[ আ ন্ত র্জা তি ক]

সিরিয়ায় কি হামলা আসন্ন?

সিরিয়াকে নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গন আজ বেশ গরম। আর এরূপ রাজনৈতিক উত্তাপের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সিরিয়াতে আজ যা হচ্ছে তা পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। জঙ্গীগোষ্ঠী ওহাবী ও সালাফীও এদের দোসর। আরব শাসকগণ, তুর্কী এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সমগ্র ইউরোপ রয়েছে একদিকে আর অন্যদিকে রয়েছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল-আসাদ ও তার মিত্র রাশিয়া, ইরান ও চীন। ক্ষমতার দিক থেকে কেউ কারোর চেয়ে কম নয়। সিরিয়া আজ ধ্বংসের পথে। মূলত আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব, পাপেট আরব বিশ্ব ও জঙ্গীরাই এজন্য দায়ী। সিরিয়ায় মার্কিন হামলা কতটা সফল হবে তা নিশ্চিত করে বলা দুষ্কর। লিবিয়াতে রাশিয়া ও ইরান সেরকম বলিষ্ঠ কোন ভূমিকা নিতে পারেনি। মূলত গাদ্দাফীর অস্থির ও ভ্রান্ত-নীতিই এর জন্য দায়ী ছিল। কিন্তু সেদিক থেকে বাসার আল-আসাদ সরকারের কোন দুর্বলতা নেই। আরব দেশগুলোর মধ্যে সিরিয়াই একমাত্র ইরান, রাশিয়া ও চীনের বিশ্বস্ত মিত্র। তাই ইরান ও রাশিয়া কিছুতেই হারাতে চায় না এই মিত্রকে। ইরান বেশ কঠোরভাবেই সিরিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং অনেকটা জোর দিয়েই বলেছে যে, যেকোন মূল্যে সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঠেকাবে। সিরিয়ায় যে ধরনের হামলা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে যে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সম্ভবত এই হামলায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে। হামলায় টোমাহক ক্রজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে। সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উচ্চ মাত্রার সক্ষম বলে ভাবা হয়। সোভিয়েত আমলে রাশিয়ার সরবরাহকৃত এস-২০০ বা এসএ-৫ গ্যামনও রয়েছে এই প্রতিরক্ষা সামগ্রীর মধ্যে। তাছাড়া এসএ-২২ এবং এসএ-১৭ এর মতো অতি সাম্প্রতিক রুশ প্রতিরক্ষা সামগ্রীও রয়েছে সিরিয়ায়। এছাড়া চীনের সরবরাহকৃত বেশ কিছু অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থাও মোতায়েন করেছে দেশটি। অন্যদিকে বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে আঘাত হানতে সিরিয়া হিজবুল্লার মতো গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। তবে ইরাক বর্তমানে সেখানে তার বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে নতুন নীতির দিকে এগোচ্ছে, সেখানে তারা এখন হিজবুল্লাহকে এই পথে যেতে হয়তো উত্সাহী নাও করতে পারে। হিজবুল্লাহর প্রেসিডেন্ট বাশারের পক্ষ নিয়ে নিজেই এখন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে রয়েছে। এই মুহূর্তে সংগঠনটি এতটা সমস্যার মধ্যে রয়েছে যে তারা নিজেদের শক্তি ব্যয় না করার দিকেই মনোযোগী হতে পারে। ব্রিটেন ও ফ্রান্স সিরিয়া আক্রমণের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে থাকলেও ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত অপর একটি দেশ জার্মানি সিরিয়া আক্রমণের ব্যাপারে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকেই অধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সিরিয়া আক্রমণের ব্যাপারে আমেরিকার কূটনৈতিক তত্পরতা পূর্বের থেকে আরো বেশি জোড়দার হচ্ছে। সিরিয়া আক্রমণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা আহবান করলেও আমেরিকাসহ ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত অন্য দেশগুলোতে সিরিয়া আক্রমণের ব্যাপারে ব্যাপক জনবিরোধিতা রয়েছে। সাম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন সিরিয়া সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান আহ্বান করলেও আমেরিকা জাতিসংঘের এরূপ আহ্বানে কতটুকু সাড়া দিবে তাই ভাবনার বিষয়। নব্য বাস্তববাদী ধারণায় বিশ্ববাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকেই শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র অবলম্বন বলে বিচেনা করছে। ৯/১১ পরবর্তীকালে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল তাতে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকার প্রধান সমর্থক থাকলেও সিরিয়া আক্রমণ করা হলে ঘোষিত শত্রু আল-কায়দাই হবে পেন্টাগনের মানিক জোড়। রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী শত্রু বলতে কিছু নেই। আর আমেরিকার সিরিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা আবারও তাই প্রমাণ করতে যাচ্ছে। ইরাকের কাছে রাসায়নিক অস্ত্র থাকার কোন প্রমাণ না পাওয়া গেলেও ২০০৩ সালে ইরাকে রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ আছে এই অযুহাতে আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছিল। আর এখন সিরিয়ার ক্ষেত্রেও তাই ঘটলো। আমেরিকা এখন অভিযোগ তুলেছে যে, বাশার আল-আসাদের সেনাবাহিনী দামেষ্কের কাছে রাসায়নিক হামলায় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। মানুষ নিহত হয়েছে একথা সত্য কিন্তু কারা তাদের হত্যা করেছে, তার কোন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। আমেরিকার