সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা আপাতত ব্যর্থ ভারতে

ধর্ম পালনের স্বাধীনতার নামে সামপ্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করিয়া রাজনৈতিক ফায়দা লুটিবার সর্বশেষ অপচেষ্টাতে ব্যর্থ হইয়া গণতান্ত্রিক অধিকার বঞ্চিত হইবার ধুয়া তুলিতে শুরু করিয়াছে ভারতের অন্যতম ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও ইহার সহযোগীরা। উল্লেখ্য, গত রবিবার একটি ধর্মীয় পদযাত্রার নাম করিয়া উত্তর প্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যা নগরী অভিমুখে হাজার হাজার মানুষ লইয়া অগ্রসর হইয়া রাজ্য সরকারের উপরে চাপ তৈরি করিবার চেষ্টায় লিপ্ত হইয়াছিল ভিএইচপি। কিন্তু সমাজবাদী দলের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের সাহসী পদক্ষেপের মুখে ভিএইচপি-এর পরিকল্পনাটি বানচাল হইয়া যাইবার মধ্য দিয়ে নূতন করিয়া সামপ্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াইয়া পড়িবার হাত হইতে রক্ষা পাইল ভারত। ভিএইচপি এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)সহ অন্য সহযোগীরা পদযাত্রাটিকে নিতান্ত ধর্মাচরণ হিসাবে দাবি করিলেও ইহার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি এতটুকু গোপন থাকিবার উপায় ছিল না। বস্তুত এই পদযাত্রা হইতে অযোধ্যায় বিতর্কিত স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের পুরোনো রাজনৈতিক দাবিটিকে নূতন করিয়া চাগাইয়া তুলিবার সকল প্রস্তুতিই লইয়া রাখা হইয়াছিল। এই দুরভিসন্ধি সফল করিবার উদ্দেশ্যে সারা দেশ হইতে বিপুল সংখ্যক লোকজনকে অযোধ্যায় প্রেরণে ব্যবস্থাদিও করিয়া ফেলা হইয়াছিল। সাধুবাদ জানাইবার মত ব্যাপার এই যে, অন্য অনেক সময়ের মত এইবার আর ধর্ম পালনের নামে সামপ্রদায়িক সংঘাত তৈরি করিবার জন্য উগ্র ধর্মবাদীদিগকে যথেচ্ছ কর্মকাণ্ড করিবার সুযোগ দেয় নাই কর্তৃপক্ষ। বরং ভিএইচপি-এর হুমকি-ধমকিতে ভড়কাইয়া না থাকিয়া তাহাদিগকে দমনে শূন্য সহনশীলতার নীতি পালনে সক্ষম হইয়াছে তাহারা। স্মর্তব্য, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের যথেচ্ছাচারের মুখে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণেই বাবরি মসজিদ ধ্বংস কিংবা গুজরাটে মুসলিম নিধনযজ্ঞ সম্পন্ন হইয়াছিল ভারতে। সন্দেহ নাই যে, পূর্বের মত এইবারও ভোটের বছরে আসিয়া সামপ্রদায়িক-মৌলবাদী কর্মকাণ্ড বাড়াইয়া দিবে ভারতের ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। তাহারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমপ্রদায়ের মন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, সুনির্দিষ্টভাবে বলিলে মুসলিমদের, বিরুদ্ধে বিষাইয়া তুলিতে তত্পর হইবে। অযোধ্যাতে এইবার যাহা ঘটিয়াছে তাহাকেও ‘‘হিন্দুদের স্বার্থের বিনিময়ে মুসলিম তোষণ’’ হিসাবে চালাইয়া দিবার চেষ্টা শুরু করিয়া দিয়াছে ভিএইচপি ও মিত্ররা। উপমহাদেশীয় সামপ্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তির ইহা এক অতি পরিচিত অপকৌশল। তাহারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সমপ্রদায়ের ধর্মানুভূতিকে সুকৌশলে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত করিবার চেষ্টা করিয়া থাকে; নির্বাচন ঘনাইয়া আসিলে নানাবিধ সামপ্রদায়িক-মৌলবাদী অপকর্ম বেগবান করিয়া তোলা হয়। অযোধ্যাতে গুঁড়াইয়া দেয়া বাবরি মসজিদের স্থলটিতে রাম মন্দির নির্মাণের পুরোনো দাবিটি কেন্দ্রীয় সরকারের বরাবরে নূতন করিয়া উত্থাপন করিয়াছে ভিএইচপি। সরকার দাবি পূরণে ব্যর্থ হইলে নিজেদের উদ্যোগে একটি মন্দির বানাইয়া ফেলিবার হুমকিও দেওয়া হইয়াছে। লক্ষ্য করিবার বিষয়, প্রধান হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় থাকিবার সময় কিন্তু এই দাবিটি সেইভাবে কখনোই সামনে লইয়া আসা হয় নাই। অর্থাত্ ধর্মীয় উগ্রবাদী বা তাহাদের সহযোগীরা ক্ষমতায় থাকিলে এইসব অগণতান্ত্রিক দাবিকে স্তিমিত করিয়া রাখা হয়। আর উদারনীতিক শক্তি ক্ষমতায় থাকিলে, বিশেষ করিয়া নির্বাচন আগাইয়া আসিতে থাকিলে এইসব দাবিকে চাঙ্গা করিয়া তোলা হয়। সামপ্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তির এই অপকৌশল ভালোভাবে বুঝিতে পারাটা কেবল ভারত বলিয়া কথা নহে, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হইবার অন্যতম পূর্বশর্ত। কেবল কর্তৃপক্ষ নহে, সাধারণ মানুষজনের মধ্যেও এই বোধের সঞ্চার ঘটানো অত্যন্ত জরুরি বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে।