[ আ ন্ত র্জা তি ক ]
সত্য ভাষণ ও বিবেকের দংশন নির্বাসিত
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:১০
পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন এবং ১৯৭০-এ নির্বাচনোত্তর স্বাধিকারের আন্দোলন করেছিলেন আমাদের পূর্বসূরীরা। এ পর্বে সর্বস্তরের মানুষের চোখে রাজনীতি ছিল সকলের প্রার্থিত শক্তি আর রাজনীতিকগণ ছিলেন আশা ভরসার প্রতীক এবং সকলের নির্ভরতার আশ্রয়। স্বাধীনতা উত্তরকালে ধীরে-ধীরে রাজনীতির এই সূচীশুভ্র পোশাক খসে যেতে থাকে এবং ১৯৭৫-এর পর উলঙ্গ দশায় এসে দাঁড়ায়। এসময় থেকে প্রায় সকল ঘরানার রাজনীতিকদের চোখে দেশের সাধারণ মানুষ একান্ত মূর্খ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। প্রতিদিন তারা মঞ্চে বা তথ্য মাধ্যমে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার কণ্ঠে শিষ্ট-অশিষ্ট ভাষায় বিষোদ্গার করতে থাকেন। নিজেদের বিপক্ষে গেলে অতি সাধারণ সত্যকেও রাজনীতিকগণ কবুল করেন না। সত্য ভাষণ নির্বাসিত হয়। সত্যের অপলাপ করতে থাকেন নির্দ্বিধায়। এতে বিবেকের দংশন অনুভব করেন না। সুস্থ মানুষ আশা করে অন্তত পাঁচ বছর পর যেহেতু নিজেদের কল্পতরু থেকে আমাদের মহামহিম রাজনীতিকগণ ভোট ভিক্ষা করতে নেমে আসবেন তখন হয়তো সংযত হবেন। কৃত-অপকর্মের দায় স্বীকার করার মধ্যে মহত্ত্ব রয়েছে। এই মহত্ত্ব প্রদর্শন করে নিজেদের শুধরে চলার প্রতিশ্রুতি রেখে নির্বাচনের মাঠে নামলে তা মানুষের কাছে বরঞ্চ ইতিবাচক ধারা হিসেবেই গণ্য হতে পারতো। কিন্তু তেমন শোভন সংস্কৃতিতে আমাদের রাজনীতি ফিরতে পারবে তেমন আশা করার কোনো সুযোগ আছে কী?
এসব কথার পেছনে উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করতে চাইলে তো মহাভারত তৈরি হবে। তবুও প্রতীকী হিসেবে দু’-একটি অনেক চেনা তথ্য উপস্থাপন করা যায়। বিএনপি নেতাদের বোঝা উচিত ছিল হাওয়া ভবনের কলঙ্ক বিএনপি সাধারণ মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। সত্য ভাষণ হারিয়ে যাওয়ায় অবলীলায় সত্যভ্রষ্ট হচ্ছেন দলীয় নেতা নেত্রীরা। দলের স্বার্থ অথবা দলে নিজের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য কেউ আর এখন বিবেকের দংশন অনুভব করেন না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্য নেতাগণ এখন প্রায় নির্বাচনী প্রচারে নেমে গেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার বড় দাগে চোখে পড়ার মত উন্নয়ন কার্যক্রমে সাফল্য দেখাতে পেরেছে এতে সন্দেহ নেই। স্বাভাবিকভাবে বক্তৃতা-বিবৃতিতে সে সব প্রসঙ্গ প্রাধান্য পাচ্ছে। পাশাপাশি নানা ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও দলীয় সন্ত্রাসের বাড়বাড়ন্তের প্রসঙ্গ ব্লাক আউট করা হচ্ছে। কোনো বক্তৃতাতেই শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি রোধে সরকারের ব্যর্থতা, দোষীদের শাস্তি দিতে না পারা অথবা হলমার্ক কেলেঙ্কারির মত আর্থিক দুর্নীতির জন্য ব্যর্থতার দায় স্বীকার করার মত সত্য ভাষণ দিতে পারেননি আওয়ামী লীগ নেতা নেত্রীরা। শাসন না করে পদ্মা সেতু সংশ্লি¬ষ্ট দুর্নীতিবাজদের আড়াল করার চেষ্টা করেছেন প্রতিনিয়ত।
