দেশ যাচ্ছে কোন্ দিকে :জনমনে নানা প্রশ্ন

বিশেষভাবে গত বছর খানেক ধরে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত সংঘর্ষ হাঙ্গামা নৃশংসতা ও নৈরাজ্য ক্রমশ উদ্বেগজনক পর্যায় পৌঁছে গেছে। গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ ও তা টিকিয়ে রাখার জরুরি পূর্বশর্ত যে সহিষ্ণুতা- তাও দ্রুত উবে যাচ্ছে। একদিকে সরকার নির্যাতন নিবর্তন ও প্রতিহিংসার পথ অবলম্বন করছে অন্যদিকে বিরোধীদল সমূহও মানববন্ধন, আন্দোলনের হুমকি ধামকি, লম্বা হরতাল, সংসদ বর্জন প্রভৃতি পন্থায় তাদের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে। দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীনমহল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোথাও দাঁড়াবার সুযোগ দিচ্ছে না। তারা হামলা মামলা হত্যা গ্রেফতার রিমান্ড গুম কারাদণ্ড প্রভৃতির যথেচ্ছ চর্চা এমন পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে যে একে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সভ্যসমাজ হিসাবে বিবেচনা করার সুযোগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বিরোধীদলগুলো হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে তারা ঈদের পরে মাঠে নামবে, নিজেদের উত্থাপিত দাবি-দাওয়া মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করবে। প্রয়োজনে ‘লগি বৈঠার’ চেয়েও কঠিনপন্থা অবলম্বন করে ছাড়বে। সরকারিমহলও এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে কসুর করছে না। তারা বিরোধী পক্ষকে রাজপথেই মোকাবেলা করার হুমকি দিচ্ছে বার বার। ইতিমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও এই মর্মে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন সরকার; তার উপর নিজেদের দলীয় নেতাকর্মীদেরও চাঙ্গা রাখছে। দৃশ্যত সরকার বিরোধীদলের হুংকারকে পরোয়া না করে আগামী সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার, কৌশলে ক্ষমতায় থাকার তথা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। সম্ভবত এ লক্ষ্যেই তারা তথাকথিত ‘ভিশন টুয়েন্টি ওয়ান’কে সামনে রেখে এগিয়ে যাবার এবং স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পালনের কথা বলছে। সরকার একদম খোলাখুলি বলছে বিরোধী পক্ষের সাথে কোন সংলাপ সমঝোতা হবে না। প্রধান বিরোধীদলকে লক্ষ্য করে আঃলীগের মহাসচিব সদম্ভে বলেছেন, ‘কোন আপস নয়’, ‘ওদের সাথে কিসের সংলাপ’। আরেকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ১৫ আগস্টের প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে ‘হরতাল আহ্বানকারীদের বাড়িতে ঢুকে হত্যা’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এসব থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে এক ভয়ঙ্কর অবস্থার দিকে। এসব উচ্চারণ থেকে সহিংসতা রক্তপাত ও পেশীশক্তির ব্যবহারের আলামত স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। আপস নয়, সংলাপ নয়, হত্যার হুংকারে জনমনে অজানা আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। কি হবে দেশে অদূর ভবিষ্যতে, আসছে দিনগুলোতে কি হতে যাচ্ছে রাজনীতির চেহারা চরিত্র— এ নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে কথা হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নানা প্রশ্ন আশঙ্কা উত্তেজনা, প্রচ্ছন্ন ভীতি ও উত্কণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের সর্বত্র। এহেন নাজুক অবস্থার উদ্ভব দুই একদিনে হয়নি। যে সরকারই এসেছে তারা রুলিং এলিট শ্রেণির বেপরোয়া আচরণ উচ্চারণ, দায়িত্বহীন কার্যকলাপ, নগ্নদলীয়করণ অগণতান্ত্রিক মনোভঙ্গি এর পিছনে কাজ করছে। সর্বোপরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল বা নিবীর্য করার অপকৌশল জাতিকে এক গহীন খাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। শাসক গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কোন কথায় পাত্তাই দেয় না। এমনকি ইতিপূর্বে প্রধান বিরোধীদলের নেতাকে তাঁর বসতবাড়ি থেকে উত্খাত করেছে। এখন রাজনীতি থেকেও বিতাড়িত করার (‘মাইনাস’) করার কথাও উচ্চারণ করছে সদর্পে। বিরোধী দলের নেতানেত্রী কর্মী সমর্থকদের ঢালাওভাবে গ্রেফতার মামলায় জড়ানো ও কারাগারে প্রেরণ করে দেশ বিরোধীদল শূন্য, ফাঁকা ময়দানের মত, রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরির আয়োজন চলছে। সভা শোভাযাত্রা মিটিং মিছিল করা বিরোধীদলগুলোর পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছে, মাঝে মধ্যেই পথের পরে বসানো হয় ভ্রাম্যমাণ আদালত, তত্ক্ষণাত্ জেল-জরিমানাও করা হয়। এইসব কার্যকলাপ/দৃষ্টিভঙ্গি উদার গণতন্ত্রের পরিপন্থী, স্বৈরতন্ত্রের আরেক নাম। