অর্থনীতি
অস্থির পরিবেশে অর্থনৈতিক চলকগুলোও অস্থির
প্রফেসর ড. আবদুর রহমান খোকন
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:০৯
একথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। চলমান সময়ে বাংলাদেশের সার্বিক পরিবেশই একটু অস্থির হয়ে আছে। যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব অর্থনৈতিক চলকগুলোকে অস্থির করবে এটাই স্বাভাবিক। ধরে ধরে যদি এক এক করে বিষয়টি উপস্থাপন করার প্রয়াস নেয়া হয় তাহলে প্রথমেই পোশাক শিল্পের অবস্থা বলতে হয় সবাইকে। সাভার ট্রাজেডিতে উল্লেখিত খাত যে ধাক্কা খেয়েছে তা মারাত্মকই বটে। এই খাতের কোন কোন মালিকদের দীর্ঘদিনের শ্রমিক শোষণমাত্রা, শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে না ভাবা, শিল্প-কারখানার সামগ্রিক পরিবেশগত আইন না মানার বিষয়গুলোতো সীমার মধ্যে ছিলো না। তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের কর্মের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে স্বল্প সময়ের মধ্যে অঢেল ধন-সম্পত্তির মালিক হওয়া। বিজ্ঞানমতে প্রতিটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। আর প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম হচ্ছে কোন কিছুতেই সীমাহীনতার ফল ভাল নয়। এই খাতের অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির সমস্ত চলকগুলোকেই শুধু অস্থির করেনি, শ্রমখাত ও বিনিয়োগখাতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
পাঠকবৃন্দ, পৃথিবীতে বেশ কিছুকাল ধরেই অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়গুলোর বিশ্লেষণে পলিটিক্যাল ইকোনমি বা রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়ে আসছে। কারণ, অর্থনীতি মূলত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সিদ্ধান্তের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে। তাই উল্লেখিতভাবেই অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করাই যুক্তিযুক্ত। তবে বাংলাদেশের মতন দেশে যেহারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে তাতে রাজনীতি অর্থনৈতিক চলকের সাথে পরীক্ষা করতে হবে। কারণ, ইদানীং সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়গুলো ভীষণভাবে অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। মনে করা যাক- গত চার মে এক কাপড় ব্যবসায়ী পরিবারের চারজন হরতাল পিকেটারদের কারণে মারা গেল।
চলমান পরিবেশে আমদানি-রপ্তানির উপর যে প্রতিকূল প্রভাবের সৃষ্টি হচ্ছে তাতে ব্যাংকিং খাতে যে সমস্ত ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে তাতে ঋণ পরিশোধের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কমবে। সাথে সাথে কমবে নতুন করে ঋণ প্রদানের মাত্রা। এইভাবে ঋণদানের বিষয়টি নেগেটিভ ইমপ্যাকট সৃষ্টি করে বিনিয়োগের উপর। যা আবার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধার সৃষ্টি করে। উল্লেখিত চলকগুলো ক্রয়ক্ষমতা সমপ্রসারণে করে বাধার সৃষ্টি। অর্থনীতিতে এই অবস্থাটি অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ভাল কথা এই যে,আমাদের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক মন্দার সময়েও ভালই ছিল। কিন্তু অধুনা দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা অর্থনীতিকে যেভাবে চাপের মুখে ফেলেছে তাতে অর্থনৈতিক চলকগুলোর গতিময়তা, অস্থিরতা কিংবা সচলতার সাথে বিনিয়োগকারী, বাজারকারী, ক্রেতাসহ সমস্ত শ্রমশক্তির মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি উপেক্ষা করা হবে অবিবেচকের কাজ। তাই সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি সমগ্র জনগোষ্ঠির মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টিও চলমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। কারণ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চলকগুলো মাইন্ডসেটআপ (যে মূলত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হয়) এ অস্থিরতার সৃষ্টি করে। তাহলে উল্লেখিত আস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ কি? রাজনৈতিক কর্মতত্পরতা থেকে সম্পূর্ণভাবে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে বাইরে রাখতে হবে। আর যদি তা রাখতে ব্যর্থ হয় রাজনৈতিক অর্থনীতি তাহলে বাস্তবতার আলোকেই চলমান রাজনীতিই সমস্যার অক্টোপাশে একসময় বন্দী হবে। হতে বাধ্য।
লেখক: অর্থনীতিবিদ। চেয়ারম্যান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ ও এগ্রিবিজনেস বিভাগ, অতীশ দীপংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বনানী, ঢাকা