[ রা জ নী তি ]

নির্বাচন হবে না!

‘এক বছরের রাজা’। বাক্যটি সুকুমার রায়ের একটি গল্পের শিরোনাম। বাংলা-দেশের বর্তমান রাজনীতির কথা ভাবতে পারলে হয়তো লেখক শিরোনামে একটু সংশোধনী নিয়ে আসতেন। হয়তো গলা খাকিয়ে তিনি লিখতেন ‘পাঁচ বছরের রাজা’। যাহোক গল্পে আসি। এক সওদাগরের একজন ক্রীতদাস ছিল যে সওদাগরের একমাত্র ছেলেকে জলে ডুবা থেকে বাঁচায়। পুরস্কারস্বরূপ সওদাগর ক্রীতদাসকে জাহাজ ভর্তি সম্পদ দিয়ে বাণিজ্য করতে বিদেশ পাঠায়। কিন্তু ক্রীতদাসের দুর্ভাগ্য যে সাগরে তার জাহাজ ডুবে যায়। ক্রীতদাসটি অনেক কষ্টে হাবুডুবু খেয়ে একটি দ্বীপের চড়ায় এসে ঠেকল। অতঃপর যখন সে দ্বীপের ভিতর যেতে লাগল তখন দেখতে পেল সেখানে একটি চমত্কার শহর রয়েছে। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেল শহরের লোকজন তাকে ‘মহারাজা, মহারাজা’ সম্বোধন করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেল। বেচারা হতবিহ্বল হয়ে লোকদের জিজ্ঞাস করল ‘তোমরা কেনই বা আমায় মহারাজা বলছ আর কেনই বা এমন সম্মান দেখাচ্ছ? লোকজন তখন উত্তর দিল যে আমরা কেউই মানুষ নই, আমরা সবাই প্রেতগন্ধর্ব। আমরা প্রার্থনা করেছিলাম প্রতিবছর যেন একজন মানুষ এসে আমাদেরকে শাসন করে যায়। প্রার্থনা অনুসারে প্রতি বছরই আমরা একজন মানুষ পাই এবং তাকে ধরে এনে রাজা বানাই। তবে এক বছর পর আমরা তার রাজমুকুট কেড়ে নেই এবং অন্য একটি দ্বীপে তাকে নির্বাসন দেই। এই পরিণতির কথা ভেবে ক্রীতদাস রাজার ক’দিন ঘুম হলো না। একদিন তিনি দেশের সকল পন্ডিত ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং মিনতি করে বললেন, ‘আপনারা আমাকে উপদেশ দিন— যাতে বছর শেষে এই সর্বনাশের দিনের জন্য প্রস্তুত হতে পারি’। এক প্রবীণ বৃদ্ধ মহারাজাকে নির্বাসনের দুঃখ-কষ্ট থেকে উত্তরণের উপায় দেখালেন। তিনি বললেন, যেহেতু এই এক বছর আপনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন সেহেতু এখন আপনি এই রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ লোকদের সেই দ্বীপ (যেখানে আপনাকে নির্বাসন দেয়া হবে) পাঠিয়ে দিন। ‘সেখানে বাড়ি করে, বাগান করে, চাষবাসের ব্যবস্থা করে চারদিক সুন্দর করে রাখুন। ততদিনে ফুলে-ফলে দেশ ভরে উঠবে, সেখানে লোকের যাতায়াত হবে। আপনার এখানকার রাজত্ব শেষ হতেই সেখানে আপনি সুখে রাজত্ব করবেন। বত্সর তো দেখতে দেখতে চলে যাবে, অথচ কাজ আপনার ঢের; কাজেই বলি, এই বেলা খেটে-খুটে সব ঠিক করে নিন। রাজা তখনই হুকুম দিয়ে লোকলস্কর, জিনিসপত্র, গাছের চারা, ফলের বীজ, আর বড় বড় কল-কবজা পাঠিয়ে আগে থেকে সেই মরুভূমিকে সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলেন।’ তারপর বছর যখন ফুরিয়ে এল, তখন প্রজারা তার রাজমুকুট ফিরিয়ে নিল এবং তাকে ঐ মরুভূমিতে নির্বাসনে পাঠাল। ‘কিন্তু সে আর এখন মরুভূমি নাই চারদিকে ঘর-বাড়ি, পথ-ঘাট, পুকুর-বাগান। সে দেশ এখন লোকে লোকারণ্য। তারা সবাই এসে ফূর্তি করে শঙ্খ ঘণ্টা বাজিয়ে তাকে নিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে দিল। এক বছরের রাজা সেখানে জন্ম ভরে রাজত্ব করতে লাগলেন।’ বাংলাদেশের মানুষ পাঁচ বছরের জন্য রাজা নির্বাচন করে। বিএনপি বা আওয়ামী লীগকে রাজমুকুট (ম্যান্ডেট) দেয়। পাঁচ বছর পর আবার রাজমুকুট ফিরিয়ে নেয়। নতুন রাজা নির্বাচন করে। নতুন রাজা পুরাতন রাজাকে নিজ দেশেই নির্বাসন দেয়। পুরাতন রাজাকে নতুন রাজা ব্যাপকভাবে নিপীড়ন করে, হয়রানি করে। রাজদণ্ডের আঘাতে জনতার জীবন বিপর্যস্ত করে তুলে। নির্বাসনে যাওয়ার ভয়ে করণীয় জানতে রাজ্যের বুদ্ধিমান লোকদের সাথে পরামর্শ করে না। বুদ্ধিমান লোকদেরকে প্রতিপক্ষ ভাবে। নির্বাসনের ভয়ে নিজের রাজ্যকে সুন্দর করে গড়ে না তুলে আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে এবং নির্বাচনী ম্যাকানিজম নিয়ে কূট-কৌশল করে। সুকুমার রায়ের ক্রীতদাস রাজা যেখানে মরুভূমিকে সমৃদ্ধ করে সাজিয়ে তুলে আজীবনের জন্য রাজত্ব করে সেখানে আমাদের ক্ষমতাসীন নেতারা কূট-কৌশলের মাধ্যমে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চায়। কেউ বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে নিজের পছন্দ মত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে চায় আবার কেউ এক ধাপ এগিয়ে এই ব্যবস্থাকেই বাতিল করে দিতে চায়। এভাবে সবাই চায় ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে, নির্বাসনে না যেতে। কিন্তু কেউই সফল হয় না। বাংলাদেশের সর্বত্র এখন একটিই প্রশ্ন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কি হবে? জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সকল গণমাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশের জনগণও বসে নেই। পথে-ঘাটে সর্বত্রই এই সন্দেহ। সুশীল সমাজের লোকজন অনেক আগে থেকেই এই সন্দেহ প্রকাশ করে আসছে। তবে সরকার দলীয় রাজনীতিবিদগণ তাদের এই আশঙ্কাকে এতোদিন ভাল চোখে দেখেননি। তবে সেদিন আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা যখন বলে ফেললেন নির্বাচন না হলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তার সংসদই বহাল থাকবে তখন জনমনে সন্দেহটা আরো দৃঢ় হয়। মাস তিনেক আগে এই ইত্তেফাক পত্রিকায় চারটি মঞ্চ নাটকের দৃশ্য তুলে ধরেছিলাম। একটি কল্পিত দৃশ্য এমন ছিল যে, বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে না এবং ভয়ঙ্কর সংঘাত অনিবার্য। যা হোক, আওয়ামী লীগের এই প্রবীণ নেতার বক্তব্য আমরা বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী কোনো সরকারের পক্ষেই পাঁচ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকা বৈধ নয়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে পাঁচ বছরের জন্য; পাঁচ বছর ১ ঘণ্টার জন্যও নয়। জরুরি অবস্থা জারি ছাড়া পাঁচ বছর পর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ কারোরই নেই। পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানের মূল স্পিরিটের বাইরে যেতে পারবে না। আর সংশোধনীও এই কথা বলে না। যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেছে, সেই লক্ষ্যেই পাঁচ বছর পর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নেই। আর জরুরি অবস্থা দিয়ে ক্ষমতায় থাকা অত্যন্ত জটিল একটি পরিস্থিতি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো একটি বিরাট দল কেনইবা এই ঝুঁকি নেবে? তাই আওয়ামী লীগের এই বর্ষীয়ান নেতাকে বিনয়ের সাথে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার দু’লাইন স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ‘ওগো, ভালো করে বলে যাও।/ বাঁশরি বাজায়ে যে কথা জানাতে সে কথা বুঝায়ে দাও।’ বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন দু’ভাবে হতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক আনীত পঞ্চদশ সংশোধনী অনুসারে নির্বাচন হলে তা অবশ্যই ২৪ জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যে হতে হবে [১২৩(৩) ক]। নির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হতে হলে সাধারণ নির্বাচন ২৬ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে হতে হবে। এক্ষেত্রে সংবিধান অনুসারে এই সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সুযোগ নেই। আর যদি তা হয় তাহলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও নির্ধারিত মেয়াদের পর বেআইনী হয়ে যাবে। স্থিতিশীল অবস্থায় সংসদ কর্তৃক কোনো আইন দিয়ে সংসদ বা সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যায় না। সংসদ ও সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধি বা কমানোর ক্ষমতা প্রত্যক্ষভাবে জনগণের; পরোক্ষভাবে জনপ্রতিনিধিদের নয়। যাহোক, আওয়ামী লীগ যদি সংবিধান অনুসারে সংসদ নির্বাচনে উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে সে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? তাছাড়া, বর্তমান পরিস্থিতি, সরকারি দলের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য থেকে কি মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ সত্যি সত্যি নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে? ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুন:প্রবর্তনের পর থেকে দেখা গেছে যে, প্রতিটি সরকারের শেষ বছর সরকারগুলো ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করতো। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়নই লক্ষণীয় ছিল। তাছাড়া, বিরোধী দলের তুলনায় নির্বাচনী প্রচারে এগিয়ে থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ নেতৃবৃন্দ সারাদেশে ব্যাপক সাংগঠনিক সফরের আয়োজন করে, বড় বড় সভা-সমাবেশেরও আয়োজন করে। সরকার এগুলোকে নির্বাচনী সফর না বললেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ এগুলোকে নির্বাচনী সফর হিসেবেই আখ্যায়িত করেন। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আর তিন-চার মাস বাকি থাকলেও সরকারি দলের মধ্যে ব্যাপক নির্বাচনী আয়োজন তেমনভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল যেহেতু বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে আগ্রহী নয় সে ক্ষেত্রে তাদেরও কোনো নির্বাচনী উদ্যোগ নেই। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী শুধুমাত্র মহাজোটের শরিফ জাতীয় পার্টি আশিটি আসনে প্রার্থী ঠিক করেছে। গত ঈদেও নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের আনা-গোনা তেমনভাবে লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ অতীতে দেখা গেছে নির্বাচনের আগের ঈদগুলোতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করে থাকে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হলে নির্বাচনী ম্যাকানিজমের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন কমিশনকে সকল রাজনৈতিক দলের পূর্ণ আস্থায় থাকতে হবে। অথচ নির্বাচনের কয়েক মাস পূর্বে নির্বাচন কমিশনের কতিপয় উদ্যোগ তাকে বিতর্কিত করে তুলছে। নির্বাচন কমিশন আরপিও ১৯৭২ সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। এতে রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর রাজনৈতিক দলকে মনোনয়ন ঘোষণা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে এতোদিন যে ফ্লোর ক্রসিং করার সুযোগ ছিল না সংসদে, এখন সেই বাধা তৈরি হলো দলের মধ্যেই। এই সুপারিশ পাস করা হলে নেতৃবৃন্দ দলের আরো আজ্ঞাবহ কর্মীতে পরিণত হবেন। তাছাড়া, নির্বাচন কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজের ক্ষমতা হ্রাস করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ৯১-ই বাতিলের সুপারিশও নির্বাচন কমিশনকে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন করেছে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীসহ ২০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো বর্তমান সংবিধান অনুসারে সংসদ সদস্যগণ স্বীয় পদে বহাল থেকে নির্বাচন করবেন। এর ফলেও প্রার্থীদের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করবে। এই অবস্থায় নির্বাচন কমিশন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থায় কতটুকু থাকতে পারবে সেটা সন্দেহের বিষয়। আর এই বিষয়গুলোও ভবিষ্যত্ নির্বাচনকে অনিশ্চিত করেছে। নির্বাচন সব সময় শুধুমাত্র এক দলের বিজয়, অন্য দলের পরাজয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিবর্তন হয়। কখনো কখনো বিপ্লব হয়। উদাহরণ স্বরূপ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিজয়ের ফলেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশে আস্তিক-নাস্তিক বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আগামী নির্বাচনের আগে ও পরে এই বিষয়গুলো নির্ধারকের ভূমিকায় থাকবে। ফলে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং না হওয়া উভয়ই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও সুন্দর গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের অপেক্ষায় রইলাম। লেখক: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়