স্মরণ
ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান :জীবন ও কর্ম
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৫
বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিল্পীই ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান সম্পর্কে তেমন একটা জানেন না। কিন্তু যখন গান বেজে ওঠে ‘এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া’ অথবা ‘গুন গুনাগুন গান গাহিয়া নীল ভ্রমরা যায়‘ তখন খোঁজ নিয়ে দেখে তার স্রষ্টাই হলো মোমতাজ আলী খান। বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে ভারতবর্ষেও তাঁর গান সমধিক জনপ্রিয়। ওস্তাদ মোমতাজ আলী খানের হাত ধরেই বহু শিল্পী পেয়েছে জনপ্রিয়তা, হয়েছেন সঙ্গীতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত।
গুণী এই শিল্পীর জন্ম ১৯১৫ সালের ১ আগস্ট মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইরের ইরতা কাশিমপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম আফসার আলী খান ও মাতা বেদৌরা খান। স্কুলে পড়া অবস্থায় পিতার কেনা কলের গানে গান শুনে শুনে সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ জন্মে মোমতাজ আলী খানের। সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে গান শেখার জন্য কোলকাতায় যান। সেখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে দীর্ঘ পাঁচ বছর তালিম নেন পদ্মভূষণ উপাধিপ্রাপ্ত ওস্তাদ নেসার হোসেন খানের কাছে। পাশাপাশি ওস্তাদ জমির উদ্দিন খানের কাছে খেয়াল, ঠুমরী ও গজলে তালিম গ্রহণ করেন তিন বছর। একাগ্রে অনুশীলনের ফলে অতিঅল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। এ সময় মোমতাজ আলী খান প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। কিন্তু ডিগ্রী পরীক্ষার সময় বসন্ত রোগে আক্রান্ত হওয়ায় পরবর্তীতে আর সে পরীক্ষা দেয়া হয়নি। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে সাথে গ্রাম বাংলার আবহমানকালের মাটির সুরে দোতারা সহযোগে লোকসঙ্গীতের চর্চা করতেন। বাংলার শাশ্বত লোকজ সংস্কৃতির ধারাকে মূলধন করে এই মহান সাধক হাতে তুলে নেন কলম ও দোতারা। এ সময় তিনি ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর শিষ্যত্ব লাভ করেন এবং তাঁর স্নেহধন্য হবার গৌরব অর্জন করেন। এই ওস্তাদের সহায়তায় মোমতাজ আলী খান কোলকাতার সং পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৩২ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ‘ওরে শ্যাম কেলে সোনা, তোমার বারে বারে করি মানা’ এবং ‘আমি যমুনাতে যাই বন্ধু, তোমার সনে দেখা না পাই’ এ দুটি গান তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হলে তিনি বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর ১৯৩৩ সালে কোলকাতা বেতারে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মোমতাজ আলী খান সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রচিত ‘বাংলা মায়ের রাখাল ছেলে বাঁশী দিল টান,’ ‘বাংলাদেশের মাটি ওগো তুমি আমার জন্মস্মৃতি’ প্রভৃতি গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে। ১৯৬০ সালে লালন গবেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের অনুরোধে তিনি লালনের বহু গানের সুর করে নিজে রেকর্ড করেন এবং আবদুল আলীম, লায়লা আরজুমান্দ বানু ও মাহবুবা রহমানসহ বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে রেকর্ড করান। পাকিস্তান আমলে বেশ কিছু ছায়াছবিতে গায়ক, গীতিকার ও সুরকার হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। এ সবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-আকাশ আর মাটি, সাত ভাই চম্পা, বেদের মেয়ে, অরুন বরুন কিরন মালা, রূপবান, জোয়ার ভাটা, যে নদী মরু পথে, ভাওয়াল সন্ন্যাসী ইত্যাদি। স্বাধীনতা উত্তারকালে যে সব ছবিতে কাজ করেন তার মধ্যে কয়েকটি হলো— দয়াল মুর্শিদ, সুজন সখী, অনেক দিন আগে, একমুঠো ভাত, লালন ফকির, নিমাই সন্ন্যাসী ইত্যাদি। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন যে ভাবধারায় শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, মোমতাজ আলী খানও একই ভাবধারায় সঙ্গীত সাধনা করে গেছেন। তাদের তিনজনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত মধুর।
মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি রেডিও, টেলিভিশনে সঙ্গীত পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেও সঙ্গীত পরীক্ষার পরীক্ষক ছিলেন। এছাড়া তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের লোকসঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বহু শিল্পী সৃষ্টি করেন। ১৯৯০ সালে ৩১শে আগস্ট লোকসঙ্গীতের এই প্রবাদ প্রতিম সাধক ওস্তাদ মোমতাজ আলী খানের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল অশেষ শ্রদ্ধা।
লেখক : লোকসঙ্গীত শিল্পী