চাকরির চেয়ে ব্যবসার প্রতি জোর দিতে হবে
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৩
আজ আমাদের পড়ালেখার শুরু থেকেই ‘চাকরি’ নামক শব্দটা মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। চাকরি আমাকে করতে হবে এবং চাকরি আমাকে পেতেই হবে এই মন-মানসিকতা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি করে চলেছে। পড়ালেখা শেষ করে কিংবা পড়ালেখার মাঝামাঝি কিছু করা কিংবা কিছু বোঝার চেষ্টা করা যেন আমাদের এক ধরনের বোকামি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পড়ালেখা শেষ করে চাকরি ছাড়া অন্য কোন পেশায় নিয়োজিত হওয়া কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য করার মত কোন চিন্তা-ভাবনা আমাদের মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে দেয়া হয় না কিংবা বাসা বাঁধানোর চেষ্টা করা হয় না বললেই চলে। যারা পড়ালেখা করতে পারে না তারাই শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। এই ধরনের মন-মানসিকতা আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গেছে। আর যারা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে পড়াশুনা করে তাদের বেশিরভাগই ব্যবসা-বাণিজ্য করে না। ফলে আমাদের শিক্ষার চিন্তার ধারণাটা সমাজে সম্পূর্ণ বিপরীত আকার ধারণ করেছে। ফলে আমরা সকলেই চাকরির পিছনে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছি, কিন্তু আমরা সকলেই চাকরি পাচ্ছি না। কেননা আমরা যদি সকলেই চাকরি করি কিংবা চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করি তাহলে আমাদের চাকরির ক্ষেত্র কে তৈরি করবে? আর এত চাকরিই বা আমাদের কে দেবে? এই প্রশ্ন আমাদের থেকেই যায়। সরকারের একার পক্ষে চাকরির যথেষ্ট ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই আমাদেরই চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হবে। আর ব্যবসা-বাণিজ্য হলো চাকরির ক্ষেত্র তৈরির আবাসস্থল বা কেন্দ্রস্থল। আমাদের চাকরি ও ব্যবসার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে চাকরির চেয়ে ব্যবসা বড়। ব্যবসা ছাড়া চাকরি সম্ভব নয়। আমার দৃষ্টিতে চাকরি হচ্ছে যে কেউ যে জায়গায় বা যে কর্মস্থলে কিংবা যে কোম্পানিতে কর্মচারী কিংবা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত থাকবেন সেই জায়গায় বা সেই কর্মস্থলের কিংবা সেই কোম্পানির উন্নতি করাই হবে তার লক্ষ্য কিংবা সেই কোম্পানির উন্নয়নের জন্যই তাকে রাখা হয়েছে। যে কাজ তার ওপর অর্পিত, যে কাজের জন্য তাকে নিয়োজিত করা হয়েছে, সেই কাজ যদি তিনি করতে না পারেন কিংবা সেই অর্পিত দায়িত্ব যদি তিনি ঠিকমত পালন করতে না পারেন কিংবা সেই কোম্পানির উন্নতি যদি তার দ্বারা না হয় তাহলে সেই চাকরি তার থাকবে বলে মনে হয় না। কিংবা সেই কোম্পানি তাকে রাখবে বলে মনে হয় না। তাই তাকে মনে রাখতে হবে যে ব্যক্তি কিংবা যে মালিক তাকে চাকরি দিচ্ছেন তিনি কিন্তু ব্যবসা করছেন। তিনি তার উন্নয়নের জন্য কিংবা তার ব্যবসার উন্নতির জন্য কিংবা তার ব্যবসার লাভের জন্যই তাকে নিয়োজিত করেছেন। তার ব্যবসার লাভের টাকা দিয়েই তাকে বেতন দিচ্ছেন। তিনি যদি তার ব্যবসা গুটিয়ে নেন তাহলে তার চাকরি শেষ। তাহলে বোঝা দরকার ব্যবসা ছাড়া চাকরির কোন গতি নেই।
আমাদের দেশের বিভিন্ন ব্যাংক আজ হাজার হাজার টাকা কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতন দিচ্ছেন। এক কথায় বলা যায় উচ্চমানের বেতন দিচ্ছেন। কিন্তু যিনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি কিন্তু লাভের উদ্দেশ্যেই কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্যেই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি তার ব্যাংকের উন্নয়নের জন্য কিংবা ব্যবসার উন্নয়নের জন্য শত শত বেতনভুক্ত মেধাবী কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ করছেন। তার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকের উন্নয়ন আনা অর্থাত্ ব্যবসার সফলতা আনয়ন করা। তাহলে ভেবে দেখা দরকার সকল কাজের উত্সই হচ্ছে ব্যবসা। ব্যবসার ঊর্ধ্বে চাকরি হতে পারে না। কিন্তু আমরা অনেকেই ব্যবসার চেয়ে চাকরিকেই বড় চোখে দেখি কিংবা দেখছি। আমার মনে হয় বেকারের এই দেশে আমাদের এই চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন আনা দরকার। আমি চাকরি করাকে ছোট হিসেবে দেখছি না, আমি চাকরির বিরোধিতা করছি না কিংবা আমি কাউকে চাকরি করতে নিষেধও করছি না। তবে আমি বলতে চাচ্ছি আমাদের মধ্যে যাদের ব্যবসা করার যথেষ্ট সামর্থ্য ও যোগ্যতা রয়েছে, যাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে। আমি তাদের চাকরির পিছনে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটার চেয়ে ব্যবসা করার প্রতি গুরুত্বারোপ করছি। শুধু তাই নয়, আমরা যারা চাকরি করছি তাদের মধ্যে যাদের ব্যবসা করার মত যথেষ্ট সামর্থ্য ও যোগ্যতা রয়েছে তাদের সারা জীবন অন্যের দারস্থে কাজ না করে ব্যবসা করার মাধ্যমে অন্যের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করার ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করছি। যার যে রকম সামর্থ্য, যার যে রকম ব্যবসা করতে ইচ্ছুক, যার যে রকম ব্যবসা করার পরিবেশ রয়েছে তাকে সেই রকম ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্যও আবেদন জানাচ্ছি। তাহলেই আমাদের সমাজে ছোট বড় হাজার হাজার কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে, হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। অন্যথায় একটি সরকারের একার পক্ষে আমাদের মত বেকারত্বের দেশে বেকারত্ব দূর করা কোনদিনই সম্ভব হবে না। এছাড়া এই চাকরির পিছনে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আমাদের যথাসাধ্য চাকরিও হবে না। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর কিছু লোকের কর্মসংস্থান ছাড়া বাকি সবাইকে বেকারত্বের অভিশাপে ভুগতে হবে। আর এই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলে তুলনামূলকভাবে সামর্থ্যবান ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবসার মূলমন্ত্রের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধন করতে হবে। শিক্ষিত ব্যক্তিদের সমাজে চাকরির প্রতিযোগিতার চেয়ে ব্যবসার প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে হবে। তবেই আমাদের সমাজ অনায়াসে পরিবর্তন হয়ে যাবে। এজন্য সরকারের উচিত উদ্যোমী ও উদ্যোগী ব্যক্তিদের উত্সাহিত করা। দেশে কল-কারখানা প্রতিষ্ঠা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখা।
লেখক:শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়