অবরুদ্ধ ভিসি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি

রাজধানী ঢাকার প্রান্তে অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট ক্রমেই জটিল হইতে জটিলতর হইয়া উঠিতেছে। সেইখানকার সিনেট কর্তৃক নির্বাচিত ভিসি গত ২১ আগস্ট হইতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের দ্বারা নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হইয়া আছেন। আন্দোলনকারীরা তাহার পদত্যাগ দাবি করিয়া চলিয়াছেন। অফিসে বসিয়াই তাহাকে পানাহার হইতে শুরু করিয়া ব্যক্তিগত জরুরি কাজগুলি করিতে হইতেছে। তাহার অবস্থা সত্যিই বেগতিক। সংবাদপত্রে তাহার অনন্যোপায় হইয়া অফিসে বসিয়া থাকিবার চিত্রটি দেখিয়া যে কেহ বিচলিত ও বিব্রতবোধ না করিয়া পারেন না। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী গত শুক্রবার পর্যন্ত তাহার এই অফিসবন্দীত্বের অবসান হয় নাই। ভিসি নিজে ও তাহার সমর্থক বামপন্থী ‘শিক্ষক মঞ্চ’ রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আবদুল হামিদের নিকট পত্র লিখিয়া জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। তিনি তাহার পত্রে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩-এর ৫১ ধারা মোতাবেক সংকট সমাধানে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের অনুরোধ করেন গত বৃহস্পতিবার। গতকাল সাংবাদিকদের তিনি জানাইয়াছেন যে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য যে সিদ্ধান্ত নিবেন, তাহাই তিনি মানিয়া লইবেন। অন্যদিকে বিরোধী শিক্ষকরা তাহার পদত্যাগের দাবিতে অনড় রহিয়াছেন এবং আজ শনিবার হইতে তিনদিনের সর্বাত্মক ধর্মঘট ডাকিয়াছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অচলাবস্থা ও করুণ দশা ইহাই প্রথম নহে। ১৯৯৩ সাল হইতে আন্দোলনের মুখে এই পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন ভিসি পদত্যাগ করিয়াছেন। শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি এবং সংশ্লিষ্ট মহলের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রায়শ এইখানে একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিতেছে। বিশেষত গত বত্সর হইতে ভিসিবিরোধী আন্দোলন নূতন মাত্রা লাভ করে। এই দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির হতদশা দেখিয়া যেমন প্রতীয়মান হয় যে, দেশটাকে কেহ ম্যানেজ করিতেছেন না, তেমনি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি উন্নয়নে কাহাকেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করিতে দেখা যাইতেছে না। এইভাবে দিন দিন সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হইতেছে। আমরা মনে করি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কোন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নহে। দেশের রাজনৈতিক সংঘাত ও আর্থ-সমাজিক অস্থিরতার ছাপ সেখানেও পড়িতে বাধ্য। ইহার আগে একইভাবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে তুমুল আন্দোলন গড়িয়া ওঠে। তখন আমরা লিখিয়াছিলাম যে, এইভাবে তো চলিতে পারে না। ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে কোন ভিসিই স্বস্তিতে কাজ করিতে পারিবেন না। ভিসির পদত্যাগ কোন সমাধান নহে, তাহাকে তাহার মেয়াদ পূর্ণ করিতে দেওয়া উচিত। এই রকম আন্দোলনে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। তাই সরকার অনড় থাকিলে সচেতন শিক্ষার্থীদের চাপে শিক্ষকদের আন্দোলন স্তিমিত হইয়া যাইতে বাধ্য। কিন্তু দেখা যাইতেছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সেই সূত্র ও ফর্মুলা কাজ করিতেছে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা সঙ্গীন ও শোচনীয়। ইহার কারণ বিবিধ। প্রথমত এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিতরা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী। দ্বিতীয়ত সরকার সমর্থকরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত। তাহাছাড়া বর্তমান জাসদ ও বামসমর্থিত ভিসি প্রোভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগ হইতে শুরু করিয়া এমন কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছেন, যাহাতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকরা মনঃক্ষুণ্ন ও বিরাগভাজন হইয়াছেন বলিয়া জানা যায়। ২০১২ সালের ২০ জুলাই ভিসি প্যানেল নির্বাচনে বর্তমান ভিসি তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। যদিও তাহার এই নিয়োগ বিধিবহির্ভূত ছিল না, তথাপি আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের মধ্যে দেখা দেয় হতাশা। তাহারা বর্তমান ভিসির প্রতি আর আস্থা রাখিতে পারিতেছেন না। গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভিসিবিরোধী আন্দোলন সংঘটিত হইতে দেখা গিয়াছে। এই প্রবণতা বন্ধ না হইলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আর অবশিষ্ট থাকিবে বলিয়া মনে হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন যাহাতে সঠিকভাবে কাজ করে, সেইজন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। প্রয়োজনে এই সংক্রান্ত অধ্যাদেশে সংশোধনী আনয়নপূর্বক তাহা যুগোপযোগী করিয়া প্রণয়ন করিতে হইবে। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্কটের আশু সমাধান কামনা করি।