এসকল অভিযোগকে কি আমরা আজ রূপকথার গল্পের সাথে তুলনা করবো? আমেরিকার অভিযোগের বিপক্ষে বাসার আল-আসাদ যুক্তি দিয়েছেন যে, জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শকদের দামেস্কে ডেকে এনে তাদের হোটেলে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে রাসায়নিক অস্ত্রে মানুষ হত্যা করে নিজের ক্ষতি আমি কেন করবো? সিরিয়ায় অবস্থানকারী জাতিসংঘের পরিদর্শক কালা ডেল পন্টেও জানিয়েছেন, শক্ত ও জোরালো সন্দেহ যে, বিদ্রোহীরাই এ কাজ করেছে। যখন পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীরা পরাজয়ের মুখে তখন সরাসরি মার্কিন হামলার অজুহাত তৈরির জন্য ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলেকজান্দার লুকাশেভিচও প্রশ্ন তুলেছেন: ঘটনা ঘটবার কয়েক ঘন্টা আগেই কী করে রাসায়নিক হামলার অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণাদি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে যায়? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সিরিয়ার বিরুদ্ধে এর আগেও বিমান হামলা করে বেসামরিক নাগরিক হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আমেরিকা কর্তৃক সিরিয়া আক্রমণের এই পরিকল্পনা সাম্প্রতিককালের কোন ঘটনা থেকেই সূত্রপাত হয়েছে এটা ভাবা সমীচীন হবে না। আমেরিকার রাজনীতিতে বরাবরই ইসরাইলের একটা প্রভাব থাকে। আর মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতি হচ্ছে সেই প্রভাবের একটা প্রতিফলন মাত্র। ১৯৮২ সালে মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে যে ইসরাইলী নীল নকশা করা হয়েছিল বারাক ওবামা তার বাস্তবায়ন করছেন মাত্র। ১৯৮২ সালের এই পরিকল্পনার মূল কথা ছিল যে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাকে ভেঙ্গেচুরে নতুন চেহারা দেয়া। ইসরাইলী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ওদেদ ইননের নামে এর নাম হয় ‘ইনন প্লান’। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, সুদান, ইয়েমেন ও লিবিয়াকে সাম্প্রদায়িক ভাগে বিভক্ত করে বেশ কিছু তাবেদার রাষ্ট্র বানানোর কথা লিখেছিলেন জায়নিষ্ট ইনন। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে আরব অঞ্চলকে অস্থিতিশীল রাখা ছাড়া তাদেরও উপায় নেই। “আরব বসন্তে” পৃষ্ঠপোষকতা করে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সংঘাত উসকে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে সেই লক্ষ্যই তারা হাসিল করছে। সমগ্র মুসলিম দুনিয়াকে কৌশলে ইসলামী বনাম সেক্যুলার চত্বরে বিভক্ত করে জাতীয় সংহতি ধ্বংস করা হচ্ছে। আর এই কাজে সহযোগী হয়েছে গণবিরোধী ইসলামপন্থী দল এবং পরজীবী ও প্রগতিবাদীরা। আর জাতীয় সেনাবাহিনীগুলোকে দেখা যায় মীরজাফরের ভূমিকায়। সবদেশ দখল ও স্বদেশী হত্যাই তাদের একমাত্র বীরত্ব। আমেরিকা কর্তৃক সিরিয়া আক্রমণের ফলাফল ইরাক এবং আফগানিস্তান আগ্রাসনের মতো সহজ হবে না। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এর আগে দুবার সিরীয় সেনাদের হাতে মার্কিন বিমান ভূপাতিত হয়েছিল। সিরিয়ার সঙ্গে রয়েছে পরাশক্তি রাশিয়া, রয়েছে জাতীয়তাবাদী ইরান এবং অসম যুদ্ধে দশ হিজবুল্লাহ। আমেরিকা সিরিয়া আক্রমণের পক্ষে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন পাবে কি-না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। রাশিয়া ও চীনের বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত ব্যর্থ। রাশিয়া এবারও সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে সমর্থন না দেয়ার ইঙ্গিত করেছে। রাশিয়া মনে করে যে, সিরিয়ার সরকারি বাহিনী রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সে কারণে বিষয়টি প্রমাণ সাপেক্ষ। তাছাড়া সিরিয়ার সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিসরে সংঘাতের জন্ম দিতে হবে। আমেরিকা কর্তৃক সিরিয়া আক্রমণ আজ জনমনে একটি মাত্র প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর সেটি হলো— আমেরিকা কি তবে সত্যিই আল-কায়দার সমর্থন নিতে যাচ্ছে? আমেরিকা যাকে সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করেছে, সিরিয়া আক্রমণের ক্ষেত্রে যদি তারই সমর্থন নেয় তাহলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমেরিকা যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু থাকবে? সমগ্র আরব বিশ্ব এবং বিশেষ করে ইরানের উপর মার্কিন কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে সিরিয়া। আর তাই হয়তো আমেরিকা চাচ্ছে সবার আগে সিরিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে। সিরিয়া আক্রমণের পরবর্তীকালে হয়তো ইরান, রাশিয়া এবং চীনের দিকেই মার্কিন আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি দিক নির্দেশনা দিবে। আর তাই হয়তো রাশিয়া পশ্চিমা ও ইসরাইলের শত বাধা উপেক্ষা করে সিরিয়ায় মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এস-৩০০ প্রেরণ করলো। যদিও রাশিয়া এই ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছে তবে রাশিয়া সিরিয়াকে অন্যান্য সামরিক সহায়তা দেয়া অব্যাহত রেখেছে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়