ঢাকায় ঘুরে কী ধারণা নিয়ে ফিরে এলাম
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪০
সম্প্রতি ঢাকা থেকে লন্ডনে ফিরে আসার পর (১৮ আগস্ট রবিবার) এখানকার বন্ধু-বান্ধবের জেরায় প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। সকলের মুখে এক প্রশ্ন, দেশ কেমন দেখে এলেন? প্রশ্নটা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকলে কথা ছিল না। কিন্তু এই প্রশ্নের শাখা-প্রশাখা অনেক। যেমন (ক) সাধারণ নির্বাচন হবেতো? (খ) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা হবে কি, না হলে বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি? (গ) বিএনপি নির্বাচনে না এলে সরকার কি সত্যই নির্বাচনে যাবে এবং সেই নির্বাচন কি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে? (ঘ) বিএনপি’র অসহযোগিতায় দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে না পারলে ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ শুরু হবে কি? (ঙ) যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত (বিএনপি’র অংশগ্রহণে) হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের টেনে টুনেও জয়ের আশা আছে কি?
এতোগুলো প্রশ্নের জবাব একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব নয়, একজন দৈবজ্ঞের পক্ষেও নয়। তারপরেও বন্ধুদের মুখে সব প্রশ্নের শেষ প্রশ্ন, কাগজে দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আপনার সাক্ষাত্ হয়েছে। দু’ঘন্টার উপর ছিলেন। কি কথা হয়েছে? বর্তমান সংকট থেকে দল ও দেশকে রক্ষার জন্য কোনো পজিটিভ পদক্ষেপ গ্রহণের আভাস দিলেন?
মাত্র দু’সপ্তাহ ঢাকায় ছিলাম। এতো প্রশ্নের জবাবদানের মতো অভিজ্ঞতা এতো স্বল্পসময়ে অর্জন করতে পারিনি, যেটুকু পেরেছি তার ভিত্তিতেই বন্ধু-বান্ধবের কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করেছি। আগেই তাদের বলে দিয়েছি, আমার জবাবগুলোকে তারা যেন প্রোফেসি হিসেবে ধরে না নেন। দীর্ঘকাল ধরে সাংবাদিকতা করছি। সেই সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এগুলো আমার অনুমান। এই অনুমান সঠিক হতে পারে, আবার সঠিক নাও হতে পারে। সবই নির্ভর করে বাংলাদেশের পরিস্থিতির উপর। বাংলাদেশে পরিস্থিতি সতত পরিবর্তনশীল।
বন্ধুদের বলেছি, আগামী সাধারণ নির্বাচনটি একটু আগেপিছে যে কোনো সময়েই হোক, অনুষ্ঠিত হবে। সরকার বিএনপি’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এক ধরনের সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হতে পারে। বিএনপি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে যতোই দর কষাকষি করুক, তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে (তাদের সেই নির্বাচন প্রস্তুতি শুরু হয়েও গেছে)। বিএনপি নির্বাচনে না এলে দলটির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।
দলটি কোনো আদর্শভিত্তিক দল নয়। ক্ষমতালাভকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দলছুট নেতার পাঁচমিশালী দল। এজন্যে এরা কোনো গণআন্দোলন সৃষ্টি করতে পারে না। সন্ত্রাস ও অরাজকতা সৃষ্টির পথে যায়। বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে না, ক্ষমতায় যাবে না বুঝতে পারলে দলের অনেক বড় বড় নেতা দল ছাড়বেন। আগেও তারা একবার বিএনপি ছেড়ে জাতীয় পার্টিতে, আরেকবার জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিএনপি’তে এসেছেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তার সবচাইতে বড় প্রমাণ।
এবার নির্বাচনে জেতার বিরাট প্রত্যাশা সামনে নিয়ে কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না এমন সিদ্ধান্ত হলে দলের অনেক রুই-কাতলা হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করবেন, নইলে পাল্টা বিএনপি খাড়া করে নির্বাচনে যাবেন। ঢাকায় কোনো কোনো কাগজে খবর বেরিয়েছে, বিএনপি’র এক শ্রেণীর নেতা ইতিমধ্যেই ইউনূস-শিবিরে গিয়ে তার নেতৃত্বে নতুন জোট গড়ে উঠুক তার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সুতরাং নিজের নেতৃত্ব, দলের অস্তিত্ব এবং পুত্রের ভবিষ্যতের কথা ভেবে খালেদা জিয়াকে ভোল পাল্টাতে হবে এবং নির্বাচনে যেতে হবে বলে অনেকের মতো আমারও ধারণা।
তারপরও সমস্ত স্পেকুলেশন ব্যর্থ করে খালেদা জিয়া যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে নির্বাচনে না আসেন, তাহলে কি হবে? আমার ধারণা, নির্বাচন অনুষ্ঠান বন্ধ হবে না। প্রথম কথা, বিএনপি যদি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে এক অংশ নির্বাচনে আসে, অথবা ড. ইউনূসের নেতৃত্বে বিএনপি’র বর্তমান ‘গৃহহারা নেতারা’ (যেমন ডা. বি. চৌধুরী, কর্নেল ওলি, শেখ রাজ্জাক আলী, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা প্রমুখ) এবং জিরো জনসমর্থনের দলগুলো (যেমন গণফোরাম, কল্যাণ পার্টি, কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি, বিকল্প ধারা ইত্যাদি) নতুন বিরোধী জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয় তাহলে বর্তমান সরকারের পক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো বাধাই থাকবে না এবং তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলবে।
বাংলাদেশে উপরে বর্ণিত পরিস্থিতি যদি ঘটে, তাহলে বিএনপি কেবল জামায়াত ও হেফাজতের উপর নির্ভর করে সন্ত্রাস সৃষ্টি দ্বারা নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না। ৭১’এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার লক্ষ্যে জামায়াত দেশব্যাপী সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে গিয়ে শক্তি ক্ষয় করেছে। হেফাজত সাময়িকভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল, এখন তারা সম্পূর্ণ এক্সপোজড্। তরুণ বয়সী মাদ্রাসা ছাত্রদের একাংশের দ্বারা দেশে বিচ্ছিন্নভাবে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা যাবে, গৃহযুদ্ধ বাধানো যাবে না। বরং শেখ হাসিনা যদি কঠোর হন, তাহলে শান্তিরক্ষাকারী বাহিনীগুলো দ্বারাই এই সন্ত্রাস সহসা দমন করতে পারবেন।
বেগম জিয়া সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ও আনুগত্যে চিড় ধরাবার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন, উসকানিমূলক অনেক কথা বলেছেন। সফল হননি। ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক তার রাজনীতির দিন শেষ হয়ে গেছে। আমি দেশের অনেক সবজান্তার মতো গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা দেখি না। বিশ্বপরিস্থিতিও এই গৃহযুদ্ধের অনুকূল নয়। যদি আমেরিকার মতো সুপার পাওয়ার নিজেদের আধিপত্যবাদী নীতির স্বার্থে বাংলাদেশে মিসরের মতো ঘটনা ঘটাতে চায় সেটা অন্য কথা। সে আশঙ্কা যে নেই, তা নয়।
এখন সবচাইতে বড়- মিলিয়ন ডলার প্রশ্নটি। যদি বিএনপি’র অংশ গ্রহণে যথানিয়মে সাধারণ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার আশা আছে কিনা? আমি এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তার মনোভাব জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, “আমাদের অনেক ব্যর্থতা আছে। কিন্তু আমরা অনেক ভালো কাজ করেছি, যা আগের কোনো সরকার করেননি। তারপরও যদি ভোট দাতারা আমাদের ভোট না দেয় আমাদের কি করার আছে? তারা না চাইলে আমরা ক্ষমতা ছেড়ে দেব।
এ কথা বলা সত্ত্বেও দেখেছি তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং তাতে জয়লাভ সম্পর্কে আশাবাদী তার এই আশা পোষণের পেছনে কারণও রয়েছে। এ কারণগুলো আমিও বুঝতে পেরেছি কয়েকদিন ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে ঘুরে ফিরে অনেক পরিচিত, অপরিচিত জনের সঙ্গে কথা বলে। বিএনপি’র আকস্মিক জনপ্রিয়তা অর্জন বা হেফাজতিদের কারণে সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটেছে একথা এখন আর আমি বিশ্বাস করি না। এই পরাজয়ের কারণ অন্য। সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। সময় ও সুযোগ মতো আলোচনা করবো।
পাঁচই মে রাত্রে শাপলা চত্বরে হাজার হাজার হেফাজতিদের হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে এই মিথ্যা প্রচার সাময়িকভাবে জনমনে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু এখন আর তা কেউ (কাদের সিদ্দিকি প্রমুখ কিছু মতলববাজ ছাড়া) বিশ্বাস করে না বা প্রচারও করে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে হেফাজতি উত্থান অনেকটা কাল বৈশাখির মতো। অকস্মাত্ ঘূর্ণি তুলে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে তারপর মিলিয়ে যায়। আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। হেফাজতিরাও আকস্মিক উত্থান দ্বারা দেশে একটা লণ্ডভণ্ড অবস্থা সৃষ্টি করে সহসাই আবার মিলিয়ে গেছে। দেশের রাজনীতিতে তার কোনো স্থায়ী ইমপ্যাক্ট নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। জামায়াত ও হেফাজত যে একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ এটা এখন দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট।
