রা জ নী তি

নির্বাচন নিয়ে মাঠ গরমের রাজনীতি, ভেতরে প্রস্তুতি

গত কয়েক মাস ধরে টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ, টকশো, নেতৃবৃন্দের সাংবাদিক সম্মেলন, জাতীয় প্রেসক্লাব এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত আলোচনা সভায় দেওয়া প্রধান দুই দলের নেতৃবৃন্দের কথা শুনতে শুনতে সাধারণ মানুষ মনে হয় অনেকটা ক্লান্ত হয়ে উঠেছেন। অনেকেই এসব খবর বা বক্তব্য এখন খুব একটা মনোযোগ দিয়ে শোনেন বলে মনে হয় না। একই কথা, একই ভাষা, একই ধরনের মুখভঙ্গি কতো দেখা যায়, শোনা যায়। বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না, নির্বাচন হতে দেবে না, আন্দোলন করে সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় করবে, কারচুপির নির্বাচন করার সরকারের সকল অপচেষ্টা ধূলিসাত্ করে দেবে ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। অন্য দিকে সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দ বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে না, সরকার মানবে না, সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন হবে, নির্বাচনে বিরোধী দল আসবে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যে আওয়ামী লীগের অধীনে সম্ভব তা তারা প্রমাণ করবে ইত্যাদি। দুই দলের যে কোনো নেতাই দলীয় অবস্থান থেকে যেসব কথা বলেন তার কয়েকটি মাত্র উপরে তুলে ধরেছি। এক সময় এসব কথার প্রতি সাধারণ মানুষের বেশ মনোযোগ ছিল, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও শোনা যেতো, পত্র পত্রিকাগুলোতে দেশে ‘সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য’ এমন খবর প্রতিযোগিতা দিয়ে ছাপা হয়েছে, আমরা যারা কলাম লিখি তারাও বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলের ভয়াবহ আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে নানা রকম লেখা লিখেছি। বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দের বলা নানা কথা, হুমকি এবং সময় নির্ধারণ করে দেওয়া আন্দোলনের হুঙ্কার থেকেই ওইসব আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, লেখা হয়েছে। টকশো গুলোতেও আলোচকগণ যেসব বক্তব্যের ভিত্তিতে নানা মন্তব্য করেছেন, যা শুনে শ্রোতা-দর্শকদের মধ্যেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে শুনেছি। আমাকে ফোন করে অনেক পাঠক প্রায়ই জানতে চেয়েছেন যে, দেশের পরিস্থিতি আসলে কী হতে যাচ্ছে, কোনো টকশো শেষে বাড়ি ফেরার পথে ফোনে কেউ কেউ তাদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার কথাও জানিয়েছেন। হ্যাঁ, পেছনে এমনই একটি সময় আমরা অতিক্রম করে এসেছি যখন দেশে ভয়াবহ সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা ছিল। বিশেষত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশে যে ধরনের পরিস্থিতি ছিল তার ওপর ভিত্তি করেই সাধারণ মানুষ এমন ধারণাই পোষণ করতে বসেছিলেন। বিশেষত রমজান মাসেও যখন জামায়াত কয়েকটি হরতাল ডেকে বেশ কিছু তাণ্ডব করে বসে, ঈদের পর পর আগাম হরতাল ডেকে এবার ঈদে গ্রামে যাওয়া মানুষকে নানা বিড়ম্বনায় ফেলেছিল তখন বেশির ভাগ মানুষই ঈদের পরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য শুনে ধরেই নিয়েছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে ঈদের পর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ১৮ দলীয় জোট বোধ হয় একটা বোঝা পড়ায় যাচ্ছে। সেই বোঝা পড়াটি রাস্তায় গড়ালে রক্তপাত, প্রাণহানি, সম্পদ ধ্বংসসহ নানা ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে এমনটি বেশির ভাগ মানুষই ধারণা করেছিল। মূলত গত কয়েক মাসের মিডিয়ায় প্রচারিত উভয় পক্ষের নেতৃবৃন্দের বক্তৃতা, বিবৃতি, হুমকি-ধামকি শুনেই এমন ধারণাটি প্রকট হয়েছিল। তবে বেশির ভাগ মানুষ এসব কথাবার্তা শুনতে শুনতে বেশ ক্লান্ত এবং বিরক্তও বোধ করছিল। কতো আর এক কথা শোনা যায়! পত্র পত্রিকা খুললে একই বক্তব্য লেখা হচ্ছে, টিভি সংবাদ ও টকশো শুনলেও একই কথা শুনতে হয়, নতুন কথা নেই। