সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট

একদিকে সরকার যখন অব্যাহতভাবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করিয়া চলিয়াছে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য লইয়া কিছুটা আত্মসন্তুষ্টিতেও ভুগিতেছে, অন্যদিকে তখন শিক্ষক সংকটে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইতেছে খোদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়সমূহের শিক্ষা কার্যক্রম। সেই সংকট কোন্ পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে তাহা অনুধাবন করার জন্য কয়েকটি তথ্যই যথেষ্ট বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ৩১৭টি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে ২১৪টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য ছিল। সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য ১২১টি স্কুলে। আর সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা দেড় সহস াধিক। পরিণামে কোনো কোনো স্কুলে শিক্ষকসংখ্যা নামিয়া আসিয়াছে চাহিদার এক-চতুর্থাংশে। ভাবিতে অবাক লাগে যে, এই অবস্থায় বিদ্যালয়গুলি চলিতেছে কিভাবে। সেই চিত্রটি এককথায় ভয়াবহ। কোথাও কোথাও অপ্রয়োজনীয় শিক্ষকের আধিক্য থাকিলেও বেশিরভাগ স্কুলেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক নাই। ফলে মানবিকের শিক্ষক দিয়া চলিতেছে বিজ্ঞানের পাঠদান—বাংলার শিক্ষক দিয়া ইংরাজি ও অংকের। আর ইহার খেসারত দিতে হইতেছে দেশের ভবিষ্যত্ কর্ণধারদের। দীর্ঘদিন ধরিয়াই যে এই অবস্থা চলিয়া আসিতেছে মাউশির মহাপরিচালক নিজেও তাহা স্বীকার করিয়াছেন। সেইসাথে ইহাও যোগ করিয়াছেন যে, একদিনে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নহে। কেহই আশা করে না যে, একদিনে এই সমস্যার সমাধান হইবে। কিন্তু এই প্রশ্ন তোলা যায় যে, বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল শেষ হইতে চলিয়াছে—এই দীর্ঘ সময়ে সমস্যাটির সমাধান হইল না কেন? সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তারা দীর্ঘকালীন এই শিক্ষক সংকটের জন্য একাধিক কারণ চিহ্নিত করিয়াছেন। তন্মধ্যে শিক্ষকদের অবসর গ্রহণ, পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা অনুসরণ না করা এবং যথেচ্ছ বদলির বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। তবে সকলেই একবাক্যে দায়ী করিয়াছেন নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে। প্রসঙ্গত শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যটি তুলিয়া ধরা যাইতে পারে। তিনি বলিয়াছেন যে, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমেই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হইয়া থাকে। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। তাহার মন্ত্রণালয় ইচ্ছা করিলেও এই ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করিতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রী যাহা বলিয়াছেন তাহাও কোনো নূতন কথা নহে। দীর্ঘদিন যাবত্ আমরা এই সমস্যার কথা শুনিয়া আসিতেছি। সমাধানের উপায় হিসাবে কয়েক বত্সর আগেই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নিয়োগের জন্য পৃথক পিএসসি গঠনেরও উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছিল। উদ্যোগটি এখন কী অবস্থায় আছে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলই তাহা ভালো বলিতে পারিবেন। শিক্ষামন্ত্রী আশ্বস্ত করিয়াছেন যে, শিক্ষক সংকট নিরসনে বিকল্প উপায়ের কথা ভাবা হইতেছে সক্রিয়ভাবে। প্রশ্ন হইল, এতো দেরিতে কেন? ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের যেই ক্ষতি হইয়া গিয়াছে এবং এখনও হইতেছে তাহার দায়দায়িত্ব কে বহন করিবে? যতো অজুহাতই দেখানো হউক না কেন—ঢালাও সরকারিকরণই যে সমস্যার মূল কারণ তাহা অস্বীকার করার উপায় নাই। সরকারের পক্ষে যদি বিদ্যালয়গুলি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভবই না হয়—তাহা হইলে সামর্থ্যের সীমা লঙ্ঘন করিয়া সেইগুলি সরকারিকরণ করা হইল কেন? দেখা গিয়াছে যে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত স্বনামধন্য কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সরকারিকরণের পর শিক্ষার মান ধরিয়া রাখিতে পারে নাই। সরকারিকরণের পরিণতি কতোটা ভয়াবহ হইতে পারে তাহার ভূরি ভূরি উদাহরণ সত্ত্বেও শিক্ষা ক্ষেত্রে এই প্রবণতা যেন দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। ইহা দুর্ভাগ্যজনক শুধু নহে, অনেকটা আত্মঘাতীও বটে। দীর্ঘকালীন এই শিক্ষক সংকটই যে ইহার একমাত্র উদাহরণ নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারক মহল বিরাজমান বাস্তবতার আলোকে সমস্যাটির কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগী হইবেন।