অবিলম্বে এই ঔদ্ধত্যের লাগাম টানিয়া ধরুন

স্বরূপকাঠিতে কৃষকলীগ নেতা আশিস বড়ালের উপর ন্যক্কারজনক হামলার রেশ কাটিতে না কাটিতেই কাউখালীতে নৃশংসভাবে খুন হইয়াছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা এনামুল হক ইনু। গত মঙ্গলবার বিকালে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বেকুটিয়ায় নিজ বাড়ির সন্নিকটে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্য দিবালোকে যেইভাবে তাহাকে হত্যা করিয়াছে তাহাতে কাউখালী শুধু নহে—ভাণ্ডারিয়া, রাজাপুরসহ সমগ্র পিরোজপুরেই আতঙ্ক ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইহা অনস্বীকার্য যে, নিহত যুবলীগ নেতার অতীত কার্যকলাপের যেই বৃত্তান্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছে—তাহাও কম ভীতিকর নহে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একজন তালিকাভুক্ত অপরাধী। তাহার অপরাধের পরিধিও অনেক বিস্তৃত। সর্বোপরি, ২০০৪ সালে সংঘটিত এক খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন তিনি। তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজনৈতিক বিবেচনায় সেই সাজা মওকুফ করা হইয়াছিল। কিন্তু তাহার স্বভাব বদলায় নাই। বরং পুলিশ সূত্রেই জানা যাইতেছে যে, ‘প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া’ তথা ক্ষমতার আশ্রয়-প্রশ্রয় পাইয়া তিনি আরও বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছিলেন। সীমা লঙ্ঘনের পরিণতি যে কখনই ভালো হয় না— তাহা কোনো নূতন কথা নহে। আমরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছি যে, আইনকে নিজস্ব গতিতে চলিতে না দিলে এবং প্রশাসন তাহার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করিলে তাহার পরিণতি ভয়াবহ হইতে বাধ্য। কিন্তু তাহাতে কর্ণপাত করা হয় নাই। আইন নিজস্ব গতিতে চলিলে এবং প্রশাসন যথাযথভাবে তাহার দায়িত্ব পালন করিলে এই দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হয়তো এড়ানো যাইত। রোধ করা যাইত আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার এই সর্বনাশা প্রবণতা। আইন যে নিজস্ব গতিতে চলিতেছে না আশিস বড়ালের ঘটনাটিই তাহার উত্কৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং স্থানীয় দুইজন সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে তাহার উপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। শুধু হামলাই নয়, অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করা হইয়াছে সংখ্যালঘুদের। এই হামলায় যিনি নেতৃত্ব দিয়াছেন তাহাকে সকলেই চেনেন। হামলার প্রতিবাদে আতঙ্কিত সংখ্যালঘুরা সভাসমাবেশ করিয়াছেন। সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে সংবাদপত্রে। থানায় মামলাও হইয়াছে। কিন্তু ঘটনার তিন সপ্তাহ পরও দায়ী ব্যক্তিটিকে গ্রেফতার করা হয় নাই। বরং তাহার ভয়ে আশিস বড়ালকে পালাইয়া বেড়াইতে হইতেছে। সেইসাথে বাড়িছাড়া হইতে হইয়াছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মানুষকে। ইতঃপূর্বে ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তার পরিণতি সম্পর্কে আমরা সরকারকে সতর্ক করার চেষ্টা করিয়াছি। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলিয়াছি যে, এই ধরনের প্রতিকারহীনতা মানুষকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলিয়া দেয়, বাধ্য করে আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইতে—যাহা কোনোভাবেই কাম্য হইতে পারে না। সময় বদলাইয়া গিয়াছে। কবিগুরুর ভাষায় বলিতে হয়, ‘পুরনো সঞ্চয় লইয়া বেচাকেনা আর চলিবে না’। কিন্তু আমাদের পুলিশ ও প্রশাসন বোধকরি তাহা বুঝিতে পারিতেছে না। করদাতা জনগণ তাহাদের প্রতিটি ক্রিয়াকলাপ, আচার-আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করিতেছে। সঙ্গত কারণেই অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে বর্তমানে তাহাদের দায়দায়িত্ব যেমন অনেক বেশি, তেমনি ঝুঁকিও অধিক। অতএব, তাহাদের বুঝিয়া-শুনিয়া পা ফেলিতে হইবে। তাহারা যদি যথাযথভাবে তাহাদের আইনানুগ দায়িত্ব পালন না করেন—তাহা হইলে রাজনীতিকরা শুধু নয়, প্রশাসনের চিহ্নিত ব্যক্তিরাও যে রেহাই পাইবেন না তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে আমরা এখনও আশাবাদী। স্বরূপকাঠির ঘটনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবহিত আছে বলিয়াই আমাদের ধারণা। প্রকাশ্যে আশিস বড়ালের উপর হামলার মধ্য দিয়া যিনি চরম ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাইয়াছেন, আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে শক্ত হাতে তাহার লাগাম টানিয়া ধরিবেন।