ড. ইউনূস তার গোদা পায়ের লাথির ভয় দেখাচ্ছেন আওয়ামী লীগকে। তার এই গোদা পা হচ্ছে নাকি গ্রামীণ ব্যাঙ্কের সাথে যুক্ত ৮০ লাখ নারীশক্তি। এরা নাকি তার কথায় আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ভোট দেবে। এই প্রচারণাতেও আমার সম্পূর্ণ আস্থা নেই। বর্তমান সরকার যখন গ্রামীণ ব্যাঙ্কের পরিচালনা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনেন, তখনও ড. ইউনূস এই নারী বাহিনীর কাছে অসংখ্য প্রচারপত্র পাঠিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছিলেন। নারী বাহিনী সে ডাকে সাড়া দেয়নি। ভবিষ্যতেও তারা সকলে একজোট হয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তা মনে হয় না। গ্রামীণ ব্যাঙ্কের অবস্থা এখন মোটেই খারাপ নয়, বরং আগের চাইতে মোটামুটি ভালো চলছে।
আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জ আসবে তার ভেতর থেকে। এতো পুরনো সংগঠনটির অবস্থা এখন খুবই নড়বড়ে। আভ্যন্তরীণ দলাদলি, বিভিন্ন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দমনে দলের হাইকমান্ডের ব্যর্থতা, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একাংশের সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি, সর্বোপরি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের এক বৃহত্ অংশের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং গণবিচ্ছিন্নতা সরকারের সব ভালো কাজের মাথায় কালি ঢেলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের এক এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেছি, তার এবং তার স্বজনদের অত্যাচারে, লুটপাটে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ। আগামী নির্বাচনে তারা বিএনপির একজন খারাপ প্রার্থীকেও ভোট দিয়ে এই এমপি’র কবল থেকে বাঁচতে চায়।
শেখ হাসিনা বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা করুন। কিন্তু সেই সঙ্গে দলের ভেতরে এই ক্রমবর্ধিত আগাছাগুলো সমূলে উপড়ে ফেলুন। একশ্রেণীর মন্ত্রীর পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা বলা বন্ধ করুন। দলীয় সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি যে কঠোর হয়েছেন, তার প্রমাণ তুলে ধরুন দেশবাসীর সামনে। হলমার্ক, ডেসটিনি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচারে সোপর্দ করুন। দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করার ব্যবস্থা করুন। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যারহস্য উন্মোচন আর যেন ঝুলিয়ে রাখা না হয়। মহাজোটকে শক্তিশালী করুন, জেনারেল এরশাদের সঙ্গে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়া করুন। প্রচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করুন।
নিজের ঘর সামাল দিতে পারলে ইউনূস, হেফাজত কোনো ‘পেপার টাইগারকেই’ শেখ হাসিনার ভয় করার কিছু নেই। কথায় বলে যতো গর্জায় ততো বর্ষায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এখন গর্জনের শব্দ বেশি। বর্ষণ তেমন হবে না। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অবশ্যই পাবে না। হয়তো তাকে মহাজোটের বাইরে স্বতন্ত্র ও সমমনা অন্য কোনো দলের সদস্যদের নিয়ে জোট সরকারও গঠন করতে হতে পারে। কিন্তু যারা নির্বাচনের বহু আগে থেকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ত্রিশটি, বড়জোর ষাটটি আসন পাবে বলে গুজব ছড়াচ্ছেন, তাদের গুজবে বিশ্বাস করি না। অন্তত দেশে দু’সপ্তাহ কাটিয়ে এ গুজব বিশ্বাস করার কোনো কারণ খুঁজে পাইনি।
সিটি কর্পোরেশনের পাঁচটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরেছে। এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়েই আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এই মুহূর্তে দরকার দলটির মনোবল উদ্ধার এবং কঠোর আত্মসংশোধন।
লন্ডন ৩১ আগস্ট, শনিবার, ২০১৩