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা ও জনমত গঠন এতদুভয়কেই এরা অবরুদ্ধ করেছে, এমনকি মানবাধিকার কর্মীদেরও এরা রেহাই দেয় নাই। ‘অধিকার’ এর সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খানকে কেবল গ্রেফতার নয় রিমান্ডে নেয়ার আয়োজন পর্যন্ত করা হয়। আর দাড়ি টুপিধারী মানুষ, বহু আলেম উলামারাও রয়েছেন আজ আতঙ্কে। তার উপর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গ্রেফতারের পর গায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করার ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদপত্রে। এসব মিলে দেশ যেন এক আতঙ্কের উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলকথা হচ্ছে নির্ধারিত সময় অন্তর-অন্তর জনসাধারণ তাদের পছন্দ মত শাসক বেছে নেবে। ইচ্ছা করলে তারা বিদ্যমান/ক্ষমতাসীনদের আবারও ক্ষমতায় রেখে দেবে অথবা নতুন গোষ্ঠী/দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। জোর করে ক্ষমতায় থেকে যাবার কিংবা প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার কোনই অবকাশ নেই। গণতান্ত্রিক কালচারের মধ্যে এসব পড়ে না। তাই জনগণকে সেই সুযোগ/পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে যাতে তারা তাদের পরবর্তী শাসকদের (state executive), পছন্দের ব্যক্তিবর্গ বা দলকে, বাছাই করে নিতে পারে বাধাহীনভাবে। এটাই গণতান্ত্রিক বিধান, বিশ্বজুড়ে এটাই রেওয়াজ। কিন্তু আমাদের ক্ষমতাসীন মহল এই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে মানতে চাইছেন না। প্রতীয়মান হচ্ছে যে কোন পন্থায় ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার নষ্ট আকাঙ্ক্ষা তাদের মধ্যে প্রবল। ভাবভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে যে তারা দেশটাকে তাদের পারিবারিক বা দলীয় সম্পত্তি মনে করেন- অন্যদের ধারে কাছে ভিড়তে দিতে নারাজ। কাজেই প্রচলিত গণতান্ত্রিক রীতিনীতি তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। নিজেদের অগণতান্ত্রিক খায়েশকে চরিতার্থ করতেই তারা সংবিধান সংশোধন করিয়েছেন-আদালতকে ব্যবহার করেছেন রাজনীতিতে যুতসই রদবদল করার মতলবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর খণ্ডিত ব্যাখ্যা বের করে একটি নির্বাচনী প্রহসন করতে কিংবা বিনা নির্বাচনেই তারা ক্ষমতায় আরো ৫/১০ বছর থেকে যাবার পাঁয়তারা করছে। বিরোধী দল তথা জনসাধারণ এই চালাকি ধরে ফেলেছেন। তারা মহাজোটের চাতুর্যকে নস্যাত্ করে একটি অবাধ নির্বাচনের জন্য আওয়াজ তুলেছেন, কথা বলছেন একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে। দেশের কমবেশি ৮০ শতাংশ মানুষ চায় যে পরবর্তী নির্বাচন হতে হবে একটি দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। পঞ্চদশ সংশোধনী যদিও জরুরি ছিল না, জাতির সর্বসম্মত চাওয়া ছিল না তারপরও যদি তা মেনে নেয়া হয় তবে সেই মোতাবেক আরো দু’দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিনাবির্তকে হতে পারে। গণতন্ত্রও একটা শক্ত ভিত্তি পেতে পারে এভাবে। সমস্ত বিরোধ বির্তকও এড়ানো যেতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাসীন মহল বক্রপথ ধরেছেন। তারা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে মানতে নারাজ। এতে নাকি গণতন্ত্রের হানি হবে, কিংবা অগণতান্ত্রিক কোন শক্তির উত্থান হতে পারে যারা লম্বা সময় ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন। তাই ক্ষমতাসীন সরকার ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচন করতে চায়। এই ব্যবস্থা জনসাধারণ মানতে রাজি নয়। এ রকম নির্বাচনে হতে পারে ব্যাপক কারচুপি, হতে পারে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। তাতে জাতির ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটার আশংকা