আলোকপাত
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ এখনও স্বপ্ন
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৩, ২২:০২
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ— এখনও স্বপ্ন। এ স্বপ্ন কবে পূরণ হবে কিংবা আদৌ পূরণ হবে কি-না, তা কেউ জানে না। পরপর কয়েকবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বাংলাদেশের স্থান গত বছর ছিলো ১৩তম, এবার ১২তম। তার অর্থ এই নয় যে, আমাদের দেশে দুর্নীতি কমেছে। দুর্নীতির সঙ্গে আমাদের সমাজের গাঁটছাড়া বাঁধা হয়ে গেছে কবেই, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে দুর্নীতি। আমাদের সমাজে দুর্নীতির এই যে ব্যাপকতা, তা ১দিনে হয়নি। কবে দুর্নীতির বীজ রোপণ করা হয়েছিলো বাংলাদেশ নামক এ ভূ-খণ্ডে তা বলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে দুর্নীতি নামক যে বীজটি রোপণ করা হয়েছিলো এক সময়, আজ তা পল্লবিত বৃক্ষ। বিষবৃক্ষ বলাই ভালো। এ বৃক্ষ সমূলে উত্পাটন করা কী সম্ভব? এ প্রশ্ন বিদগ্ধ জনের। এটা ঠিক দুর্নীতিকে সমূলে উত্পাটন করা হয়ত সম্ভব নয়। কিন্তু ন্যায়পরায়ণ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে দুর্নীতি কমিয়ে আনা অসম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা, নৈতিক মূল্যবোধের উজ্জীবন।
সুশাসন ও সুবিচার নিশ্চিত করতে না পারলে দুর্নীতির প্রবল মাত্রাকে কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। প্রশাসন, মানবাধিকার কমিশন এবং গণতন্ত্রের অন্য মৌলিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সততা, স্বাধীনতা, নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা নিয়ে এগিয়ে না আসলে দুর্নীতির মাত্রা কমবে না। সরকার, প্রশাসনের উপর রাজনৈতিক প্রভাব কোনো ভাবেই কাম্য নয়। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটালে, ক্ষমতার অপব্যবহার করলে, অর্থের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে চাকরি বা কাজ পাইয়ে দিলে দুর্নীতির মাত্রা যে বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। যে রাজনীতিবিদগণ ও প্রশাসন দেশ চালান- দেখা গেছে যে তারাই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। এমনটি চলতে থাকলে দুর্নীতির মাত্রা বাড়বে বৈ কমবে না। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কার্যকর বাস্তবায়ন-দুর্নীতি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে। সর্বোপরি দুর্নীতি দমন কমিশনকে যতোটা সম্ভব স্বাধীনতা দিয়ে কার্যকর করতে না পারলে দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে আনা অসম্ভব।
রাজনীতি, প্রশাসনসহ সমাজের সকল ক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে না পারলে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আমাদের বদনাম ঘুচবে না। যে দেশে দায়িত্বশীল, সাংবিধানিক পদে কর্তব্যরত ব্যক্তিবর্গ সম্পদের হিসেব দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না, সে দেশে দুর্নীতির মাত্রা কমবে কিভাবে?
দুর্নীতিকে জিইয়ে রেখে সমাজ কিংবা দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং এতে করে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। দুর্নীতির প্রভাব পরিমাপের জন্যে আমাদের দেশে এখনো কোনো মাপকাঠি নেই। রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে দুর্নীতির বিচার করতে না পারলে দুর্নীতি দমন কিংবা আইনের শাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তথ্যপ্রবাহের অবাধ স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যম দুর্নীতি দমনে তাত্পর্যমণ্ডিত ভূমিকা পালন করতে পারে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অন্যের জমি দখল— মারাত্মক রকম দুর্নীতি। এসব অপরাধকে দেশের সাধারণ আইনের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন আইনের আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি দমনে সুচিন্তিত ও বহুমুখী কৌশল প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রশাসনকে গণমুখী ও দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখাও দুর্নীতির মাত্রা কমানোর অন্যতম শর্ত। আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও গরিব দেশেই দুর্নীতির মাত্রা বেশি। মানবাধিকার নিশ্চিত, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সমাজ উন্নয়ন করতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে ও ব্যূহ রচনা করতে হবে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট