বাংলাদেশে গণতন্ত্রের লক্ষ্য কি পূরণ হবে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে সংবিধানের বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে এক চুলও নড়বেন না। অপরদিকে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আন্দোলনের বাতাস শুরু হলে চুল তো থাকবেই না, অস্তিত্বেও টান পড়তে পারে। জনগণের আন্দোলনের বাতাসে চুল এলোমেলো হয়ে যাবে। দিশেহারা হয়ে যাবেন।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন, আগামীতে বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দান কতটা ভয়ংকর আকার ধারণ করতে পারে তার একটি ইঙ্গিত হলো আমাদের দুই নেত্রীর পরস্পর বিরোধী এই বক্তব্য। তারা বলছেন দেশের জন্য অপেক্ষমাণ এই ভয়ংকর রাজনীতির খেলার হাঁক-ডাক চুল দিয়ে শুরু হলেও এর পরবর্তী পর্যায় রক্ত এবং রক্তাক্ত এক পরিবেশের মাধ্যমে শেষ হয়ে দেশ যে এক অন্ধকার পথে প্রবেশ করবে, দুই নেত্রীর বক্তব্যে তারই প্রতিফলন প্রতীয়মান হচ্ছে। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হলেও শুরু থেকেই এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন কখনো স্থিতিশীল ছিল না। হত্যা, সন্ত্রাস, ক্যু, পাল্টা ক্যুর মাধ্যমে এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করা হয়েছে বার বার। এখানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে কোন দল রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে সেই ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের ওপর যে রকম আচরণ প্রত্যাশা করা হয় তা পূরণে সরকারি দল বার বার ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধী দলও সরকারের ভুলের সমালোচনার পরিবর্তে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরকারকে যে কোন উপায়ে হটিয়ে দিতেই সব সময় সরব থেকেছে। ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়োজিত সরকারি দলকে দেশের সেবায় যতটা না নিয়োজিত থাকার কথা তার চেয়েও বেশি মনযোগী হতে দেখা গেছে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামকে দমন ও রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উত্খাত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে। গণতান্ত্রিক পরিচয়ের উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্রের সরকারি ও বিরোধী দলের এমন আচরণে জনগণকে বার বার মাশুল দিতে হয়েছে। দেশের অর্থনীতি হয়েছে বিপর্যস্থ। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশীরা আফ্রিকার বর্বর জাতির মত অসভ্য জাতি হিসেবে পরিচয় পেতে শুরু করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রীর চুল নিয়ে রাজনীতি বিষয়ক এমন কড়া মন্তব্যের পর জনগণের মাঝে যে প্রশ্নগুলো বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে সেগুলো হলো, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কি আদৌ যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে? আগামী অক্টোবর মাসে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কারো হাতে কি ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে নাকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হাতেই রাষ্ট্রক্ষমতা থাকবে? নির্বাচন কার অধীনে হবে? যদি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতা না ছাড়েন আর বিএনপি যদি তাতে অমত পোষণ করেন তখন কি হবে? তাহলে কি দেশে আবারো এক এগারোর সেনা-সমর্থিত সরকার কিংবা সরাসরি সেনা শাসন ফিরে আসবে? এসব বিষয় নিয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন মহলে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। নারী জাগরণের অগ্রদূত ও সমাজ চিন্তক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, নতুন কোন প্রথা চালু করতে গেলে সমাজপ্রথা মত তাতে গোলযোগ উপস্থিত করে। ১৯৯৫ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মত সম্পূর্ণ নতুন এক ব্যবস্থা চালুর ব্যাপারে আন্দোলন সংগ্রাম করছিল তখন সমাজে ঠিক সে রকমই এক গোলযোগ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। অবশেষে সেই গোলযোগপূর্ণ অবস্থার অবসান হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মত নতুন এক ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্যদিয়ে। এখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। সরকারের ইচ্ছাই হোক কিংবা অনিচ্ছাই হোক এটি বাতিল করা হয়েছে। আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যাপারে রয়েছে প্রবল আপত্তি ও বিতর্ক। তাই নির্বাচনের ব্যাপারে নতুন এক ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা উঠেছে। কিন্তু সেই নতুন ফর্মূলা যে সমাজে সহজে গৃহীত হবে না তা খুব সহজেই অনুমেয় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নানা পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের কথাবার্তার মাধ্যমে এটি বেশ পরিষ্কার। ইতোমধ্যে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যকার যে সংকট ঘনীভূত হয়েছে তা সংলাপের মাধ্যমে নিরসনের জন্য প্রধান দুই নেত্রীর সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। এর আগেও তার দূত হিসেবে সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসনের কথা বলে গেছেন অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার মত প্রভাবশালী দেশগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদেরকেই করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন অনেক আগে থেকেই। এবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসন করার ব্যাপারে এশিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্র চীনও সকল নিরবতা ভেঙ্গে দুই দলকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা বিরাজমান সংকটের সমাধান কিভাবে করবেন। তাদের সিদ্ধান্তের ওপরেই নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি স্থিতিশীল থাকবে না অস্থিতিশীল হবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চলমান অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে না ব্যাহত হবে তা নির্ভর করছে এ দেশের রাজনীতিবিদদের ওপরই। লেখক: রিসার্চ ফেলো, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা অধ্যয়ন কেন্দ্র (সিআইডিএসএস), ঢাকা।