[ রা জ নী তি ]

বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে

বাংলাদেশের রাজনীতি কোন দিকে এগুচ্ছে? সব দলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে, নাকি প্রধান বিরোধী দলহীন নির্বাচন, সহিংসতা অথবা সাংবিধানিক শূন্যতার পথে? প্রশ্নগুলো এখন সকল মানুষের মনে। রাজনৈতিক হানাহানি ও ধর্মঘটে শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় দেশের উন্নয়ন। এ বিষয়গুলো সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ বোঝেন না তা কিন্তু নয়। তবে তাদের প্রধান বিবেচনা যেহেতু ক্ষমতায় যাওয়া, সেজন্য ক্ষমতায় যাবার হিসাব-নিকাশটাই তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। আর ক্ষমতায় যদি যেতে না পারেন বা ক্ষমতায় যাবার কোন আকাঙ্ক্ষা যদি না থাকে, তাহলে কেন কোন ব্যক্তি রাজনীতি করবেন বা কেনই বা একদল সমমনা লোক রাজনৈতিক দল গঠন করবেন? তবে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণ করা এবং উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত স্তরে দেশকে নিয়ে যাওয়া, নইলে পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে যে দ্বৈরথ তাতেই বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে দুই দশক ধরে। বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং বিএনপির সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তার দল এবং তার দলের নেতৃত্বাধীন জোট কোন নির্বাচনে যাবে না। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস যে, ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন শুরু করে, তখন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে, পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানাতে পারে না। সেই তিনি আজ তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে দুর্বার আন্দোলন করছেন। ২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর বিএনপির প্রতি অনুগত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার জন্য তিনি কী-ই না করেছেন। শেষে তার পরামর্শে বিএনপি দলীয় প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ প্রধান উপদেষ্টার পদ দখল করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য বেগম জিয়া কী-ই না করেছেন। অথচ সেই বেগম জিয়া আজ বলছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তার দল নির্বাচনে যাবে না। অবশ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পণ্ডিতরা বলেন যে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলছেন যে, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোন সুযোগ নেই। কোন অনির্বাচিত ব্যক্তির তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হবার ঘোর বিরোধী তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন তাকে আমি যৌক্তিক ও যথার্থ মনে করি। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল বাংলাদেশ পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি, কেননা গণতান্ত্রিক সকল দেশের সরকার, নির্বাচন, এক সরকারের কাছ থেকে আরেক সরকারের কাছে ক্ষমতার হাত বদল এভাবেই হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থান এ কারণে সঠিক যে, আমরা যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই, তাহলে আমাদের নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। আর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে যে ব্যবস্থায় একটি নির্বাচিত দলীয় সরকার শান্তিপূর্ণভাবে আরেকটি নির্বাচিত দলীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, গণতন্ত্রকে সঠিক পথে চালিত করতে হলে এবং সংবিধানের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে অর্জন করতে হলে আজ হোক আর দশ বছর পরে হোক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে বিসর্জন দিতে হবে। তবে বাংলাদেশের সমস্যাটা ভিন্ন জায়গায়। সরকার সংবিধানের বিধান মেনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে গেল। সেই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল এবং তাদের নেতৃত্বাধীন জোট যদি অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা দেশে ও বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দ্বিতীয়ত: অগণতান্ত্রিক(!) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা বাংলাদেশে প্রয়োজন হয় এ জন্য যে, এখানে রাজনীতিবিদরা একে অপরকে বিশ্বাস করেন না। এখানে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল একে অন্যের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে চান না। আস্থার সংকটই এ সমস্যার মূল কারণ। এ আস্থার সংকট যতদিন না কাটবে, ততদিন আমরা তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছাড়া সমস্যার সমাধান করতে পারব না। বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা দরকার। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। দাতাগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে সমঝোতার জন্য প্রতিনিয়ত তাগিদ দেয়া হচ্ছে। এতে যদি দেশ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে না যায়, তাহলে দেশ সহিংসতার দিকে যেতে পারে বলে অনেকে আশংকা করছেন। একথা এখন কোন দ্বিধা ছাড়াই বলা যায় যে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন স্পষ্ট দু’ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের নেতৃত্বে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী অসামপ্রদায়িক চেতনা ও উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ। অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি। তারাও বহুদলীয় পদ্ধতি ও গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাস করে, কিন্তু তাদের ঝোঁকটা ডানপন্থার দিকে। এদু’দলের রাষ্ট্র পরিচালনার নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, তাদের শাসনের ব্যাপারে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হলেও, সেটি বাংলাদেশের সমাজকে অধিকতর স্থিতিশীল রাখে বলে অনেকে মনে করেন। এ দু’টি দলের ব্যর্থতায়, পারস্পরিক অবিশ্বাসপ্রসূত হানাহানিতে যদি অসাংবিধানিক সেনা শাসন বা উগ্র কোন সামপ্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় সওয়ার হয়, তাহলে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভাল ফল বয়ে আনবে না। আমরা চাই আলাপ-আলোচনা, আমরা চাই সমঝোতা। আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।  লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়