সন্ধ্যা ও কীর্তনখোলা নদীর ভাঙন
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:০৮
বরিশাল শহরের পাশ দিয়া বহিয়া যাওয়া কীর্তনখোলা নদী পাড় ভাঙিতে শুরু করিয়াছে অকস্মাত্। বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়াছে বরিশাল-ভোলা সড়ক। বন্ধ হইয়া গিয়াছে ফেরি পারাপার। নদীর দুই পাড়ে আটকা পড়িয়াছে বহু সংখ্যক যানবাহন। এই খবর গত শনিবারের। হঠাত্ শুরু হওয়া এই ভাঙনে হুমকির মধ্যে পড়িয়াছে চরকাউয়া বাসস্ট্যান্ডটিও। ইতিমধ্যে নদী গ্রাস করিয়া লইয়াছে এইখানকার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দোকান-পাট। নদীগর্ভে বিলীন হইয়া গিয়াছে সড়ক ও জনপদ বিভাগের কুড়ি মিটার রাস্তা। ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে আরও দুইশত মিটার। পাঠক যখন এই সম্পাদকীয় পাঠ করিতেছেন তখন হয়তো সংহারি নদী গ্রাস করিয়া লইয়াছে আরও অনেক জায়গা-জমি, রাস্তা-সড়ক। কীর্তনখোলার পাশাপাশি পাড় ভাঙিতে শুরু করিয়াছে সন্ধ্যা নদী। ভাঙনের মুখে মানুষ অসহায়। স্থানীয় জনসাধারণ এই বিপর্যয় হইতে রক্ষা পাইবার দাবিতে গত শুক্রবার মানববন্ধন করিয়াছেন। এই সংবাদও ছাপা হইয়াছে দৈনিক ইত্তেফাকে।
আমাদের এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে নদী ভাঙন নূতন কেনা ঘটনা নহে। ইহা এইদেশের সাংবাত্সরিক সমস্যা। যেখানে নদী; ছোট কিংবা বড় সেখানেই ভাঙন। নদী সিকস্তির শিকার হইয়া কত পরিবার, কত জনমানুষ উন্মূল হইয়া গিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। বিলীন হইয়া গিয়াছে বহু পল্লী-জনপদ। বর্ষায় নদীর পাড় ভাঙে। বন্যা-প্লাবনেও ভাঙন অনিবার্য হইয়া দেখা দেয়। কখনও কখনও শান্ত নদীও পাড় ভাঙিয়া চলে অবিরাম। নদীর এই পাড় ভাঙে, ওই পাড় গড়ে— এই প্রক্রিয়া চলিয়া আসিয়াছে আবহমানকাল ধরিয়া। এই দেশে চরাঞ্চলে ভূমি বিরোধেরও বড় একটি কারণ নদী ভাঙন। বাংলাদেশের বেশিরভাগ এলাকার মাটি বেলে কিংবা দোআঁশ— স্বভাবতই নরম, সামান্য ঢেউয়ে ভাঙিয়া পড়ে সহজেই। ইহার ওপর আছে কোনো কোনো স্থানে নদীর কঠিন বাঁক। সেইসব বাঁকে প্রবলবেগে স্রোত আসিয়া ধাক্কা দিলে পাড়ের কি সাধ্য অস্তিত্ব রক্ষা করে! এমত বাস্তবতায় সারা দেশে স্থায়ীভাবে নদী ভাঙন রোধ করা মোটেও সহজসাধ্য কাজ নয়। তথাপিও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভাবে ভাঙন রোধের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। এইখাতে এই যাবত্ কি বিপুল অর্থ সম্পদ ব্যয়িত হইয়াছে তাহার হিসাব চট জলদি বাহির করা বাস্তবিকই দুরূহ। কিন্তু ভাঙন প্রতিরোধী সেইসব ব্যবস্থার ফল স্থায়ী হইয়াছে এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নাই।
সবখানে সবনদীর সকল ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা যাইবে না, সেই সামর্থ্যও আমাদের নাই। ইহা এক রূঢ় বাস্তবতা। কিন্তু বিভিন্ন শহর, ব্যবসায় কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক, ফেরিঘাট, রেল স্টেশন, বাসটার্মিনাল ইত্যাদির সুরক্ষা নিশ্চিত করা একান্ত কর্তব্য এবং সদিচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনা লইয়া কাজ করিলে ইহা অসম্ভবও নহে। আমরা ভাবিয়া পাই না: নদীর পাড় ঘেঁষিয়া আন্ত:জেলা সড়ক গিয়াছে, অথচ ভাঙন হইতে উহা রক্ষা করিবার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নাই। বাস টার্মিনালটির সুরক্ষার পদক্ষেপও পূর্বাহ্নে গ্রহণ করা হয় নাই। সড়ক বা মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সুরক্ষিত রাখিবার জন্য সীমিত দৈর্ঘ্যের নদীতীর বাঁধিয়া দেওয়া কোনো অসম্ভব কাজ নয়। এইরূপ ব্যবস্থা আগে হইতে গ্রহণ করা হইলে বরিশাল-ভোলা সড়কটি ভাঙনের মুখে পড়িত না। যোগাযোগ বিপর্যস্ত হইলে ব্যবসা-বাণিজ্যের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনই সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাইতে হয় জনসাধারণকে। দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টি বুঝিতে না পারার কী কারণ থাকিতে পারে। অত:পর বৃহত্তর বরিশালের কীর্তনখোলা ও সন্ধ্যা নদীর ভাঙনরোধে আশু ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইবে, ইহাই আমাদের প্রত্যাশা।