আলোকপাত
ঐশী অপরিচিত কেউ না
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০১৩, ২২:২১
দু’একটি ব্যতিক্রম ঘটনা মাঝেমধ্যে আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আমরা নড়েচড়ে বসি। ঘটে যাওয়া ঘটনার আদ্যোপান্ত বিচার বিশ্লেষণ করি। সময়ের পরিক্রমায় কিছুদিন পর সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। চামেলীবাগে নিজ সন্তান কর্তৃক মা-বাবা (পুলিশ দম্পতি) হত্যা কোন বিরল ঘটনা নয়। এ ধরনের অসংখ্য নারকীয় ও বীভত্স ঘটনার উদাহরণ দেয়া যাবে। তবুও অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— সন্তান কীভাবে মা-বাবাকে হত্যা করতে পারল? যে সন্তানকে মা দীর্ঘ নয় মাস কত কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করল। নিজের আরাম-আয়েশ সবকিছু তুচ্ছজ্ঞান করে মা-বাবা কেবল সন্তানের বর্তমান ভবিষ্যতের নিরাপত্তার ভাবনায় বিভোর। কিন্তু আমরা জানি না বিনিময়ে সে সন্তান ভবিষ্যতে আমাদের নিরাপত্তা দিবে না কি প্রাণ সংহার করবে।
ঐশী খুনী হয়ে জন্মগ্রহণ করেনি। সে অন্য দশটি শিশুর মতো নিষ্কলুষ সত্তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। স্বাভাবিক শিশুর মতো জৈববৃত্তি ও মনুষ্যবৃত্তি নিয়ে তার বেড়ে ওঠা। আমাদের ভুল নির্দেশনা ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে ঐশীর মনুষ্য বৃত্তির উপর সক্রিয় প্রভাব বিস্তার করেছে পশুবৃত্তি। সে তার মা-বাবাকে খুন করেনি, খুন করেছে যে তার কল্পিত ফ্যান্টাসী জগতে বিচরণের পথে অন্তরায় হয়েছে তাদের। সুতরাং অস্বাভাবিক, বিকারগ্রস্ত, অসুস্থ মানসিক রোগী, পশুত্বে আবিষ্ট এমন ঐশীর আচরণে অবাক হওয়ার কোন কারণ নেই। ভাবতে হবে ঐশীর এ আচরণের জন্য দায়ী কে বা কারা?
একজন মানব শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হতে সমাজের প্রতিটি স্তরের কমবেশি অবদান থাকে। সমাজ কাঠামোর প্রতিটি স্তরে সঠিক দায়িত্বশীলতা না থাকলে এবং সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা না থাকলে সামাজিক বিপর্যয় অনিবার্য। সে ধারাবাহিকতায় ঐশী আমাদের বিপর্যস্ত সমাজের একজন তরুণ প্রতিনিধি। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি পরিবারে ঐশীদের উপস্থিতি বিদ্যমান। কিন্তু এজন্য শুধু মা-বাবা, পরিবার, পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, দুর্নীতি দমন ব্যুরো, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী এককভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অংশের দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলাফল এটি।
প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন: “আজকাল অবাধ মেলামেশাকে অনেকে আধুনিকতার অংশ বলে মনে করে”। আধুনিকতার নামে আমাদের সন্তানরা ভুলতে বসেছে আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক মূল্যবোধ। পারিবারিক সুস্থ বিনোদন নেই বলেই শিশুকে আশ্রয় নিতে হচ্ছে যন্ত্রের কাছে। আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে আমাদের তরুণ সমাজ বিকৃত ও অসুস্থ সংস্কৃতিকে গ্রহণ করছে। মা-বাবা জানার চেষ্টা করেন না তার সন্তানের বন্ধু কারা? অবশ্য যখন খবর আসে তখন শুধু ভুলের মাশুল গুনতে হয়। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় বিচিত্র সব মাদকদ্রব্যের পশরা। আবাসিক হোটেল, রেস্তরাঁয়, সাইবার ক্যাফে, মোবাইল ইন্টারনেটের নামে তরুণ সমাজ কী করছে এ ব্যাপারে কারো মাথাব্যথা নেই। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আর নিজস্ব সংস্কৃতির লালন এখন সেকেলেদের কাজ। লাগামহীন জীবন আর ভোগবাদী দর্শন বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে পরিচালনা করছে। ভঙ্গুর পারিবারিক কাঠামোয় আমাদের সন্তান হূদয়হীন যন্ত্রদানবে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা মনুষ্যত্ব অর্জনের পরিবর্তে আমাদের স্বার্থপর প্রাণীতে পরিণত করছে। পাগলা ঘোড়ার লাগাম না টানলে কিছুদিন পরে আমাদের ভাবতে হবে আমি কি আমার পরিবারে নিরাপদ ? কেননা সমাজ কলুষিত হলে আমরা সর্বত্রই অনিরাপদ।
লেখক :অধ্যক্ষ, ন্যাশনাল কলেজ,
বাড্ডা,ঢাকা-১২১২
e-mail: niru_nc@yahoo.com