে সঠিক পথ, দেখাতে হবে আলোর সন্ধান। ক্রোধ দিয়ে আর যা-ই হোক সার্বজনীন উন্নয়ন ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। লেখক: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক borhanyousuf@yahoo.com