ভ্যানকুভারে বিশ্ব গ্লুকোমা সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ

সমপ্রতি কানাডার সুন্দর ও নন্দিত শহর ভ্যানকুভারে অনুষ্ঠিত হল ৫ম বিশ্ব গ্লুকোমা সম্মেলন। সারা বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রায় ৩৫০০ চক্ষু ও গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ ১৭ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন। সারা বিশ্বে গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞদের এত বড় মিলন মেলা হয় এই বিশ্ব গ্লুকোমা সম্মেলনে। কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া রাজ্যের অন্যতম বন্দর নগরী ভ্যানকুভার। লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) এর মতে ভ্যানকুভার হচ্ছে পৃথিবীর ১০টি সুন্দর বাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে এক নম্বর শহর। ২০১১ সালের গণনায় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ৫২৪৯ জন লোক এবং প্রায় ৬ লাখ লোকের বাস এই শহরে। ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শহরের চারদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই ভ্রমণকারীদেরকে আকর্ষণ করে। এজন্যে ভ্যানকুভারের ২য় বৃহত্তম ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে ট্যুরিজম। ভ্যানকুভার হারবার ও ওয়াটার এয়ারপোর্টের পাশেই অবস্থিত ভ্যানকুভার কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব গ্লুকোমা সম্মেলন। অত্যাধুনিক ব্যবস্থা সম্বলিত এই সম্মেলন কেন্দ্রের প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল এবারকার সম্মেলন। বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটির নির্বাচিত সভাপতি হিসাবে আমি, মহাসচিব অধ্যাপক মিজানুর রহমানসহ আমরা ৭ জন গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ এই বিশ্ব গ্লুকোমা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করি। গ্লুকোমা নীরব অন্ধত্বের অন্যতম কারণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্লুকোমার কোন উপসর্গ থাকে না, এজন্যে রোগটির রোগ নির্ণয়ে প্রায়ই বিলম্ব হয়। পরিণতিতে রোগীকে অন্ধত্ব বরণ করতে হয়। অথচ যদি রোগের প্রাথমিক স্তরেই রোগ নির্ণয় হয় তাহলে রোগী ওষুধের সাহায্যে কিংবা অপারেশন করে সারা জীবন ভালো থাকতে পারেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চোখের ভেতরের আভ্যন্তরীণ চাপ বেড়ে চোখের ও ব্রেনের সংযোগকারী অপটিক স্নায়ুর ক্ষতি সাধন হয়। দৃষ্টির পরিসীমা কমে যায় এবং ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়। এই গ্লুকোমা রোগের উপরেই বিশ্ব গ্লুকোমা সমিতি আয়োজিত ৪ দিনব্যাপী বিশ্ব সম্মেলনে-গ্লুকোমার কারণ, প্রতিকারসহ সর্বশেষ গবেষণামূলক ও শিক্ষামূলক প্রবন্ধ ও ভিডিও উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া প্রি-কংগ্রেস দিনে শিশুদের গ্লুকোমা রোগের উপর সারাদিনব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বৈজ্ঞানিক অধিবেশন-এর কয়েকটি সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম হয়েছে অনলাইনে এবং বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞগণ দেখতে পেয়েছেন এবং উপভোগ করেছেন। আমেরিকার অধ্যাপক ওয়াইনরেব, জেফরি লিবম্যান, জর্জ বারভেল্ডট, কুলদেভ শিং, জর্জ এল স্পিথ, অস্ট্রেলিয়ার আইভান গোল্ডবার্গ, রবি থমাস, জাপানের মাকোতো আরাইয়ে, সুইজারল্যান্ডের জোসেফ ফ্লামার, কার্লো ট্রাভার্সো, ভারতের অনিল মন্ডল, এল ভিজয়া, রামানজিত শিহটা, তনুজ দাদা, ইংল্যান্ডের মুরফিল্ড আই হাসপাতালের পেং টি খসহ প্রায় ৩৫০ জন বিশ্ববিখ্যাত চক্ষু ও গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞগণ এই কংগ্রেসে প্রবন্ধ পাঠ করেন ও কোর্স পরিচালনা করেন। সবার বক্তব্য থেকে আমরা গ্লুকোমার রোগ নির্ণয়, চিকিত্সা ও গবেষণার নানা তথ্য জানতে পারি। বাংলাদেশ থেকে আমি একটি সিম্পোজিয়ামের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করি। এছাড়া অধ্যাপক মিজানুর রহমান, ডা. মুহাম্মদ জিয়াউল করিম, ডা. এম.এ. করিম, ডা. শামস মোহাম্মদ নোমান ও আমি মোট ৫টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ঐ কংগ্রেসে উপস্থাপন করি। গত এক বছর যাবত্ বাংলাদেশ আই হসপিটালে গ্লুকোমার আধুনিক লেজার চিকিত্সা এসএলটি করে আসছি। ঐ চিকিত্সার উপর একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করার আমার সুযোগ হয়। উন্নত বিশ্বে অনেক গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞই এই এসএলটি পদ্ধতিতে গ্লুকোমার প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে থাকেন। গ্লুকোমা রোগে চোখের চাপ কমাবার জন্য ওষুধ ব্যবহারের মতো এসএলটি লেজার-এর চিকিত্সায় ফলাফল ভালো ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম। আমেরিকা, ফ্রান্স, নাইজেরিয়া, গায়ানাসহ কয়েকটি দেশের গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ আমাদের বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন। ফ্রান্সের এসএলটি লেজার কোম্পানির প্রধান এক্সিকিউটিভ ক্রিস্টিন ওয়ারেন বাংলাদেশে এসএলটি চিকিত্সা চালু হয়েছে জেনে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এই চিকিত্সা পদ্ধতির আরো জনপ্রিয়তা আশা করেন। বিভিন্ন দেশে গ্লুকোমা রোগটি সম্পর্কে সচেতন করা, দ্রুত রোগ নির্ণয় করা এবং এ রোগের আধুনিক চিকিত্সা ও গবেষণার জন্য কি কি কর্মসূচি নেয়া যায় এর ওপর আলোচনা করেন বিশ্ব গ্লুকোমা সমিতির সভাপতি ডা. ফ্রান্স গ্রেহেন এবং বিশ্ব গ্লুকোমা সম্মেলনের সাংগঠনিক কমিটির ডা. রবার্ট ফেচনার, ডা. আইভান গোল্ডবার্গ, ডা. ওয়াইনরেব, ডা. মেলামেড ও ডা. কুলদেভ শিং, ডা. নিরুগুপ্তাসহ অনেকে। একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশের পতাকা সংবলিত এ ধরনের অনুষ্ঠানে যোগদান ছিল বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি তথা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানের। সম্মেলনে আরেকটি আকর্ষণীয় দিক ছিল সকল দেশের গ্লুকোমা সোসাইটির কার্যক্রমসহ নিজস্ব পোস্টার। বিশ্বের অন্যান্য দেশের পোস্টারের সাথে বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটির পোস্টারটি প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়। সম্মেলন শেষ করে আমাদের ৭ জন গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ ও তাদের ২ জন স্পাউজসহ মোট ৯ সদস্য দল ভ্যানকুভারের আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় আরো কিছু স্থান পরিদর্শন করি এবং অনেক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি আনন্দঘন বিশ্ব গ্লুকোমা সম্মেলন শেষে দেশে ফিরি। লেখক :প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট, বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি ইমেইল ঃ nazrul.islam.@hotmail.com