এভাবেই প্রতিদিন রাজনীতি থেকে সত্য হারিয়ে যাচ্ছে। বিবেকের দংশন কেউ যেন আর অনুভব করছেন না। এটি এখন এমন এক সংক্রামক ব্যাধি হয়ে গেছে যে জাতীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে স্থানীয় নানা ইউনিটেও তা সমপ্রসারিত হচ্ছে। একটি অতি সামপ্রতিক উদাহরণ দেয়া যায়। বিগত কয়েক মাস ধরে একটি ভীষণ অসুস্থ রাজনীতি চর্চা হচ্ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখনো তা পুরোপুরি থামেনি। ব্যক্তিগত ও শিক্ষক রাজনীতির কোনো কোনো ঘরানার স্বার্থে আঘাত লাগায় একজন নির্বাচিত ভিসির বিরুদ্ধে দুটো শিক্ষক গ্রুপ নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠ গুলজার করেছিলো। এরই এক পর্যায়ে ভিসি মহোদয়কে অত্যন্ত অমানবিকভাবে চারদিন বন্দী করে রাখা হয় নিজ অফিস কক্ষে। এতে নিন্দার ঝড় ওঠে চারদিকে। প্রচুর লেখালেখি হয় জাতীয় দৈনিকে। অবশেষে গত সপ্তাহে মোহাম্মদ জাফর ইকবালের একটি লেখা অনেকগুলো জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। সেখানে অনেক অকাট্য যুক্তি ছিল। আর ছিল মানবিক জায়গা থেকে করা কতগুলো সূতীক্ষ প্রশ্ন। আমার বিবেচনায় সেখানে বক্তব্য ও যুক্তি খণ্ডনের কিছু ছিল না। ক্যাম্পাসবাসীর মাথানত হয়েছিল। এমন এক সময়ে আমার এক সহকর্মী একটি তথ্য দিয়ে আমাকে বিস্মিত ও লজ্জিত করলেন। বললেন অমুক শিক্ষিকা এই লেখার জন্য ফেসবুকে জাফর ইকবালকে কঠিন সমালোচনা করেছেন। সমালোচনা যে কেউ করতেই পারেন। তবে যে যুক্তিতে সমালোচনা করেছেন তা শুনে আমি হোঁচট খেয়েছি। কারণ এই শিক্ষিকাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি। এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী ছিলেন। মেধাবী ও যুক্তিবাদী। আমার বিশ্বাসমতে তার এ ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করার কথা নয়। ধোঁয়াশা পরিষ্কার করে দিলেন আমার সহকর্মী। বললেন, তিনি তো আন্দোলনকারী শিক্ষক গ্রুপের একটির দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত। এবার অঙ্ক মিলে গেল। যত মেধা আর গুণ থাক না কেন নষ্ট রাজনীতি শেষ পর্যন্ত বিবেক কুরে খায়।
এই লেখাটি মুসাবিদা করার সময়ই আরেকটি রাজনৈতিক উগ্রতার খবর এলো। গত ১ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ পিটিয়েছে এক ছাত্রদল কর্মীকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতা হচ্ছে- যে দল সরকার গঠন করে সে দলের দাপুটেরা একাই দাবড়ে বেড়ায় ক্যাম্পাস। বিপক্ষ দল ক্যাম্পাসের ভেতর ম্রিয়মাণ থাকে। আহত ছাত্রদল কর্মীকে সাভারের এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ সময় ভিসি ও প্রভিসিদ্বয় ঢাকায় একটি সভায় যোগ দিতে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে হাসপাতালে দেখতে যান। এখানে ছাত্রদলের দাপট আছে। উত্তেজিত অনেক কর্মীর মুখোমুখি হন তারা। সকলকে বুঝিয়ে শান্ত করেন। আশ্বাস দেন দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার। তারপর আহত ছেলেটিকে দেখতে ভেতরে যান। ফিরে এসে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশেই গাড়িতে ওঠেন। হঠাত্ বিনামেঘে বজ্রপাতের মতই এক দু’জন ছাত্রদল কর্মী ইট ছুঁড়ে মারে। গাড়ির কাঁচ ভেঙ্গে ভিসি মহোদয়ের শরীরেও এসে পড়ে। অমন পরিস্থিতির বাস্তবতায় হঠাত্ উত্তেজিত হওয়ার কারণ ছিল না। আমার এক সাংস্কৃতিক কর্মী ছাত্রের বক্তব্য ক্যাম্পাসে ভিসি বিরোধী আন্দোলন যে দুই শিক্ষক গ্রুপ করছে তার একটি বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক গ্রুপ। ওদের ধারণা ভিসির গাড়িতে ঢিল ছোঁড়ার সাথে এই প্রেক্ষাপটেরও ভূমিকা থাকতে পারে। কারণ হিসেবে বলতে চাইছে ইতোমধ্যে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। আমার কাছে অবশ্য চিন্তাটিকে ছাত্রের অতি সরলীকরণ ধারণা বলে মনে হয়েছে।
