আলোকপাত
সন্তানের হাতে পিতা-মাতার রক্ত
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৪
পিতা-মাতা হত্যাকারী ঐশীর কথা এখন দেশের মানুষের মুখে মুখে। কিছুক্ষণ আগে মসজিদে ইমাম সাহেবের মুখেও এ নিয়ে খুত্বা শুনে এলাম। সন্তানদের তিনি ছোটবেলা হতেই ইসলামী শিক্ষা প্রদানের উপর গুরুত্ব আরোপ করলেন। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াও ঘটনাটি নিয়ে মুখর। এখন টকশোতে এ বিষয়টিই প্রাধান্য পাচ্ছে। বস্তুগতভাবে বিষয়টি জোড়া খুনের ঘটনা হলেও এক্ষেত্রে একজন কন্যা তার পিতামাতাকে নৃশংসভাবে খুন করেছে। ডিবি ইন্সপেক্টরের বখে যাওয়া মেয়েটি দারুণ আমুদে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সব পিতা-মাতার কাছেই তাদের সন্তান শুধু প্রিয় নয় প্রাণপ্রিয়। ঐশীর পিতামাতার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ছিল না। তাকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য পিতামাতার উদ্যোগেরও কমতি ছিল না। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নাই। বখাটে বন্ধুদের সাথে ডিজে পার্টিতে নাচানাচি, মাদক সেবন সবকিছুই করতো সে। বন্ধু-বান্ধবদেরও এক্ষেত্রে নিরাশ হতে হয়নি।
অবশেষে অর্থের প্রয়োজনে তাদের সাথে সে মাদক বিক্রয়ের ব্যবসাও করেছে। অনেক সন্তানই কূপথে পা দিয়ে নিজের সর্বনাশের পাশাপাশি সে পরিবারেরও ক্ষতি করে। এক সময়ে পিতামাতা বা পরিবার এসব জানতে পেরে কাউকে ফেরাতে পারে আবার কাউকে পারে না। এভাবে অনেকেই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু ঐশী তার পিতামাতাকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। সাঙ্গ করে দিয়েছে জনক- জননীর ভবলীলা। আঠার বছরের কম বয়সী একটি মেয়ের এহেন কর্মকান্ডকে কোন দৃষ্টিতে দেখা হবে জানি না। তবে পিতামাতা বিশেষ করে গর্ভধারিণী মায়ের তরফ হতে এসব কাজে বাধা পেয়ে সে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। পিতামাতাকে খুনের পর ঠান্ডা মাথায় আত্মসমর্পণে প্রমাণিত হয় সে কতোটা ধূর্ত, সুচতুর এবং কৌশলী। তার আশপাশে যে আরো ধুরন্ধর পরামর্শদাতা আছে সে বিষয়টিও পরিষ্কার। সে তার বন্ধুবান্ধব, শুভানুধ্যায়ী, উকিল ইত্যাদির সাথে যথেষ্ট সময় নিয়ে পরামর্শ করেই আত্মসমর্পণ করেছে। তার পক্ষে তার কোন আত্মীয়-স্বজন উকিল নিয়োগ করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। এ বিষয়ে নগদ অর্থ গহনা ইত্যাদি ছাড়াও আরো সহায়ক হয়েছে তার বয়স। তার আইনজীবীরা সহজেই তাকে শিশু আইনে ফেলার চেষ্টা করেছেন। যদিও সে বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিপক্ব এবং সেয়ানা। সেই সাথে তার পক্ষের লোকজন তার মৃত পিতামাতার চরিত্র হননেরও চেষ্টা করেছে। তার পিতা চাকরিজীবী হওয়ায় চিরাচরিত পন্থায় তার অর্থবিত্তের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে ঐশীকে তারা প্রতি সপ্তাহে এক লাখ টাকা হাতখরচ দিতেন। ঐশীর বিচারের আগে এসবেরও বিচার চাওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানও ঐশীর নাবালিকার বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে উল্লেখ করেছেন। ঐশী আইনী সহায়তা পাক তা আমরাও চাই। কারণ তার সে অধিকার আছে। কিন্তু ১৭ বছর ৩৬৪ দিন বয়সে সুস্বাস্থ্য নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা ঘরে বসে মানুষ খুন করলে তার বিচারের সময় শিশু শিশু বলে চীত্কার করলে বা ঐ বয়সী কেউ পিতামাতাকে খুন করলে সেই পিতামাতাকে সপ্তাহে এক লাখ টাকা হাতখরচ দেওয়ার মত কথা বললে মৃত ব্যক্তিদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় কিনা সে কথাও ভেবে দেখা দরকার। এক্ষেত্রে নিহত মাহফুজুর রহমান দুইবার জাতিসংঘ মিশনে গিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশকে উপহার দিয়েছেন এবং তার পারিবারিক কাজে লাগিয়েছেন। তাছাড়া তিনি তার কাজের জন্য অনেকবার সরকারিভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। তাকে এবং তার স্ত্রীকে যেভাবে হত্যা করা হলো সেই হত্যাকান্ডে আরো কেউ জড়িত কিনা বিশেষ করে ঐশীর পিতা-মাতার পক্ষের কেউ ঐশীকে মনস্তাত্ত্বিক ইন্ধন জুগিয়েছে কিনা সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার। তার পিতামাতার আত্মীয়-স্বজনের কারো পক্ষ হতেই টুঁ শব্দটি নেই কেন? প্রশ্ন হলো, ঐশী কি হঠাত্ করে এক রাতেই পৃথিবীর এক কুখ্যাত খুনী হয়ে উঠেছিল?
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা