ভয়াবহ রাসায়নিক অস্ত্র হামলার কবলে সিরিয়া!

সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের দমাতে সবচেয়ে ঘৃণ্য উপায় হিসাবে বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে, সরকারি বাহিনী অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও কাপুরুষোচিতভাবে রকেটের মাধ্যমে সারিন গ্যাস ব্যবহার করে নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে। পাল্টা অভিযোগ করেছে সরকারের পক্ষ থেকেও। তাদের বক্তব্য, বিদ্রোহীরাই এসব ঘটিয়ে সরকারের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। তবে সন্দেহের এই তীর যেদিকেই থাকুক না কেন বিষয়টা যদি সত্যি হয় তাহলে এর চেয়ে ভয়ঙ্কর কোন খবর আর হতে পারে না। গত বুধবার দামেস্কের কাছে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হওয়ার পর অভিযোগ উঠে যে, তারা ভয়াবহ রাসায়নিক হামলার কারণে নিহত হয়েছে। আর এ অভিযোগকে অনেকটা সত্য বলে স্বীকৃতি দিল একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য চিকিত্সা সংস্থা। শনিবার এমএসএফ (মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ারস) নামে ওই সংস্থাটি জানায়, গত ২১ আগস্ট তিন ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ রোগী খিঁচুনি, অতিমাত্রায় লালা বের হওয়া, চোখে জ্বালাপোড়া ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মারাত্মক সমস্যা নিয়ে দামেস্কের তিনটি হাসপাতালে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে ৩৫০ জন পরবর্তীতে মারা যায়। সংস্থাটি জানায়, এসব উপসর্গের কারণ কী এখনো তা বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে এটা দেখে নিশ্চিতভাবে মনে হচ্ছে তারা ‘নিউরোটক্সিক এজেন্ট’ বা ‘রাসায়নিক হামলার’ শিকার। সংস্থাটি জানায়, রোগীদের মধ্যে অনেককেই অ্যাটরোপাইন নামে একধরনের ওষুধ দেয়া হয়, যা সাধারণত এসব উপসর্গের জন্যই ব্যবহূত হয়। এমএসএফের দেয়া এই বিবৃতি প্রকাশের পর এটাই কি প্রতীয়মান হচ্ছে যে, ভয়াবহ রাসায়নিক অস্ত্রের হামলার কবলে পড়ছে সিরিয়া? এর আগে দামেস্কের আরো কয়েকটি হাসপাতালের চিকিত্সকরা বলেছিলেন,এখানে যারা ভর্তি হয়েছেন, তাদের অনেকেরই মুখ থেকে শুধু ফেনা বের হচ্ছিল। এর কিছুক্ষণ পরই তারা মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স বলেন, আমি এখানে শুধু লাশ আর লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। সবচেয়ে হূদয়বিদারক হচ্ছে শিশুদের মৃত্যু। তাদের নিষ্প্রাণ দেহটা নিথর অবস্থায় মেঝেতে পড়েছিল। তাদের দেহে কোন আঘাতের চিহ্ন ছিল না। মারা যাওয়ার আগে তাদের মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এরপরের বিষয়টা বর্ণনা করার মতো নয়। প্রিয়জনদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠে সেখানকার বাতাস। গত বুধবারের ওই বর্বর ‘রাসায়নিক’ হামলায় মারা গিয়েছিল সহস্রাধিক মানুষ। আহত হয়েছিল বহু লোক। আন্তর্জাতিক মহলেও এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। ব্রিটেনসহ ৩৭টি দেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গোটা বিশ্বের প্রতি এর কঠোর জবাব দেয়ার আহবান জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের চিন্তা-ভাবনা করছে। এ কারণে পেন্টাগনের বাহিনীগুলোকে সিরিয়ার কাছাকাছি নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, মার্কিন রণতরী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করেছে। সেখানে তাদের উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশ এলেই তারা পরবর্তী পদক্ষেপে যাবে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে সিরিয়ায় সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে এর উত্তর সরাসরি না দিয়ে তিনি বলেন,আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে কি কি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে এবং প্রেসিডেন্টের সামনে তা তুলে ধরতে হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস মাহান এর মেয়াদকাল শেষ হওয়ার পর এটি ভার্জিনিয়ার ঘাঁটিতে ফিরে আসছিল। কিন্তু ষষ্ঠ নৌবহরের কমান্ডার জাহাজটিকে ওই অঞ্চলে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সিরিয়ায় অভিযান চালানোর জন্য নৌবাহিনী কোনো নির্দেশ পায়নি বলে তিনি জানিয়েছেন। এ তো গেলো আন্তর্জাতিক মহল কোন পথে এগোয় তার কথা। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব রাজনীতিতে কে কি বলছে সেদিকে ততটা গুরুত্ব না দিয়ে আমাদের দেখা উচিত বাস্তবে কি ঘটছে। কারণ অনেক সময়ই দেখা যায়, বিশ্ব নেতৃবৃন্দ মুখে যা বলছে বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও চোখে পড়ে না। তাই বর্তমান সিরিয়া পরিস্থিতি আমাদের এটাই জানান দিচ্ছে যে, এই মুহূর্তে সিরিয়া সরকার যদি তাদের দমন-পীড়ন বন্ধ না করে সত্যিকার অর্থেই রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে,তাহলে দেশটি একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে বাধ্য। আর তখন আফসোস করারও কেউ থাকবে না। ১৯৮৮ সালে কুর্দিদের উপর ইরাকের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছিলেন, এটা সম্ভবত তাকেও অতিক্রম করে গেছে। সে সময়ে হাবজালায় হাজার হাজার কুর্দিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল । আর এবার দামেস্কের শহরতলিতে সহস্রাধিক লোককে বিষাক্ত সারিন গ্যাসের মাধ্যমে মারা হল। জাতিসংঘের একটি অস্ত্র পরিদর্শক দল বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বর্তমানে দামেস্কে রয়েছে। তারা এখনো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। সুইডিশ বিজ্ঞানী ওকে সেলসট্রমের নেতৃত্বাধীন দলটিতে রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থার (ওপিসিডব্লিউ) সদস্যরাও আছেন। এ দলটির গত এপ্রিল থেকে সিরিয়ায় যাওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে তারা সেখানে যেতে পারেননি। তবে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের সেখানে যাওয়া, প্রতিবেদন প্রকাশ করা, যত যা-ই হোক না কেন বিশ্ববাসী শুধু একটা বিষয়ের জন্যই অপেক্ষা করছে- তা হচ্ছে আর কোন নতুন মৃত্যুর খবর তারা শুনতে চায় না। তাদের প্রত্যাশা অপ-রাজনীতির কূটকৌশল থেকে বেরিয়ে অবিলম্বে সিরিয়ায় রক্তপাত বন্ধ হোক।