[ রা জ নী তি ]
ক্লাস করতে পারলাম না, ভোট দিতে পারবো তো?
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:২৮
নৈরাজ্যের এখন জয়-জয়কার। অক্টোপাশের মত আট বা আট সহস্রাধিক শাখা-প্রশাখা মেলেছে। নৈরাজ্য ছড়ানোর প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছে বিভিন্ন স্তরের মানুষ। রাজনীতিসংশ্লি¬ষ্ট ক্ষমতাবান ছাত্র, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, আমলা, ব্যবসায়ী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত যে যার রুচি, লোভ অথবা স্বার্থে নৈরাজ্য ছড়িয়ে ঘোলাটে করছে চারপাশ। রাজনীতির মাঠে চলছে ঘোর অমানিশা। নির্বাচনের ভবিষ্যত্ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দুই বৃহত্ দলের নেতা-নেত্রীদের ভাষায়: দেশপ্রেমের প্রকাশ স্পষ্ট নয়। ক্ষমতায় যাওয়া বা থাকাটাই মুখ্য। তাই সরকারি পক্ষ সংসদের সংখ্যাধিক্যের শক্তিতে সংবিধান কাটা-ছেঁড়া করে আদালতের মাধ্যমে পাকা করে ফেলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। বিরোধীপক্ষ ধনুকভাঙ্গা পণ করে আছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই কেবলমাত্র তারা নির্বাচনে যাবে। অর্থাত্ একপক্ষ উত্তরমেরুতে তো অন্যপক্ষ দক্ষিণ মেরুতে। মাঝখান থেকে রাজনীতির ভবিষ্যত্ অন্ধকারাচ্ছন্নই থেকে যাচ্ছে। অশুভ রাজনীতির ছায়া সর্বত্রই প্রসারিত। অতিসমপ্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শ্রদ্ধেয় সহকর্মীদের একাংশ উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে তাড়ানোর আন্দোলন করছেন। এরমধ্যে এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নানা বক্তব্য-বিশ্লে¬ষণ উপস্থাপিত হয়েছে। বলা হয় দলীয় রাজনীতির সংশ্লি¬ষ্টতা এত ভয়ঙ্কর যে বিবেক দিয়ে কিছু ভাবা গেলেও তা প্রকাশ করা যায় না। যতই অযৌক্তিক আর অনৈতিক হোক, দলীয় সিদ্ধান্তেই কথা বলতে হয়। একারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি আর জাতীয় রাজনীতির আদর্শে কোনো ফারাক নেই।
গত ২২ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালে যথারীতি ক্লাস নিতে গেলাম। ছাত্র-ছাত্রীদের বড় অংশও উপস্থিত। কিন্তু ক্লাসরুম তালা দেয়া হয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের নির্দেশে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ যাদের পরিচয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত একটি উপদল এবং বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক গ্রুপ। এই দুই গ্রুপ মিলিয়েই আন্দোলন শানিয়েছেন। এর বাইরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ দলীয় রাজনীতির এবং দল নিরপেক্ষ শিক্ষক ও সকল শিক্ষার্থী এমন গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষাকারী আন্দোলনে নিজেদের যুক্ত করেননি। তাহলে কেন ক্লাস আটকে দেয়া হলো, জোর করে তাদের ধর্মঘট সফল করাতে যেন বাধ্য করলেন রাজনীতির শিক্ষকরা। একইভাবে তারা তিনদিন ধরে অফিসকক্ষে জিম্মি করে বা বন্দি করে রেখেছেন তাদেরই সহকর্মী উপাচার্য মহোদয়কে। ক্যাম্পাস-পেশীশক্তির চেয়েও তো অনেক শক্তিশালী জাতীয় রাজনীতির কুশীলবরা। তাই আশংকা- বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার ক্লাসে অংশ নেয়া। কিন্তু তা নিতে পারলাম না। এ কারণেই আশংকা- আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবো তো?
বর্তমান ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগের দাবি নিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশ শিক্ষক সমিতির ব্যানারে আন্দোলন শুরু করেছিলেন প্রায় চারমাস আগে। আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত গতি না থাকায় একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা নিজ লক্ষ্য পূরণে চাপ সৃষ্টি করতে ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে। কিন্তু এতে তেমন সাফল্য আসেনি। বেশিরভাগ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ধর্মঘট কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করে ক্লাস পরীক্ষা অব্যাহত রাখেন। ফলে গ্রীষ্মের ছুটির পর আন্দোলনকারীরা ক্লাস পরীক্ষা বন্ধের কর্মসূচি থেকে সরে আসেন। এরপর তারা অবরোধ গড়ে তোলেন রেজিস্ট্রার অফিস ও ভিসির অফিসে। বিভিন্ন দাবি তুলে তা পূরণের সুযোগ ও সময় না দিয়েই শক্ত প্রামাণ্য কারণ ছাড়া ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। এতে স্থবির হয়ে যায় প্রশাসনিক কাজকর্ম। এমফিল, পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত গবেষকরা আর্থিক ও একাডেমিক সংকটে পড়েন। ভর্তি, ফল প্রকাশ, শিক্ষকদের পদোন্নতি, উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ যাত্রা, স্কলারশিপ ইত্যাদি জরুরি কার্যক্রমও থমকে যায়। ফলে চারজন শিক্ষক ও একজন ছাত্র এই অচলাবস্থা নিরসনে হাইকোর্টে রিট করেন। মহামান্য আদালত আন্দোলনকারীদের অবরোধ তুলে নিতে নির্দেশ দেন। রায়ে বলা হয় আগামী তিন মাসে প্রশাসনিক ভবনের স্বাভাবিক কাজকর্মে কোনো বাধা দেয়া যাবে না। এভাবে অবরোধ উঠে যায়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। কিন্তু স্বস্তি স্থায়ী হয় না। আদালতের সাথে এবার কানামাছি খেলতে নামে আন্দোলনকারী শিক্ষক গ্রুপ। আদালত রায় দিয়েছে শিক্ষক সমিতির আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। তাই রাতারাতি ব্যানার পাল্টে গেল। আইনের ফাঁক খুঁজে একই আন্দোলনকারীদের নতুন ব্যানার হলো ‘সাধারণ শিক্ষক ফোরাম’। তারপরও সবার ধারণা ছিল আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রশাসনিক ভবনে আর অবরোধ হবে না। কিন্তু এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।
আন্দোলনকারীরা গত ২১ ও ২২ আগস্ট ক্যাম্পাসে সর্বাত্মক হরতাল আহবান করেন। ভিসি, প্রোভিসিদ্বয় ও ট্রেজারার মহোদয় আদালতের রায় মান্য করে প্রশাসনিক ভবন সচল রাখার জন্য অফিসে যান। সেখানেই তাঁরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে অবরোধ কার্যকর থাকে শুধু ভিসি মহোদয়ের ক্ষেত্রে। পূর্ব থেকে অবরোধ করার কোনো কর্মসূচি ছিল না শিক্ষক ফোরামের। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল শিক্ষক তাদের সহকর্মী উপাচার্য মহোদয়কে অফিস কক্ষে বন্দি করে ফেললেন। এ অনেকটা চলচ্চিত্রের মত অস্ত্রের মুখে দলিলে বন্দীর স্বাক্ষর নেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি। কোনো বিবেকের শাসন বা মানবিকতা বোধ এখানে কাজ করেনি। ২৪ আগস্ট এই লেখা তৈরির সময় পর্যন্ত ভিসি আবদ্ধ আছেন একটি কক্ষের চৌহদ্দিতে।
আমরা বরাবরই লক্ষ্য করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে সরকার একটু দেরি করে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বা পদক্ষেপ নেয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের আন্দোলন তো বিগত ভিসি-বিরোধী আন্দোলন বা বুয়েটের ভিসি-বিরোধী আন্দোলন নয় যে সরকারকে অনেক বেশি ভাবতে হবে। বিশাল নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের বড় অংশ এখানে আন্দোলনে যুক্ত হয়নি। শিক্ষক গ্রুপের দুটো খণ্ডিত অংশ এই আন্দোলন চালাচ্ছে। আমরা সাদা চোখে ক্যাম্পাসে যা দেখছি তার চেয়ে আরো গভীরভাবে সরকারের নানা গোয়েন্দা সংস্থার দেখার কথা। তারা নিশ্চয়ই সরকারকে তথ্য দেয়। মনে রাখতে হবে প্রথমে সাময়িকভাবে, পরে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর মাননীয় চ্যান্সেলরই ড. আনোয়ার হোসেনকে নিয়োগ দিয়েছেন। তাই তিনি এবং বিশ্ববিদ্যালয় যদি সংকটে পড়ে তবে দ্রুত এর প্রতিবিধান করতে সরকারের সংশ্লি¬ষ্ট দপ্তর অর্থাত্ ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সবশেষে মহামান্য চ্যান্সেলরকেই এগিয়ে আসতে হবে। ন্যায়-অন্যায়ের খোঁজ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। অবশেষে একটু নড়েছে সরকার। জানা গেল গতকাল ২৪ আগস্ট বিকেলে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সাথে আলোচনায় বসবেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী। আমরা অধীর আগ্রহে এর সুষ্ঠু ফলাফল দেখার জন্য অপেক্ষা করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট থেকে আমরা যদি দেশের সংকটের দিক তাকাই তাহলে আরো হতাশ হতে হবে। যেখানে ক্ষুদ্র ব্যক্তিক এবং দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে কোনো ধরনের নৈতিকতা ও মানবিকতার ধার না ধেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো কোনো গোষ্ঠী প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে তাদের সহকর্মীকে একটি কক্ষে চারদিন বন্দী করে রাখতে পারেন, সেখানে ক্ষমতাপ্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো অবলীলাক্রমেই জিম্মি করে ফেলতে পারে গোটা দেশবাসীকে। এরমধ্যে একপক্ষ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া ‘নির্বাচন হবে না—হতে দেয়া হবে না’ বলে পেশীশক্তির আস্ফাালন করছে, আর অন্যপক্ষ দলীয় সরকার বা দলীয় নেত্রীর অধীনে অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়া আর কোনো উপায়ে নির্বাচন সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এভাবে দুই মেরুর পাটা-পুতার ঘর্ষণে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত। এসব বাস্তবতায় জনমনে হতাশা বাড়ছে। শঙ্কা বাড়ছে নির্বাচনের ভবিষ্যত্ নিয়ে। গণতন্ত্র এখন বিপন্ন দশায়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে কিনা এ নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। ভোটারের পক্ষে অবশেষে ভোট দেয়া সম্ভব হবে কিনা এ দুশ্চিন্তা এখন বার বার উঁকি দিচ্ছে। তারপরও আমরা হতাশ হতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই শেষ পর্যন্ত দেশপ্রেম ছুঁয়ে যাবে আমাদের আপাত কঠিন রাজনীতিকদের বুকে। দেশ-জাতির কথা বিবেচনায় এনে ঘুরে দাঁড়াবেন তাঁরা। দলীয় স্বার্থ কিছুটা বিসর্জন দিয়ে হলেও দেশকে আবার সুস্থ রাজনৈতিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করবেন।
লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com