[ রা জ নী তি ]
বাংলাদেশের নির্বাচন বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এবং রাজনীতিবিদদের এ্যাসিড টেস্ট
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:০৮
নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দাতা দেশ ও সংস্থাসমূহ এমনভাবে জড়িয়ে যাচ্ছেন যা বাহ্যত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও একটা সাধারণ ধারণা জন্মেছে যে, এ হস্তক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ক্রমবর্ধমান বহিঃহস্তক্ষেপের ফলে রাজনীতিবিদরা যে এ্যাসিড টেস্টের সম্মুখীন হয়েছেন, তাতে উত্তীর্ণ হওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রামীণ ব্যাংক, ক্রিকেট, অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে মহাজোট সরকারের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব থাকলেও ইউনূস কূটনীতি, ক্রীড়া কূটনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে নানা কারণে। সেই কারণগুলোর মধ্যে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের অস্পষ্ট ভূমিকাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা শুরু হয়। সেই গণতান্ত্রিক উন্মেষের মুহূর্তে তখনকার বিরোধী দলসমূহ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন তদানীন্তন সরকার বিরোধীদলের দাবি মেনে নিয়ে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান সংবিধানে যুক্ত করে। দুর্ভাগ্যবশত বর্তমান মহাজোট সরকার তাদেরই আন্দোলনের ফলে অর্জিত কেয়ারটেকার ব্যবস্থা রহিত করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। গত কয়েকবছর ধরে বিএনপির নেতৃত্বে বর্তমান বিরোধীদলসমূহ কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নানা কর্মসূচি দিয়ে আসছে। কিন্তু সরকারের অনড় অবস্থার প্রেক্ষিতে বিএনপি কিছুটা নমনীয় হয়ে অন্ততপক্ষে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। বিরোধী দল এখন কেয়ারটেকার ব্যবস্থার দাবি ত্যাগ করে নির্দলীয় ব্যবস্থায় নির্বাচন করার বিকল্প দিয়েছে কিন্তু কোনভাবেই মহাজোট সরকার ও ১৮ দলীয় জোটের বিরোধী দল নির্বাচন নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসতে এখনো সক্ষম হয়নি। দিন দিন রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে অনাস্থা বাড়ছে এবং দেশ এক শ্বাসরুদ্ধকর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আগেই উল্লেখ করেছি বর্তমান সরকারের অনেক উজ্জ্বল অর্জন ম্লান হয়েছে কতিপয় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভুল নীতির কারণে। সরকারের অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃরাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যসমূহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিব্যাপ্ত করার যে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রসমূহ তৈরি হয়েছিল সেগুলোও সরকারের হাতছাড়া হয়েছে অদূরদর্শী, অপর্যাপ্ত এবং অনুন্নত পররাষ্ট্রনীতির কারণে। সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার স্পষ্ট উদাহরণ হলো আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিঃশক্তির শক্তিশালী হস্তক্ষেপের বিষয়টি।
গত ২৭ আগস্ট সকাল ১১টায় নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরে ১৪টি দেশের কূটনৈতিক শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং জাতিসংঘ ও ইইউসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। আরপিও’র ৯১(ই) ধারা সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, বিএনএফ ও জামায়াতে ইসলামীর রেজিস্ট্রেশন বিতর্ক, নির্বাচন চলাকালে সেনা মোতায়েন, নির্বাচনী আচরণ ভঙ্গের কারণে প্রার্থিতা বাতিলের ব্যাপারে কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রভৃতি মৌলিক, অভ্যন্তরীণ বাংলাদেশের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। পত্র-পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে যতটুকু জানা যায়, তাতে দেখা যায় পুরো সেশনটিতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যরা ‘আত্মরক্ষা’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বিদেশি কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গের এক একটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, আর ঢোক গিলছেন, হয়তবা মনের গভীরে অনুভব করছেন, উত্তর বিদেশিদের মনঃপুত হয়েছে কি না!
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা জানতে চান নির্বাচন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কি কি? উত্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, সব দলের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচন চলাকালে আইন-শৃংখলা রক্ষাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সব দলের অংশগ্রহণ কিভাবে নিশ্চিত হবে সেটাই যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এমনকি সব দলের অংশগ্রহণের ব্যাপারে যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার গুরুদায়িত্ব তাঁর স্কন্ধে তার অনেকটা বিচার বিভাগসহ অন্য সংস্থার উপর অর্পণের ব্যবস্থা করে নিজকে ভারমুক্ত করার নিরলস প্রচেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচটি সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবিকে তিনি নস্যাত্ করে দিয়েছেন এবং আসন্ন সাধারণ নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন হবে না বলে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কেন? তাঁর যুক্তি হলো, ২০০৯ সালের নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের রেওয়াজ বন্ধ করেছিলেন, তিনিও তা বহাল রাখছেন। কিন্তু তিনি ব্যাখ্যা করেননি ২০০৯ সালের এবং ২০১৩ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতার মৌলিক পার্থক্যসমূহ এবং বুঝতেও চাননি ২০১৩ সালের বাস্তবতায় সেনা মোতায়েন কত অপরিহার্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার নিক-লোসহ অন্যান্য দেশের অনেক কূটনীতিক নির্বাচনে নিয়োজিত প্রায় সাড়ে ৬ লাখ নির্বাচন কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে আশংকা প্রকাশ করেন। সিইসি বলেন, ১৯৭৩ সাল থেকে নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের নিয়মটি ২০০৯ সালের ১৩নং আইনে বাদ পড়েছে। অর্থাত্ মনে হচ্ছে তিনি পূর্বের সকল আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাহলে আরপিও’র ৯১(ই) ধারা রহিত করতে তিনি এত উঠে-পড়ে লাগলেন কেন? মার্কিন রাষ্ট্রদূত, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার তড়িঘড়ি করে নির্বাচনী আইন সংশোধনে সিইসি কেন বিতর্কিত ভূমিকা রাখছে, তাও জানতে চান। কিন্তু আমতা আমতা করে দেয়া সিইসির জবাব থেকে বুঝা যায়, এ ব্যাপারে তাঁর স্পষ্ট কোন আইনী ব্যাখ্যা জানা নেই।
বিএনএফ-এর মত বিতর্কিত দলটির রেজিস্ট্রেশন সিইসি কেন দিতে চাচ্ছেন এবং জামায়াতে ইসলামীর রেজিস্ট্রেশন বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে, এ ব্যাপারেও সিইসির বক্তব্য খুব স্পষ্ট ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। পত্রিকার খবরে জানা গেছে, বিএনএফের কোন অফিস বা কেন্দ্রীয় দপ্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবুও এ দলটির রেজিস্ট্রেশন প্রদানে সিইসির জোরালো ভূমিকা ইসিকে অনেকটা বিতর্কিত করছে। আরপিও’র ৯১(৩) ধারা বাতিলের ব্যাপারে সারাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সুশীল সমাজে বিতর্কের ঝড় উঠে। পরবর্তীতে ইসি একটি গ্রহণযোগ্য ভূমিকায় নামেন, সম্পাদকদের কাছে একটি বড় বক্তব্য-বিবৃতি পাঠান, আবারো ইসি পিছুটান দেন। এভাবে ইসির অস্পষ্ট, দ্বিধান্বিত ভূমিকা নিঃসন্দেহে ইসির গ্রহণযোগ্যতাকে শূন্যে নামিয়ে আনছে। নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ইসি বার বার প্রতিজ্ঞা করছে। সব দলের অংশগ্রহণও তারা আশা করছেন। কিন্তু কিভাবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে দিবেন না বলে তাঁর ‘চুলতত্ত্বে’ ঘোষণা করেছেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন করবেন না বলে তাঁর আন্দোলনের ‘বাতাসতত্ত্বে’ জানিয়ে দিয়েছেন। তারপরও সিইসি সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের প্রত্যয়-স্পন্দন অনুভব করছেন কোন্ চেতনা থেকে? তিনি কি আসলে কোন রূপরেখায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তা করছেন? নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পূর্বশর্ত দেশ-বিদেশে উচ্চারিত হচ্ছে। সেই নিরপেক্ষ নির্দলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সিইসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলে অন্যরকম একচিলতে আশার আলো জ্বলে উঠতো।
ইসির রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিদেশি কূটনীতিকদের হঠাত্ প্রবেশ বাহ্যত বহিঃহস্তক্ষেপ বলে মনে হলেও এটা অনিবার্য ছিল। কারণ, বিশ্বায়নের এ যুগে পৃথিবীর কোন দেশের পক্ষেই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অবস্থানে থাকা সম্ভব নয়। আমাদের মত উন্নয়নশীল একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দাতা দেশ, মোড়ল দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের মত গ্রহীতা একটি দেশের পক্ষে এ বদনাম, অপমানটুকু সহ্য করা ছাড়া উপায় কি? কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের এবং নেতৃবৃন্দের বজ্র-কঠিন ব্যক্তিত্ব ও দূরদর্শী কূটনীতি বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের সম্মান ও মর্যাদার রক্ষাকবচ হতে পারে। আমাদের তো সেই যোগ্যতা ও সৌভাগ্য এখনো তৈরি হয়নি।
শুরুতে বলছিলাম রাজনীতিবিদরা এখন প্রচন্ড এ্যাসিড টেস্টের সম্মুখীন। বিদেশি কূটনৈতিকরা এখন ইসির নিশ্ছিদ্র প্রকোষ্ঠে মিটিংরত। এ অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। ইতিপূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা বাংলাদেশে এসেছেন। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারী জেনারেল ফার্নান্দেজ তারানকোর স্টোরী এখনো দেদীপ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ, চীনও বার বার নিরপেক্ষ নির্বাচনের তাগাদা দিয়েছেন বাংলাদেশে উড়ে এসে। কয়েকদিন আগে জাতিসংঘ মহাসচিবও প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেত্রীর সাথে দীর্ঘ ফোনালাপ করেছেন। তারপরও যখন আমাদের টনক নড়েনি, সবশেষে বীরবেশে বিদেশিরা এসেছেন সিইসি কার্যালয়ে। সামনে যে তারা কোথায় কিভাবে কোন্ ঘরে ঢুকবেন, সেই আশংকায় পুরো জাতি। আমাদেরকে এ রাজনৈতিক এ্যাসিড টেস্টে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এটাই সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়