রাজনৈতিক বৈধতার সংকট
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৩, ২০:৫৮
সেইন্ট লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক জর্জ এরাগণ এনসাইক্লোপিডিয়া অব ক্যাম্পেইনস, ইলেকশন এ্যান্ড ইলেকটোরাল বিহ্যাবিয়ার-এ উল্লেখ করেছেন যে, কোন রাজনৈতিক সরকারের স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করে একটি রাজনৈতিক সরকারের সক্ষমতা ও সরকারি কর্মকর্তাগণ কর্তৃক তাদের যথাযথ ক্ষমতার প্রয়োগের উপর। তিনি আরও বলেন, জনগণের স্বীকৃতি ও শাসক কর্তৃক গৃহীত সকল সিদ্ধান্ত এবং সমস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার শাসনের বৈধতার গ্রহণযোগ্যতার উপর রাজনৈতিক বৈধতাকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। অধ্যাপক জর্জ এরাগণের রাজনৈতিক বৈধতার উপরিউক্ত বিশ্লেষণ থেকে একথা প্রতীয়মান হয় যে, একটি বৈধ বা নির্বাচিত শাসন ব্যবস্থার মূল্যায়ন নির্ভর করে জনগণের স্বীকৃতি ও সে অনুযায়ী জনগণের গ্রহণযোগ্যতার উপর।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, জনগণ কর্তৃক অগ্রহণযোগ্যতা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বৈধতাকে অনেকাংশেই হ্রাস করেছে। যার প্রমাণ মিলে সংঘটিত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকার সমর্থিত প্রার্থীগণের নির্বাচনে ভরাডুবির মধ্য দিয়ে। সীমাহীন দূর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্র কংকালসার শূন্যতার এক বিরূপ আকৃতি ধারণ করেছে। সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিগণই শুধু যে এহেন কর্মে লিপ্ত এমনটি নয় বরং সরকারি মদদে অধিষ্ঠিত প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণও সমস্রোতে গা ভাসিয়ে চলছেন।
শিক্ষাব্যবস্থা কোন দেশ ও জাতির উন্নয়নের একটি শক্তিশালী মানদণ্ড। এই শিক্ষাব্যবস্থাও আজকের বাংলাদেশে রাজনীতিকরণের করাল থাবা দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার কোন ধার না ধেরে বর্তমান সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের কর্মীদেরকে একচেটিয়া প্রাধান্য দিয়ে সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে। দলীয় কর্মীদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে তারা বুদ্ধিভিত্তিক যুদ্ধে জয়লাভ করতে চায়। এ যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে সমাজতন্ত্রের সমর্থকদের নীতিরই বহি:প্রকাশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী শক্তিদের মধ্যে দুইটি রাষ্ট্র -মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়া যথাক্রমে তাদের স্ব স্ব আদর্শ পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র’র বিকাশ ও প্রচারে পরোক্ষভাবে তাদের সকল শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করে। এই দুইটি রাষ্ট্র তাদের মতবাদকে সে সময়ে সকল দেশের উপর চাপিয়ে দেয়া ও এই মতবাদকে গ্রহণের নিমিত্তে এক ধরনের পরোক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাত্ত্বিকেরা শক্তিশালী এই দুইটি রাষ্ট্র কর্তৃক হেজিমনি প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাকে ‘ঠান্ডা বা শীতল যুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সোভিয়েতরা তাদের পরোক্ষ প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রকে চরম গুরুত্ব দিয়েছিল। সোভিয়েত ঘরানার শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের জন্য এবং সে অনুযায়ী সমাজতন্ত্রের অনুসারী গঠনকল্পে তারা শিক্ষক ও ছাত্র উভয়কে টার্গেট করতো। শিক্ষকদেরকে এমনকি আর্থিক সুবিধাদানের মাধ্যমে ছাত্রকে টার্গেট করতে নির্দেশ দেয়া হতো এবং সে সব ছাত্রদেরকে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানানো হতো। শুধু এতটুকু করেই তারা শান্ত ছিল না; বরং তাদের সমর্থিত ছাত্র ও শিক্ষকদেরকে বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি প্রাপ্তিতে সহায়তা করতো। যেহেতু বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আছে সেই সোভিয়েতপন্থি সমাজতন্ত্রের অনুঘটকেরা যারা এই সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে অসম রাজনীতিকরণের মাধ্যমে হলেও শিক্ষাক্ষেত্র দখলের মধ্য দিয়ে আগামী দিনের রাজনীতিতে টিকে থাকতে হবে। আর সে কারণেই বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ক্যাডার নামে খ্যাত ৩,৩০০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নগ্ন রাজনীতিকরণের এই প্রবণতা সরকারের রাজনৈতিক বৈধতাকে মলিন করে বৈ কি?
গণতন্ত্রের একটি মৌলনীতি হলো বিরোধী দলের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধী দল দমনের যে নির্মম খেলা উপভোগ করা যায়, তাতে সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও বিরোধী দল সংসদ বর্জন করেছে যেন সরকারি দলের নগ্ন বাণী বর্ষণ হতে রক্ষা পায়। আবার যখন বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে সরব হওয়ার চেষ্টা করছে, তখনই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নগ্নভাবে লেলিয়ে দিয়ে তাদেরকে আন্দোলন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে তাদেরকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এখন হরতাল ও অন্যান্য ধরনের প্রতিবাদী সমাবেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মানুষ হত্যা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মামলা দিয়ে সারাদেশের জনগণকে একটি আতংকের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। যাতে সমস্ত দেশবাসী এক দুঃসহ জীবনযাপন করছে। সাধারণ জনগণ বিশেষ করে বিরোধী দলের প্রতি সরকারের এ ধরনের আচরণ জনগণ দ্বারা গৃহীত হতে পারে না। জনগণ দ্বারা অগ্রহণীয় বিষয় শাসনব্যস্থায় বিদ্যমান থাকাকে অধ্যাপক জর্জ এরাগণ রাজনৈতিক বৈধতার সংকট বলে অভিহিত করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরিউক্ত বিষয়গুলো এটা প্রমাণ করে যে, বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে নিপতিত। ক্ষমতাসীনরা মূলত: অযাচিত রাজনীতিকরণের বৈধতা অর্জন করতে চায়, বৈধ রাজনীতি নয়। রাজনীতির বৈধতা সংকট বিপন্ন করতে পারে দেশীয় উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি। আর বৈধ রাজনীতিই মূলত: গণতন্ত্রের বৈধতা সংরক্ষণ করে। সুতরাং গণতন্ত্রের বৈধতা রক্ষাকল্পে ক্ষমতাসীনদেরকে একাগ্র হতে হবে। এ কথা বলতে দ্বিধা নেয় যে, আগামী দিনের নির্বাচনী ফলাফল দৃশ্যত: নির্ভর করবে রাজনৈতিক বৈধতা রাষ্ট্র কতটুকু ধারণ করতে পেরেছিল তার উপর।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
Email: monirmail6@yahoo.com