পাথরের কান্না

ছবিতে দেখা গিয়াছে সারি সারি শিশু শুইয়া আছে, যেন খেলিতে খেলিতে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে কোনো ডরমেটরিতে। প্রাণসুলভ সকল কিছুই তাহাদের ভিতরে রহিয়াছে, নাই শুধু প্রাণখানি। শিশুগুলি ফুটফুটে, শিশিরভেজা পাপড়ির মতো তাহাদের মিষ্টি মুখ আমাদের আবেগতাড়িত করে। যখন জানা যায়, তাহারা বিষাক্ত রাসায়নিক অস্ত্রের শিকার, তখন মন আমাদের চমকাইয়া যায় পহেলা, তাহার পর তাহা যেন পাথর হইয়া যায়। তাহাদের মুখচ্ছবি এতটাই মায়াময় যে আমাদের পাথরবত্ হূদয় হইতেও কান্নার ক্ষরণ হয়। এই দৃশ্যগুলি সিরিয়ার। গত বুধবার বিশ্ব গণমাধ্যমে সিরিয়ায় রাসায়নিকের গ্যাসের আক্রমণে নিহত নিষ্পাপ শিশুদের এই ছবি দেখিয়া কি জাগ্রত হইবে বিশ্ববিবেক? বিশ্ববিবেক বলিয়া কি কিছু আছে? ছিল কোনো কালে? উহাকে সোনার হরিণ বা বুলিসর্বস্ব বলিলে কি অত্যুক্তি হইবে? বুধবারের সূর্য ঠিকমতো ওঠে নাই তখনও। সেই নিসর্গসুন্দর ঊষাক্ষণে ঘটে বিষাক্ত গ্যাসের ওই আক্রমণ। সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসের তিন শহরতলিতে পলকের তরে প্রাণ হারায় শত শত মানুষ, যাহার ভিতরে শিশুদের সংখ্যাই অধিক। সরকারবিরোধী পক্ষ অভিযোগের আঙুল তুলিয়াছে প্রেসিডেন্ট আসাদের দিকে। আসাদ বলিতেছেন, দুষ্কর্মটি তাহার নহে। অভিযোগের তীর যতই উভয় পক্ষ উভয়ের দিকে নিক্ষেপ করুক না কেন, আসলে নেপথ্যে বসিয়া ঘুঁটি চালিতেছে স্ব স্ব পক্ষের পরাশক্তিরা। পরাশক্তি নামক কর্তাদের ইচ্ছায় কর্ম পরিচালিত হয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে। পরাশক্তিরা একজোট হইলে তো কথাই নাই, মিসরে সমপ্রতি যাহা দেখা গিয়াছে; আর দুই ভাগে বিভক্ত হইলে—কেহ নাহি হারে জেতে সমানে সমান— এক্ষণে যাহার উদাহরণ সিরিয়া স্বয়ং। এই বিশ্বের ইতিহাসের ঠাসবুনটে যে সকল অক্ষর জ্বলজ্বল করিতেছে, তাহাদের বেশির ভাগের শ্বদন্তে রক্ত, ওষ্ঠে রক্ত। তাহাদের জন্মই হইয়াছে রক্তের হোলিখেলার ভিতর হইতে। সাম্রাজ্যবাদ বা পরাশক্তিদের দ্বারা শোষিত ও নিয়ন্ত্রিত হইয়া বিশ্বের বৃহত্ একটি অংশের মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা বলিয়া আর কিছু নাই। ছিলও না কখনো। এই শোষিত মানুষেরা হইল জড়পদার্থবত্। রুখিয়া দাঁড়াইলে তাহার পরিণতি হয় ভয়াবহ, না দাঁড়াইলেও কৌশলগত কারণে মানুষের মৃত্যুর মিছিল বাড়িতে দেখিয়াছি আমরা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহিনী প্রথমবারের মতো বেলজিয়ামের একটি শহরে নূতন নূতন ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র ব্যবহার করিয়াছিল। ১৯১৫ সালে সর্বপ্রথম বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহারে সেইসময় মিত্রবাহিনীর হাজার হাজার সেনা নিহত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে পঁচাশি হাজারেরও অধিক মানুষ প্রাণ হারাইয়াছিল, আহত হইয়াছিলে দশ লক্ষের অধিক মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে পারমাণবিক ও বিবিধ মারণাস্ত্র প্রয়োগের এক বীভত্স উত্সব চলে। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে ইতালির যুদ্ধে, ১৯৬৩ সালে ইয়েমেন এবং পরবর্তীতে ভিয়েতনামে ব্যাপকহারে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার হইতে দেখিয়াছি আমরা। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আট কোটি লিটারেরও অধিক বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য দেশটির বিভিন্ন শহর, খেত-খামার এবং বনাঞ্চলের ওপর নিক্ষেপ করা হয়। পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধনের পাশাপাশি ভিয়েতনামের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই সময় এই অস্ত্রের শিকার হন, যাহার প্রতিক্রিয়ার রেশ আজও রহিয়া গিয়াছে। আশির দশকে সাদ্দাম-শাসিত ইরাক একাধিকবার বিষাক্ত রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করিয়াছিল ইরানের ওপর। এমনকি সাদ্দাম তাহার স্বদেশের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দি অধ্যুষিত শহরেও প্রয়োগ করিয়াছিলেন এই রাসায়নিক অস্ত্র। ইতিহাসের এই সকল হামলায় বেশির ভাগ সময়ই অপাপবিদ্ধ শিশু ও নারীরাই সর্বাধিক নিহত হইয়াছে। মানব জাতি সম্ভবত খুব ধীরে ধীরে হইলেও প্রকৃত সভ্য হইতে চেষ্টা করিতেছে। ২০ বত্সর ধরিয়া আলোচনার পর ১৯৯২ সালে রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদন করা হইয়াছে। এই নীতিমালা বাস্তবায়নে ১৯৯৭ সালে রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থা বা ওপিসিডাব্লিউ গঠন করা হয়, যাহার সদস্য দেশের সংখ্যা ১৮৮টি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এখনো ওপিসিডাব্লিউ-তে যোগদানের বিষয়ে নীরব রহিয়াছে। তাহার নেপথ্যেও রহিয়াছে পরাশক্তিদের কলকাঠি। তাহাদের রাজনীতি রাষ্ট্রনীতিতে রহিয়াছে অতি সূক্ষ্ম কৌশল। চলিতেছে সাম্রাজ্যবাদের পাশাখেলা। যাহারা তাহার ঘুঁটি তাহারা ব্যবহূত হয় পরাশক্তির স্বার্থে, কিংবা ছিটকে পড়ে কোর্টের বাহিরে। সেখানে মানবিকতা পাথর হইয়া যায়, সেই পাথর কাঁদিলেও কাহার কী? পাথরের কান্নার আর মূল্য কী?