স্মরণ

সোজা পথের যাত্রী মাওলানা তর্কবাগীশ

মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন; কিন্তু তিনি ছিলেন মূলত একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ। তার জীবনের অনেক ঘটনার মধ্যে দুটো সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য- সলংগায় গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত অসহযোগ আন্দোলনে তার ভূমিকা, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তত্কালীন পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক এ্যাসেমব্লিতে তার বিদ্রোহ এবং মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ। যেমন ১৯২২ সালে, তেমনি ১৯৫২ সালে তিনি যে বলিষ্ঠতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় প্রদান করেন তা তাকে স্মরণীয় করে রাখবে। যদিও মাওলানা ভাসানী ও তর্কবাগীশ ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত এবং উভয়েই মাওলানা; কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বে মূলগত পার্থক্য চোখে পড়ে। শিক্ষা বিস্তারের জন্য মাওলানা তর্কবাগীশের আগ্রহ ছিল প্রগাঢ় এবং ঐকান্তিক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশের মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে না পারলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। তিনি কোনদিন ক্ষমতার অধিকারী হননি। তথাপি তার নিজের সাধ্যসীমায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ায় সর্বদাই তিনি এক সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৪৪ সালের কথা মনে পড়ে। আমাদের গ্রামের নামে যে প্রাইমারী বিদ্যালয়টি ছিলো ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সেই স্কুল গৃহটি অবস্থিত ছিল অন্য একটি গ্রামে। আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালেই স্কুল গৃহটি আমাদের গ্রামে স্থানান্তরের চেষ্টায় লিপ্ত হই; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক দৌরাত্ম্যে তা আর কিছুতেই সম্ভব হয়ে উঠছিল না। আমার সেই অব্যাহত প্রয়াস সফল হয় যখন আমি অনার্স পরীক্ষা দিয়ে গ্রামে ছিলাম এই মাওলানা সাহেবের সাহায্য যে কতভাবে পেয়েছিলাম তা বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। যখন যেখানে যাবার অনুরোধ করেছি, তিনি সেখানে গিয়েছেন। অতঃপর ১৯৪৯ সালে যখন সরকারি সহায়তায় পুলিশের তত্ত্বাবধানে স্কুল গৃহটি স্থানান্তর করে আমাদের গ্রামে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন মাওলানা সাহেবকে আমাদের মধ্যে পেয়েছিলাম। প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে তিনিই ছিলেন প্রধান অতিথি। এবারেও ছিল বর্ষাকাল এবং তিনি নদীপথে বজরা নৌকা নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন বিশাল জনসভায় তিনি যে ভাষণ দেন তা সকলের মর্মে স্পর্শ করেছিল। তার সেই ভাষণের মাধ্যমে তিনি শিক্ষা সম্পর্কে যে মূল্যবান কথাগুলো বলেন তা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সুপণ্ডিত মাওলানা তর্কবাগীশ সেদিন ইসলামের মহানুভবতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বার বার মানবতার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন যুক্তিগ্রাহ্য উদারতার কথা। ধর্ম সম্পর্কে ইসলামে যে কোনো ক্ষুদ্রতা নেই এর ওপর তিনি বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন যে, ইসলামে কোনো কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাসের স্থান নেই। আধুনিকতার প্রতি চোখ-মুখ ফিরিয়ে থাকতে হবে এমন কথা ইসলাম বিশ্বাস করে না। ইসলাম সর্বকালের সর্বযুগের উপযোগী একটি ধর্ম; কিন্তু মুসলমানরাই সেই ধর্মকে খাটো করে রেখেছে। ইসলামের অতীত গৌরবকে স্মরণ রেখে মুসলমানদের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ গড়ে তুলতে হবে বলে সবাইকে তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান। সিদিনের সেই জনসভায় তিনি পাকিস্তান প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, পাকিস্তানে স্বল্পকালের মধ্যেই পূর্ব বাংলাকে বঞ্চিত করবার একটি ষড়যন্ত্র দেখা যাচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রকে রুখতে হবে। ১৯৪৯ সালেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের উদ্দেশ্য ভাল নয়। পূর্ব বাংলার মানুষকে সাবধান থাকতে হবে। এখানেও তিনি যে একজন প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন। তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং বিলয় প্রত্যক্ষ করেছেন এবং দুটোতেই এক বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ছিলেন একজন খাটি বাঙালি। তার চরিত্রে কোনো বৈপরীত্য দেখা যায়নি। যেন-তেন করে ক্ষমতায় যেতে হবে এই জন্য তিনি রাজনীতি করেননি। তার সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিবেদিত ছিল মানব কল্যাণে, নিবেদিত ছিল বাঙালির হিত সাধনের প্রোজ্জ্বল আলোয় স্নাত। এজন্যই তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। [ আজ মাওলানা’র মৃত্যবার্ষিকী। লেখাটি পত্রস্থ হলো মরহুমের স্মৃতির স্মারণে।]