শিক্ষা

সৃজনশীল প্রশ্ন এবং আমার কিছু প্রশ্ন

শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে সমপ্রতি সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরিশোধন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের উপর প্রশিক্ষণ শেষ করলাম। প্রশিক্ষণের পূর্বে এই পদ্ধতি নিয়ে মনের মধ্যে যত প্রশ্ন ছিল প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে তার যেমন সন্তোষজনক উত্তর মেলেনি, তেমনি প্রশ্নের সংখ্যা যেন আরও বেড়ে গেছে। প্রথমে উদ্দীপকের কথায় আসা যাক। প্রশ্নের উদ্দীপক তৈরির কৌশলকে মনে হল যেন এক মহা কর্মযজ্ঞ। পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে নতুন পরিস্থিতির অবতারণা করে উদ্দীপক তৈরি করতে হবে, যা হতে হবে মৌলিক (unique)। যেখানে পাঠ্যপুস্তক প্রণেতাগণই সবসময় নির্ভুলভাবে পুস্তক প্রণয়ন করতে সক্ষম হন না, সেখানে পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত শত শত বিষয়বস্তুর উপর আরও নতুন পরিস্থিতির অবতারণা করে অন্তত ১৫টি নিয়ম মেনে একটি মৌলিক উদ্দীপক তৈরি করা কতটা দুঃসাধ্য এবং তা যে একপর্যায়ে মৌলিক থাকবে না সে কথা বলাবাহুল্য। আমার মনে হয়েছে, উদ্দীপক তৈরির জন্য সকল শিক্ষককে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের উপরও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। প্রশিক্ষণে উত্তরপত্র মূল্যায়নে যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেটা হল, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে হবে ভাল, উত্তম এবং অতি উত্তম হিসেবে। ভাল-মন্দ মূল্যায়নের কথা না হয় বাদই দিলাম। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভাল, উত্তম এবং অতি উত্তমই বা কিভাবে মূল্যায়ন করব? যেমন: সৃজনশীল প্রশ্নের চারটি অংশ-জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা। নম্বর বণ্টন করা হয়েছে জ্ঞান = ১, অনুধাবন = ২ (জ্ঞান ১ + অনুধাবন ১), প্রয়োগ = ৩ (জ্ঞান ১ + অনুধাবন ১ + প্রয়োগ ১) এবং উচ্চতর দক্ষতা = ৪ (জ্ঞান ১ + অনুধাবন ১ + প্রয়োগ ১ + উচ্চতর দক্ষতা ১)। আবার জ্ঞানমূলক প্রশ্নের উত্তর সর্বোচ্চ ৩ বাক্যে, অনুধাবন ৫ বাক্যে, প্রয়োগ ১২ বাক্যে এবং উচ্চতর দক্ষতা সর্বোচ্চ ১৫ বাক্যে সীমিত থাকবে। এখন অনুধাবনমূলক অংশের মূল্যায়নের কথাই ধরা যাক। দেখা গেল, একজন ছাত্র ৫ বাক্যের মধ্যেই সুন্দরভাবে উত্তর দিয়েছে, যেখানে জ্ঞানের অংশও আছে। অর্থাত্ তার ২ নম্বর (জ্ঞান ১ + অনুধাবন ১) প্রাপ্য। আবার আরেকজন ছাত্র ৮/৯ বাক্যে উত্তর লিখেছে এবং সেখানেও জ্ঞানের অংশ আছে। অর্থাত্ সেও ২ নম্বর (জ্ঞান ১ + অনুধাবন ১) পাবে (কারণ ভগ্নাংশ বা অর্ধেক নম্বর পরিহার করতে হবে)। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, যে ছাত্রটি মাত্র ৫ বাক্যে সঠিক শব্দচয়নের মাধ্যমে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করল সে কি ৮/৯ বাক্যে উপস্থাপনকারীর চেয়ে মেধাবী নয়? তাহলে দু’জনকে একই নম্বর দিতে হবে কেন? দু’জনের পার্থক্য নিরূপিত হবে কিভাবে? প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ। বলা হয়েছে যে, গতানুগতিক পরীক্ষা পদ্ধতিতে প্রশ্ন করা হতো ‘সীমিত কিছু প্রশ্নের’ ভেতর থেকে। তাই ছাত্রছাত্রীরা হাতেগোনা কিছু প্রশ্ন মুখস্থ করত। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, সীমিত কিছু প্রশ্নের ভেতর থেকে প্রশ্ন না করে আগের পদ্ধতিতেই সমগ্র পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রশ্ন করলে কি মেধার বিকাশ ঘটবে না? আরও বলা হয়েছে যে, ছাত্রছাত্রীরা এখন মুখস্থ না করে কেবল মন দিয়ে বুঝে বুঝে বা মনের আনন্দে বার বার শুধু পড়েই ভাল রেজাল্ট করতে পারবে। কিন্তু এমন অনেক বিষয় আছে যা কেবল পড়লেই মনে রাখা যায় না। তাছাড়া মুখস্থ করতে দোষ কোথায়, যদি তা পাঠ্যবিষয়েরই অন্তর্ভুক্ত হয়? বরং সিলেবাসেই এমন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হোক যা ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানপিপাসা বাড়াবে। আবার পাঠ্যবিষয়ে ভাসা ভাসা ধারণা নিয়েই যদি ভাল রেজাল্ট করা যায় তাহলে অন্য বিষয়ে তাদের জ্ঞানের গভীরতা বা জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হবে কিভাবে? যাই হোক, মুখস্থ করার প্রবণতা রোধ করার জন্য এই পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলেও শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ছাত্র-ছাত্রীরা এখন আগের চেয়ে আরও বেশি মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়েছে। কারণ মাত্র ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট সময়ে তাদেরকে ৬টি সৃজনশীল প্রশ্নের (৬–৪= মোট ২৪টি) উত্তর দিতে হয়, যার মধ্যে আবার ৬টি উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্ন। এত অল্প সময়ে ১৮টি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সর্বোচ্চ নম্বরের (৪ নম্বর) বাকি ৬টি প্রশ্নের উত্তর লিখতে কিভাবে উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা স্তরে পৌঁছানো সম্ভব (যেখানে মুখস্থবিদ্যা উগড়ে দিতেই সময় নিয়ে হিমশিম খেতে হত) আমার বোধগম্য নয়। তা-ও আবার যারা এই কাজটি করবে তাদের বয়স মাত্র ১৪-১৮ বছর পর্যন্ত। তাছাড়া যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করে এবং অর্ধেকেরও বেশি লোক নিম্ন-মধ্যবিত্ত সে দেশের সকল শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য যথাযথ আর্থ-সামাজিক সমর্থন আছে কি? একদিকে গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফলাফল নির্ধারণে A+ ধারীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে যাদের প্রায় অর্ধেকই ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর পায় না। এর সাথে সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের এই জটিল পদ্ধতি যুক্ত হয়ে যে কোন্ ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়াবে তা নিয়ে শঙ্কাবোধ করছি। তাই নীতি-নির্ধারকসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমার অনুরোধ, একটি বিরাট সংখ্যাভিত্তিক ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট না থেকে শিক্ষার মানের যথাযথ উন্নয়নে দৃষ্টি দিন। আবার মানোন্নয়নের নামে দূর-অদূর ভবিষ্যত্ চিন্তা না করেই নতুন কোন পদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানাবেন না। লেখক :প্রভাষক, মুমিনুননেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