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার কথা কেউ কেউ বললেও উভয় পক্ষই যার যার অবস্থানে অনড় আছেন বলে দেখানো হচ্চে। সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে। ভালো কথা। উভয় দলের নেতৃবৃন্দ মুখে তা বলেনও। কিন্তু সমঝোতার উদ্যোগ কেউ নিচ্ছেন না। নেবেন বলেও মনে হয় না। এখানে কেউ কারো চেয়ে ছোট নয় এমন মানসিকতা যেমন রয়েছে প্রতিপক্ষ তেমন উদ্যোগকে কতোটা সহজভাবে নেবে, কতোটা জটিল করে দেবে, পানি কতোটা ঘোলা করে ফেলবে এমন অনিশ্চয়তা উভয় পক্ষের মধ্যেই শতভাগ রয়েছে। ফলে মুখে যে সব কথাবার্তা শোনা যায় বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই মোটেও—এটি এখন বোধহয় প্রমাণ করার প্রয়োজনও আর পড়ে না। তা হলে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, এতোদিন যা শোনা গেছে তা কি কেবলি ফাঁকা আওয়াজ, এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হুমকি ধামকি দেওয়া? এর প্রয়োজন তাদের কেন পড়লো। ভেতরের বাস্তবতাটি আসলে কি? তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলন তা হলে যাবে কোথায়? প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তা হলে কি নির্বাচনে অংশ নেবেন না? বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া সরকার কি তাহলে একদলীয় নির্বাচন করে ফেলবে? সরকার কি কোনো কারচুপির নির্বাচন করে ফেলবে? সাধারণ মানুষের মধ্যে এতো দিন এসব প্রশ্ন থেকেই সংঘাত-সংঘর্ষের ভয়াবহ আশংকা ছিল। এখন তা সেভাবে নেই, তবে এখন সব কিছু নিয়ে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে—যার কয়েকটি আমি উপরে তুলে ধরেছি। এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো দিব্যজ্ঞান আমার নেই। তবে যে বিষয়টি অনুমান করছি তা হচ্ছে রাজনীতিতে নানা কৌশল আছে বলে একটি তত্ত্বীয় কথা চালু আছে, সাধারণ মানুষের ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘নানা খেলা’ আছে। যে যে শব্দই প্রয়োগে বিষয়টিকে দেখুন না কেন, আমাদের প্রধান দুই দল এখন নির্বাচন নিয়ে নানা কৌশল প্রয়োগের রাজনীতিতে ভালোভাবে আছে। কৌশলের রাজনীতির বিষয়টি দুই দলের নীতি নির্ধারকগণ খুব ভালো বোঝেন, জানেনও। নির্বাচনের বিষয়টি উভয় দলই সমানে সমানে হিসাব-নিকাশে রাখছেন, বিবেচনায় রাখছেন। জনগণ হয়তো এসব গভীর রাজনীতির মারপ্যাঁচ সহজে বুঝতে পারছেন না। তাই সহজ সমাধান হিসেবে যে যেটি ভালো মনে করেন তাই কেন প্রতিপক্ষ করেন না তা বলতে চায়। অনেক মানুষই সহজ সরলভাবে মনে করেন সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে দিলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আসলেই কি সব সমস্যার সমাধান সেভাবে এক নিমেশে হয়ে যাবে? ভালো করে চিন্তা করলে দেখা যাবে হবে না। নানা নতুন উপসর্গ, প্রশ্ন ও সমস্যা তখন দাঁড়িয়ে যাবে। আবার অনেকেই মনে করেন শেখ হাসিনার সরকার বোধ হয় ক্ষমতায় থেকে কারচুপির নির্বাচন করতে চায়, সেভাবেই জয় ছিনিয়ে নিতে চায়। গভীরভাবে চিন্তা করলে এ প্রশ্নের জবাব কি ততোটা সহজ সরল হবে? না মোটেও হবে না। বাস্তবতা হচ্ছে কারচুপির নির্বাচন বাংলাদেশে এখন কেউ করতে পারবে না। জনগণ তেমন নির্বাচন হতে দেবে না। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বা ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রতিহত করতে সাধারণ মানুষ যেভাবে ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এসেছিল এখন তার চাইতেও অনেক বেশি মারমুখী হয়ে রাস্তায় নামবে তারা। দেশে ৩০০ আসনে লক্ষাধিক কেন্দ্রে কারচুপি করার বাস্তবতায় সরকারের হাতে নেই। তেমন চিন্তা এখন খুবই উদ্ভট বললে মোটেও অত্যুক্তি করা হবে না। আওয়ামী লীগের কর্মী বা প্রশাসনের মানুষ দিয়ে সীল মারার চেষ্টা করা হলে বিরোধী দলের কর্মী সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ কেন্দ্রে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকবে এমন বাস্তবতা বাংলাদেশে নেই। যতো অজপাড়া গাঁয়েই হোক না কেন, নির্বাচনের সময় কোথাও অস্বাভাবিক আচরণ করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া এখন ছবি যুক্ত ভোটার তালিকা আছে, নির্বাচনে স্বচ্ছল ব্যালট বাক্স রয়েছে, গণনায় সকল পক্ষের প্রতিনিধিরাই উপস্থিত