প্রায় শতভাগ। বিরোধী দলগুলো তাই সরকারি কর্মকৌশলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের সাফ দাবি একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন হতে হবে। তারা বলছেন সরকার যদি এই পথে না আসে তবে অবিলম্বে সকল কঠোরতম পন্থা অবলম্বন করে, প্রয়োজনে দেশ/প্রশাসনকে অচল করে দিয়ে সরকারকে বাধ্য করা হবে দাবি মেনে নিতে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীনরা বোধকরি আঁচ করতে পেরেছে যে তাদের জনসমর্থনের পারদ একদম তলায় নেমে গেছে, জনপ্রিয়তা নিঃশেষিত প্রায়। এই পরিস্থিতিতে স্বচ্ছ অবাধ নির্বাচন হলে তাদের ভরাডুবি নিশ্চিত। সিটি কর্পোরেশনগুলোর সামপ্রতিক নির্বাচনের ফলাফল সে রকমই ইঙ্গিত দেয়। তাই তাদের এই পথে হাঁটতে ঘোর আপত্তি। তাদের সাড়ে চার বছরের শাসনকাল বিডিআর বিদ্রোহ, শেয়ার বাজার ধস, ব্যাংক লুটপাট, পদ্মাসেতু কেলেঙ্কারি, হলমার্ক-ডেসটিনির জালিয়াতি, আড়িয়াল বিল কাণ্ড, শাপলা চত্বরে অভিযান, রেলের কালো বিড়াল, দেশজুড়ে রক্তাক্ত টেন্ডারবাজি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল, মিডিয়া দলন ও ব্যাপক খুন ধর্ষণের ঘটনায় কলঙ্কিত, ধিকৃত। কাজেই তাদের ভোট পাওয়ার আশা, জনসমর্থনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে তা বুঝতে বাকি নেই। কিন্তু নিরপেক্ষ ভোট আয়োজনের সাহস তাদের নেই। নেই বলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিকারীদের প্রতিহত করার হুংকার দিচ্ছে নানা ভাষায়, নানা আয়োজনে। কিন্তু তাদের মনে রাখা দরকার এসব করে শেষ রক্ষা হয় না। আগামী সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে নয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্তৃত্বেই হতে হবে এটা এখন জনদাবি। বিরোধীদল জনগণের হূদয়ের কথা প্রতিধ্বনি করছে মাত্র। এই জনদাবিকে আড়াল করার জন্য সরকারের শীর্ষতম ব্যক্তি থেকে অধস্তন স্তরের লোকেরা পর্যন্ত বার বার জুজুর ভয় দেখাচ্ছেন। বলা হচ্ছে যদি নির্বাচন নিয়ে বেশি দরকষাকষি করা হয় তবে ‘তৃতীয় শক্তির’ উত্থান হতে পারে। কিংবা বেশি ঝুট-ঝামেলা করলে ‘অসাংবিধানিক সরকার’ ক্ষমতা দখল করতে পারে। এসব কথার মমার্থ খোলাখুলি বলা হচ্ছে না, দেয়া হচ্ছে না কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যাও। কিন্তু এভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে জনগণকে এবং চেপে যেতে বলা হচ্ছে রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষগুলোকে। গাজীপুরের নবনির্বাচিত মেয়রের শপথ অনুষ্ঠানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন যে কোন অসাংবিধানিকমহল যাতে ক্ষমতা দখল করতে না পারে সেদিকে মনোযোগ দেয়ার জন্য। তিনি ঈদের দিন বলেছেন সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন হবে। আইনমন্ত্রীও সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। আবার পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদও একই সুরে কথা বলেছেন এবং হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে সেরকম কিছু ঘটলে নাকি বিরোধীদল (বিএনপি) তার জন্য দায়ী থাকবে। এদিকে বিরোধী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন যে কোন ‘অসাংবিধানিক সরকার’ যদি ক্ষমতায় আসে সেজন্য ক্ষমতাসীনরাই দায়ী হবে। এসব জুজুর ভয় দেখানো এক বিবেচনায় অর্থহীন প্রলাপ। কথিত ‘অসাংবিধানিক সরকার’ কোন অভিনব বিষয় নয়। গত ৫০/৬০ বছরের বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ( এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকায়) এরকম সরকার বহুবার রাষ্ট্রক্ষমতা অধিগ্রহণ করেছে, দেশ চালিয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে তিক্ত মধুর নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে সে সব দেশের জনগণের। আমাদেরও অভিজ্ঞতা এ বাবদে নেহায়েত কম নয়। কথা হচ্ছে ‘অসাংবিধানিক সরকার’ (সেনাবাহিনী/সেনাসমর্থিত?) তখনই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে যখন রাজনীতিকরা পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সংঘাত, অসহিষ্ণুতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। অথবা ক্ষমতাসীন শাসকবর্গ দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন ও লুণ্ঠনের মধ্যদিয়ে জনস্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়, নিজেরাই গণতন্ত্রকে পদদলিত করে তখনই রাজনীতিকদের হটিয়ে ইউনিফর্মধারীরা সামনে এসে দাঁড়াতে বাধ্য/প্রলুব্ধ হন। তবে ক্ষমতালিপ্সু সেনা নায়কদের বেপরোয়া রক্তপাত ও গদি দখলের দৃষ্টান্তও রয়েছে অনেক। যেমন এই মুহূর্তে মিশরে জেনারেল সিসির নেতৃত্বে যা ঘটছে তা সবার জানা। এই ঘটনা থেকে আমাদেরও শিক্ষণীয় রয়েছে অনেক কিছু। যাহোক, দেশের দায়িত্বশীল রাজনীতিকরা যে সব কথা উচ্চারণ করে জাতিকে যেমন ভয় দেখাচ্ছেন তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ঘনীভূত হচ্ছে। পথে-ঘাটে অফিস-আদালতে চায়ের আড্ডায় লোকজন যা বলছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কি ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার যেন শেষ নেই। জনসাধারণের এসব কথাবার্তা থেকে ৩/৪ রকমের অভিমত বেরিয়ে আসছে। প্রথমত, সরকার যে নীতি কৌশল ও একরোখা মনোভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে তাতে হয়তো একটা একদলীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সব কিছু হবে সাজানো নাটকের মত, এভাবে ক্ষমতায় থেকে যাবে মহাজোট। দ্বিতীয়ত, শেষমেষ বিরোধীদলের দাবি বা জনতার প্রবল চাপের মুখে নতিস্বীকার করে সরকার পিছু হটবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। তৃতীয়ত, দেশে আদৌ কোন নির্বাচন হবে না। বর্তমান সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বক্র ব্যাখ্যা করে নির্বাচন ছাড়াই আরো ৫/১০ বছর দাপটের সাথে ক্ষমতায় থেকে যাবে (সে রকম স্কোপ নাকি সংশোধনীর মধ্যে লুকায়িত রয়েছে)। চতুর্থত, অবস্থা বেগতিক বুঝলে সরকার নিজে থেকেই কথিত ‘অসাংবিধানিক সরকারের’ হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে দৃশ্যপট থেকে নিরাপদে প্রস্থান করবে। তবুও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তারা ক্ষমতায় আসতে দেবে না। এরকম নানা খোলামেলা আলোচনা ও মূল্যায়ন চলছে মুখে-মুখে। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন জাতির সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে, সংঘাতপূর্ণ হতে পারে দেশের অবস্থা। বিদেশি পত্রিকার মন্তব্য যে আগামীতে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। অন্যদিকে সরকারের মন্ত্রী এমপিরা কঠোর ভাষায় বলছেন— হরতাল হাঙ্গামা করে সরকারকে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়ানো যাবে না, তত্ত্বাবধায়কের দাবি গ্রাহ্য করা হবে না। দেশের ঘনায়মান সংকটের প্রেক্ষিতে দেশি-বিদেশি নানা মহল থেকে সংলাপের তাগিদ দেয়া হচ্ছে। সরকার ও বিরোধীদল আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছাক জনগণও এমনটাই কামনা করছে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তারা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যদিয়ে একটি সুস্থ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ রচনা করবেন এটা বিদেশি বন্ধুদেরও প্রত্যাশা। দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিদ্বান বুদ্ধিজীবীগণ জাতির মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী মহলগুলো আশা করছে একটি অর্থবহ সংলাপের মধ্যদিয়ে সব বিরোধ-বিদ্বেষ-তিক্ততার অবসান ঘটবে, শীঘ্র গণতন্ত্রের বাতায়ন খুলে যাবে। ভেসে যাবে আতঙ্ক উত্কণ্ঠা—দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা থাকবে অক্ষুণ্ন। অন্যথায় জুজুর আবির্ভাব ঘটা বিচিত্র নয়। সমস্ত জল্পনা-কল্পনা, আতঙ্ক-উত্কণ্ঠার অবসান করতে হলে ক্ষমতাসীনদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। জাতিকে আশ্বস্ত করতে, অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিতে সরকারি মহলই নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ। তাই ক্ষমতাসীন সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে, তৈরি করতে হবে সমঝোতা ও সংলাপের বাতাবরণ। এতে তাদের মান-মর্যাদা বিনষ্ট হবে না, তারা কোন ভাবেই খাটোও হবেন না। বরং এর মধ্যদিয়ে যে সময়োচিত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া হবে। তাতে তাঁদের প্রতি জনসমর্থন ও শ্রদ্ধা বাড়বে বৈ কমবে না। লেখক :অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়