এদেশের বিগত দিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে যতদূর তাকানো যাবে এ বিষয়টি স্পষ্ট হবে যে, রাজনীতিকদের হাতে জনগণ সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয়েছে। রাজনীতি আর নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে বহুল ব্যবহার হয়েছে ‘জনগণ’ শব্দটি। কিন্তু জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে রাজনীতিবিদগণ খুব কমই মূল্য দিয়েছেন। তারা শ্লোগান দিয়েছেন ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়—দলের চেয়ে দেশ বড়।’ কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দলগুলো ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। সুবিধার ভাগবাটোয়ারা পেয়েছেন দলীয় নেতারা। কর্মীরা কখনো এর ছিটেফোঁটা পেয়েছেন কখনো না পেয়েই অন্ধ মোহজালে জড়িয়ে প্রাণপাত করছেন। দেশ ও জনগণের দিকে তেমন করে কেউ ফিরে তাকায়নি। এই দেশ এবং দেশের মানুষ তো এসব ক্ষমতাশালী ও ক্ষমতাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে বস্তুগত কিছু চায় না; এরা চাঁদাবাজির অর্থের ভাগ চায় না, দখল করা খাসজমি, মার্কেট, নদী-খালের ভাগ চায় না। জনগণ চায় একটি নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুক রাজনৈতিক দলগুলো। এ জন্য কাউকে গণতন্ত্রের কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে না। নিজেদের শুধু পরিশুদ্ধ হতে হবে। অন্তরে হতে হবে দেশপ্রেমিক। ব্যক্তিপূজা, দলবন্দনা বাদ দেয়া যাবে না জানি, দলের প্রতি ভালবাসা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধ বিষয় নয়, তবে সবার আগে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক আচরণ তো ঘর থেকেই শুরু করতে হয়। কিন্তু সে চেষ্টা দু’তিন দশকে কি আমরা দেখেছি?
গণতন্ত্র প্রত্যাশী সাধারণ মানুষ কখনো সত্য প্রকাশে ভয় পায় না। তাই তারা রাজনৈতিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। সুযোগ পেলেই ব্যালটে জবাব দেয়। রাজনীতি সংশ্লি¬ষ্টদের মত দলীয় বৃত্তে বন্দী হয়ে চিন্তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে না। বিবেক বর্জিত হয়ে পড়ে না দলান্ধ হয়ে। দলীয় সিদ্ধান্ত নির্বিচারে গ্রহণ করে মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করে না। মুক্তচিন্তার বিবেকবান মানুষের তাই শেষ ভরসাস্থল সাধারণ মানুষের এই গণতান্ত্রিক বোধের শক্তি। প্রতিদিন বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-নেত্রীর পাল্টাপাল্টি বাকওয়াজ শুনতে শুনতে সাধারণ মানুষ বিরক্ত এবং ক্লান্ত। রাজনৈতিক লাভা-লাভের হিসেব কষতে গিয়ে কোনো পক্ষই যেন বিবেক দ্বারা চালিত হয়ে মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারছেন না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই নষ্ট রাজনীতির বলয় থেকে বেরুতে চায়। আমরা মনে করি নিজ নিজ রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের জনগণের আস্থায় ফিরে আসার জন্য চরিত্র পাল্টানো প্রয়োজন।
লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com