তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের খসড়া
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩১
সরকার অনলাইন ব্যবহারকারীদের নিয়া খুব চিন্তায় পড়িয়াছে এবং তাহাদের নিয়ন্ত্রণে আনিবার জন্য ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সংশোধনী আনিতেছে। এই কথা সঠিক যে, ইন্টারনেটকেন্দ্রিক সাইবার অপরাধ পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং একটি আইনী পরিকাঠামোর আওতায় ইহাকে মোকাবিলা করিতে হইবে। কিন্তু তাহা করিতে গিয়া জনগণের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার ব্যাহত হইবার উপক্রম হইয়াছে। তাই এই সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন বা তাহার সংশোধনী আনয়নের পর আইনটির চেহারা যাহা দাঁড়াইতেছে তাহা, কিছু অপরাধীকে শাস্তিপ্রদান নহে, আইনটি সামাজিক মাধ্যমে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করিতে থাকা পুরা অনলাইন সমাজকে যেন নিয়ন্ত্রণ করিতে চাহিতেছে। প্রথাগত মূলধারার গণমাধ্যমে তথ্যের প্রবাহ একমুখী। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমগুলিতে দ্বিমুখী পদ্ধতিতে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটাইতেছে। মানুষের এই পারস্পরিক যোগাযোগ মাঝে মাঝেই রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্ম দেয়। বিশ্বব্যাপী শাসকেরা তাই এই স্বাধীন মিথস্ক্রিয়াকে ভয় পাইয়া নিয়ন্ত্রণে আনিতে চাহিতেছে।
অন্তত, তথ্যপ্রযুক্তি আইনে যেরূপ পরিবর্তন আনা হইতেছে তাহা দেখিয়া এমন মনে করাই স্বাভাবিক। আগামী ১২ সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসিবে। আইনটির সংশোধনী সংসদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করা যাইতো। কিন্তু গত ১৯ আগস্ট মন্ত্রিসভা অধ্যাদেশ আকারে সংশোধনীটি পাস করিয়াছে। আইন মন্ত্রণালয় ইহা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়া পাস করিলেই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে আইনটির নামকরণ হইবে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (সংশোধনী) অধ্যাদেশ ২০১৩। আশংকার বিষয় হইলো, সংশোধনীতে কিছু গুরুতর সিদ্ধান্ত কার্যকর করিবার প্রস্তাব দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে কেবল ১০ বত্সরের সর্বোচ্চ সাজা বাড়াইয়া ১৪ বত্সরই করা হয় নাই, সকল অপরাধ জামিন-অযোগ্য এবং সব অপরাধকেই আমলযোগ্য করিবার প্রস্তাব করা হইয়াছে। আমলযোগ্য অপরাধ কেহ করিলে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের বিধান রাখা হইয়াছে অধ্যাদেশে।
একজন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাহাকে অপরাধী বলা যায় না। তাই কোনো অপরাধকে বিচারের পূর্বেই জামিন-অযোগ্য বলা যায় না। সাইবারপরিসরে যেমন অপরাধপ্রবণতা আছে, কিন্তু তাহার চাইতে বহুল পরিমাণে রহিয়াছে মানুষের স্বাধীনভাবে কথা বলিবার চর্চা। স্বাধীন মত প্রকাশ একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ানির্ভর সাধারণ মানুষের এই মত প্রকাশের সুযোগটি প্রায়শই সুশাসন দিতে ব্যর্থ সরকারের বিপক্ষে যায়। পৃথিবীব্যাপী সরকারগুলি তাহাদের শাসন ও সেবাকার্য অধিক জনমুখী, উন্নত ও কার্যকর করিবার পরিবর্তে সামাজিক মাধ্যমের সদস্যদের মত প্রকাশের বিষয়টিকেই বাধাগ্রস্ত করিতে চাহিতেছে। প্রস্তাবিত আইনটির মধ্যে সেই লক্ষণ স্পষ্ট। অপরাধী ও সাধারণ ব্যবহারকারীকে এই আইন সমানভাবে দেখিতেছে এবং যেকোনো বিরুদ্ধ মতকে আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করিবার সুযোগ সরকারকে করিয়া দিতেছে এবং ইহার শাস্তি জামিন-অযোগ্য পর্যায়ে রাখিবার ব্যবস্থা করিতেছে। একথা ঠিক বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার করিয়া ব্যক্তি অবমাননা করিয়া থাকেন, অপরের ক্ষতিসাধন করিয়া থাকেন—এইভাবে সম্ভাবনাময় একটি মাধ্যমকে কালিমালিপ্ত করিয়া থাকেন। কিন্তু ব্লগার ও সামাজিক মাধ্যমের বেশিরভাগ ব্যবহারকারীই পরস্পরের যোগাযোগ, বন্ধুত্ব রক্ষা, সাহিত্যচর্চা, রাজনৈতিক ভাবনা বিনিময়ের জন্য এই মাধ্যমগুলিকে ব্যবহার করিয়া থাকেন। ইহা তাহাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের অংশ। প্রস্তাবিত সংশোধনীটি কেবল মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারই খর্ব করিবে না, ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন চর্চাকেও বাধাগ্রস্ত করিবে। ইহা ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হইবে। তাই আইনের সংশোধনীটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার এবং সংসদে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধনীটি চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।