থাকে, সুতরাং অতীতের কারচুপির নির্বাচন বা মিডিয়া ক্যু বা ফলাফল উল্টে ফেলার নির্বাচন করার যুগ এখন বাসি হয়ে গেছে। এখন গণসচেতনতা যেমন বেড়েছে, দুই দল এবং জোটের সম শক্তিরও বাস্তবতা রয়েছে, সর্বোপরি জনগণের চোখ রয়েছে। মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক মহল তো রয়েছেই। সরকার এ সবকে উপেক্ষা করে কিছু করতে যাওয়ার পরিণতি হচ্ছে আপন হাতে নিজের কবর খোঁড়া, সেটি এখন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সকল দলই জানে ও বোঝেও। তাছাড়া সরকারে থেকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করিয়ে কৃতিত্ব নেওয়া যে কোনো দলের পক্ষেই বেশ কষ্টকর হয়ে গেছে। বিরোধী দলে থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনেক সুবিধা। কোনো দায়-দায়িত্ব নেই বললেই চলে। সাধারণ ভোটারদের সন্দেহের চোখ ও তীর অনেকটাই সরকারের দিকে থাকে, বিরোধী দলের দিকে প্রবল সহানুভূতিই তাদের থাকে। প্রচারণায় সরকারের বিরুদ্ধে জিগির তুলে দেওয়া গেলে ভোটের বাক্সে গিয়ে এর ফলাফল পড়তে মোটেও দেরি হবে না। আমাদের দেশের ভোটারদের বড় অংশই এখনো আবেগ, উচ্ছ্বাস, হুজুগ, প্রচার-প্রচারণায় অনেক বেশি গা ভাসিয়ে দেয়। সব কিছু তুলনা করা, বিচার-বিশ্লেষণ করে ভোট দেখার মতো ভোটারের সংখ্যা এখনো তলানিতে অবস্থান করছে। ফলে নির্বাচনের বিষয়গুলো অতো সহজে হিসাব করা যাবে না। সরকারি দল, বিরোধী দল এসব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। তবে ঐ যে বলেছি, এখন চলছে কৌশলের লড়াই। আন্দোলনের ধরন-ধারণও তাই বদলে গেছে। বিরোধী দল মারদাঙ্গা আন্দোলন করলে শহরের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, ব্যবসায়ী মহল ক্ষুব্ধ হতে পারে, বিদেশিরা তো আছেই। তাছাড়া বিএনপির সঙ্গে জামায়াত-হেফাজত থাকায় সেই আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও নিয়ন্ত্রণ কতোটা বিএনপির হাতে থাকবে তা নিয়ে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সন্দিহান। দলের অভ্যন্তরেও কেউ কাউকে ছেড়ে না দেওয়ার মনোবৃত্তি চাঙ্গা হয়ে ওঠার নজির দেখা যাচ্ছে। ফলে মারদাঙ্গা আন্দোলন নয়, বরং কৌশলের মাঠগরমের আন্দোলনে বিএনপি অগ্রসর হচ্ছে। এই আন্দোলনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মুখে মুখে প্রবল থেকে প্রবলতর থাকবে, তাতে দ্বিধাগ্রস্ত, সন্দেহগ্রস্ত সাধারণ মানুষের সমর্থন বিএনপির দিকে বেশি থাকার সম্ভাবনা থাকবে, সরকারকে ভিন্নভাবে চিহ্নিত করার কাজটি সুচারুরূপে করা সহজ হবে, ভোটের বাজারটি অনেকটা অনুকূলে আনা সম্ভব হতে পারে। অবশেষে কৌশলগত অবস্থান সৃষ্টির পর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ডাকও যথাসময়ে আসতে পারে। সেটি ভেতরের রাজনীতির সূক্ষ্ম কারুকাজ যা কেবল সময় মতোই বলা যায়-এতো আগে নয়। অন্য দিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের হাঁকডাকের আন্দোলনের রচিত পথ দেখে দেখে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাতে আওয়ামী লীগের কৌশল কতোটা স্বচ্ছ রাখা সম্ভব হবে তা নির্ভর করবে প্রতিদিনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি দেখে ও বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর। তবে আগেই বলেছি, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরকার দল ও জোটের জন্যে সময়টি খুবই প্রতিকূলের। সামান্যতম আস্থার সংকট সরকারকে অনেক পেছনে নিক্ষেপ করতে পারে। সরকারের অবস্থানটি বেশ কঠিন। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করিয়ে নিজেদের পক্ষে সহজ জয় আদায় করে নেওয়া খুবই কঠিন। সেই কঠিন চ্যালেঞ্জটি আওয়ামী লীগ কতোটা জেনে শুনে ও বুঝে করছে জানি না। তবে বুঝতে ভুল করলে আওয়ামী লীগকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারকে রাজনীতির নানা সমীকরণ, মারপ্যাঁচ কতোটা আওয়ামী বোঝাতে সক্ষম হবে- তার ওপর নির্ভর করবে ফলাফল। ব্যর্থ হলে বিপর্যয়, সফল হলে অন্যরকম কিছু। এমন এক চিকন রশির পুল পার হচ্ছে আওয়ামী লীগ, তা থেকে পা ফসকে পড়ে গেলে বিএনপির জয় অবধারিত। লেখক :অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ, রাজনীতির বিশ্লেষক