তাহারা কেন বখিয়া যায়

মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া চলিয়াছে নেশা সর্বনাশা। জীবনের সুখ ও স্বপ্নের ক্যানভাস আজ ধূসর-মলিন, সেখানে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। শান্তির ললিত বাণী শোনাইছে ব্যর্থ পরিহাস। নবীন প্রজন্মের দিগন্তবিসারী স্বপ্নসাধনা এবং সাফল্য আমাদের আশান্বিত ও গৌরবান্বিত করে। কিন্তু, সেই আশা ও গৌরবের পাশাপাশি মাদকের ছোবল কাটিয়া চলিয়াছে এইখানে সর্বনাশের খাল। মানবিক-পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন যেন ছিন্নভিন্ন হইতে বসিয়াছে। নেশার ঘোরে দিশাহারা সন্তানও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুলিয়া গিয়াছে নাড়ির বন্ধন। জনক-জননীর মায়া-মমতা, তাহাদের শাসন বারণ ছেলেমেয়েদের নিকট দুর্বিষহ মনে হইতেছে। বাপ-মায়ের রক্তে হাত রঞ্জিত করিতেও তাহারা নিষ্কম্প। মাদকাসক্ত সন্তান পিতা কিংবা মাতাকে হত্যা করিয়াছে- এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা একালে আর বিরল নয়। গত তিন-চার বত্সরের মধ্যে এই ধরনের মর্মান্তিক হত্যাকান্ড সংঘটিত হইয়াছে একাধিক। এই বাংলাদেশের শহর ও গ্রামে এখন এমন বহু পরিবার রহিয়াছে, যেখানে বাসা বাঁধিয়াছে নারকীয় যন্ত্রণা। বখিয়া যাওয়া সন্তান হরণ করিয়া চলিয়াছে পরিবারের সকল শান্তি। অভিভাবকেরা এ ক্ষেত্রে অসহায়। এক পরিসংখ্যান হইতে জানা যায় বাংলাদেশে নেশাসক্ত নারী ও পুরুষের সংখ্যা কম করিয়া হইলেও দেড় লক্ষ। আর, ইহাদের এক বৃহদাংশই টিনএজ অর্থাত্ যাহাদের বয়স তের হইতে উনিশ বত্সর (থারটিন হইতে নাইনটিন।) এই বয়ঃসন্ধিকালে যে সব ছেলেমেয়ে নেশাসক্ত হইয়া পড়ে তাহাদের বেশিরভাগই আর সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করে না বা করিতে পারে না। নেশার উপকরণের অভাব নাই। নিত্য-নূতন নেশার বস্তু আসিতেছে। নেশার পেছনে টাকা উড়িতেছে। মাদক ব্যবসায়ীরা দুই হাতে কামাই করিয়া লইতেছে। নেশার পেছনে নাকি বত্সরে ব্যয় হইয়া থাকে মাত্র ১৭ হাজার কোটি টাকা। এই সময়ের সর্বাধিক আলোচিত নেশার নাম ইয়াবা। নেশার বস্তু এবং উপায় আছে কত প্রকারের তাহা ভাল জানে নেশার জগতের বাসিন্দারাই। বলার অপেক্ষা রাখে না, যাহারা নেশা করে তাহারা বখিয়া যাওয়া, পথভ্রান্ত। অতঃপর প্রশ্ন এই যে, তাহারা নেশা করিয়া বখিয়া গিয়াছে নাকি বখিয়া যাইবার পর নেশাসক্ত হইয়াছে। এই জিজ্ঞাসার জবাবের মধ্যেই রহিয়াছে কার্যকারণ ও সমাধানসূত্র। বস্তুতঃ কৈশোরে বখিয়া যাইবার পরই ছেলেমেয়েরা নেশার জগতে প্রবেশ করে। কেন এবং কেমন করিয়া বখিয়া যায় তাহাই জানিবার-বুঝিবার বিষয়। ছেলেমেয়েদের বাড়িয়া উঠিবার সময়, যাহাকে বয়ঃসন্ধিকাল বলিয়া চিহ্নিত করা হয়—সেই সময়টা বড় বেশি স্পর্শকাতর। পাশ্চাত্যে এই বয়সটাকেই টিনএজ বলা হয়। এই বয়সে মনের মধ্যে বাসা বাঁধে কৌতূহল, জাগিয়া ওঠে অজস্র জিজ্ঞাসা। মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে মনের তিনটি স্তরের কথা বলিয়াছেন। সেইগুলি হইল অদস (Id), অহং (Ego) এবং অধিশান্তা (Super-ego) । সবকিছু ছাড়াইয়া অহং যখন প্রবল হইয়া যায়, তখন মানুষ হইয়া ওঠে বেপরোয়া। বয়ঃসন্ধিকালে চারপাশের পরিবেশের মধ্যে হাজার রকমের অসঙ্গতি দেখিয়া ইগোর ভয়ঙ্কর হইয়া উঠা বিচিত্র নয়। পরিবারে-সমাজে ভূত-ভবিষ্যত্ না ভাবিয়া, নিজেদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল, মূল্যবোধ ইত্যাদি ভুলিয়া গিয়া আমরা অনেক সময় এমন জীবনাচারে প্রলুব্ধ হই, যাহা বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ। কৈশোরের কৌতূহলী মন সেই অসামঞ্জস্য, সেই বৈপরীত্যের মাঝে তালগোল পাকাইয়া ফেলে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে কিশোরমন ঘোরপাক খায়। বাহির হইবার পথ খুঁজিয়া পায় না। ক্রমে তাহাকে গ্রাস করে হতাশা। বাহিরে কাঁচা কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে পাকিয়া যাইতে শুরু করে। এই পাকিয়া যাওয়াকেই বলে বখিয়া যাওয়া কিংবা ইচড়ে পাকা। এইভাবে পাকিয়া যাওয়া ছেলেমেয়েদের অনেকেই নেশার হাতছানি উপেক্ষা করিতে পারে না। নেশা তাহাদের এমন এক জগতে লইয়া যায় যেখানে কোনো প্রশ্ন নাই, দুঃখ নাই, সন্তাপ নাই, আছে শুধু ঘুমঘুম উদ্দাম শান্তি। কিন্তু নেশার জগত্ আর বাস্তবের জগত্ সম্পূর্ণ বিপরীত। সুতরাং সংঘাত অনিবার্য। সেই সংঘাত কত ভয়ঙ্কর রূপ পরিগ্রহ করিতে পারে তাহা চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইবার আর কি কোনো প্রয়োজন আছে!