বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান’র নন্দিত দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৩, ২০:৩০
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যারা স্বেচ্ছায় জীবন দান করেছেন তাদের মধ্যে সরকারিভাবে ৭ (সাত) জনকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হিসেবে ভূষিত করা হয়েছে এবং ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ পদক প্রদান করা হয়েছে। বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট মতিউর রহমান তাদেরই একজন। আমাদের সাত বীরশ্রেষ্ঠ’র পোস্টার, ব্যানার, ক্যালেন্ডার অথবা একত্রিত কোন ছবিতে মাথায় বিমান বাহিনীর ক্যাপ ও চোখে কালো চশমা এবং বুকে ঈগলের মনোগ্রাম দেখলেই অন্য আর ছয়টি ছবি থেকে তাকে আলাদা করে চিনতে ভুল হয় না। ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট এই বীর বিমানসেনা মতিউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। সেদিন ছিল শুক্রবার। ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট মতিউরের জীবনাবসানের ঘটনাটা ছিল যেমনি রোমাঞ্চকর তেমনি উত্তেজনা ও দেশপ্রেমের অবিচ্ছেদ্য সুতায় বাঁধা।
১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় কন্যা তুহিন জন্মগ্রহণ করেন।
এদিকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় পাকিস্তানীদের আচরণ দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিদের নিরঙ্কুশ বিজয়ে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের গড়িমসিতে সৃষ্ট জটিলতায় বাঙালি বিমান সেনারা খুবই সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি অবলোকন করছিলেন। এমনি অবস্থায় জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি ২ মাসের ছুটিতে ঢাকা আসেন।
৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি উজ্জীবিত হন ও ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’কে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে তিনি ছিলেন নরসিংদীর গ্রামের বাড়িতে। ঐ রাতের গণহত্যার কথা রেডিওতে শুনতে পান এবং গ্রামের লোকদের একত্রিত করে খান সেনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে অস্ত্রসহ পালিয়ে আসা বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও একত্রিত হতে থাকে। তিনি সকলকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেন।
১৪ এপ্রিল পাকিস্তানী একটি বিমান থেকে তাদের ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালানো হয়। তিনি উপলব্ধি করেন একটি বিমান হলে তিনি এই হামলার প্রকৃষ্ট জবাব দিতে পারতেন। তিনি মাটি ছুঁয়ে শপথ করলেন, যেভাবেই হোক একটি পাকিস্তানী বিমান ছিনিয়ে এনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করবেন।
ইতোমধ্যে তার ছুটির মেয়াদ শেষ হয়েও দুই মাস পার হয়ে গেছে। মনের সুপ্ত আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে কথা বলেন এম.কে বাশার এবং সুলতান মাহমুদের সাথে। তারপর ৯ মে স্ত্রী ও কন্যাদ্বয়সহ করাচি ফিরে যান। তিনি কাজে যোগ দিলেন কিন্তু পাকিস্তানীরা তাকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করলো। তাঁকে তাঁর নিজস্ব দায়িত্বে না দিয়ে দেয়া হলো ‘ফ্লাইট সেফটি অফিসার’র দায়িত্ব। তিনি মর্মাহত হলেন, হোঁচট খেলেন কিন্তু দমলেন না। সুযোগ খুঁজতে থাকলেন। একবার সুযোগ এসে হাতছাড়াও হয়ে গেল। ইতোমধ্যে তার মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেল। মিলি রহমান সব ধরতে পারলেন। শেষ অবধি প্রকাশ করলেন সব কথা। মিলি রহমান বাধা দিলেন না। তাইতো তিনি বীরজায়া।
সুযোগ খুঁজতে থাকলেন মতিউর। বিমান চালনার প্রশিক্ষক হিসেবে মতিউরের বেশ সুনাম ছিল এবং তাঁর পাকিস্তানী ছাত্রদের মধ্যে মিনহাজকে টার্গেট করে প্রশিক্ষণ সিডিউল দেখলেন তিনি।
চূড়ান্ত সুযোগ এলো। সেদিন ২০ আগস্ট, শুক্রবার। রশীদ মিনহাজের ফ্লাইং সিডিউল দুপুরে। একটা টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান সামনে এগিয়ে এলো। বিমানের সামনের সিটে রশীদ মিনহাজ। পেছনের সিটটিতে প্রশিক্ষক বসেন কিন্তু তা আজ শূন্য। মিনহাজ একাই বিমানে উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি। উড্ডয়নের পূর্বে বিমানের সামনে এগিয়ে এলেন মতিউর। মিনহাজ দেখলেন তার প্রশিক্ষককে। বিমান থামিয়ে কেনোপী উঁচু করে কিছু জিজ্ঞেস করতে চায় মিনহাজ। সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি মতিউর। লাফ দিয়ে বিমানের পেছনের সিটে উঠে হাতের রুমালে মাখা ক্লোরোফরম দিয়ে অচেতন করার অবসরে বিমান চালনার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিলেন। ব্যাপারটি অতো সহজ ছিল না। বিমান উড়তে থাকলো খুব নিচ দিয়ে রাডারকে ফাঁকি দিয়ে। ‘ব্লু-বার্ড-১৬৬’ নামের টি-৩৩ মডেলের প্রশিক্ষণ বিমানটি হাইজ্যাক হচ্ছে এটি মিনহাজ মশরুর বিমান ঘাঁটি কন্ট্রোল রুমকে জানিয়ে দিল। মতিউর কোন এক ফাঁকে মিনহাজকে পেছনের সিটে ফেলে দিয়ে নিয়ন্ত্রণভার নিলেও পেছন থেকে মিনহাজ বাধা দিচ্ছিলো। ধস্তাধস্তিও হয়েছিলো। ব্লু-বার্ড উড়ে চলছিলো ভারতীয় সীমান্তবর্তী বিমান ঘাঁটির দিকে। আর মাত্র মিনিট চারেক চলতে পারলেই তা সম্ভব হতো। কিন্তু সিন্ধু প্রদেশের জিন্দাগ্রাম নামক এলাকার একটি বালুর ঢিবিতে আছড়ে পড়লো বিমানটি। এর সাথেই শেষ হয়ে গেল একটি উজ্জ্বল তারকার একটি স্বপ্ন।
দুর্ঘটনাস্থল থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে নিয়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মশরুর ঘাঁটিতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের জন্য নির্ধারিত স্থানে কবর দেয়া হয়। সেখান থেকে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর দেহাবশেষ ঢাকায় এনে ২৫ জুন মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনঃসমাহিত করা হয়। আজ আমরা স্বাধীন কিন্তু তিনি নেই। আজকের দিনে আমাদের কর্তব্য সব মুক্তিযোদ্ধাদের দেশপ্রেম ও মহান আত্মত্যাগকে স্মরণ করে নিজেদের গড়ে তোলা।
লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, শিশু-সাহিত্যিক, সাধারণ সম্পাদক,
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ফাউন্ডেশন