কিশোর অপরাধ এবং আমাদের করণীয়
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:১০
আজকের শিশু-কিশোররা আগামীদিনের সম্পদ। তাকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। উন্নত বিশ্বে শিশুদের কল্যাণ ও বিকাশের জন্য নানারকম পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের কারণে অধিকাংশ শিশুরই উপযুক্ত কোন পরিচর্যা করা হয় না। সমাজে সুষ্ঠু জীবনযাপন করার অধিকার প্রতিটি শিশুরই আছে। কেউ অপরাধী হয়ে জন্মায় না, পারিপার্শ্বিক পরিবেশে তাকে অপরাধী করে তোলে। একটি আদর্শ সমাজ গঠন করতে হলে সমাজের মানুষগুলোকে আগে আদর্শবান হতে হবে। নচেত্ সুন্দর ও সুষ্ঠু সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। সামাজিক আচরণকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার লক্ষ্যে সমাজের ব্যক্তিবর্গ সামাজিক আদর্শ গঠন করে থাকেন। প্রতিটি সমাজে আমরা দেখতে পাই, কিছু লোক আছে যারা সমাজের এসব আদর্শ ও মূল্যবোধকে মেনে চলে এবং কিছু লোক আছে যারা সেগুলোকে লংঘন করে। এসব ব্যক্তি সমাজের শান্তি ও ঐক্যকে ব্যাহত করে এবং এদেরকে বলা হয় অপরাধী। যখন অল্পবয়সী শিশু-কিশোররা এসব সামাজিক আদর্শকে লংঘন করে এবং অপরাধীর মত আচরণ করে তখন তাদের কিশোর আদালতের অধীনে বিচার করা হয়। এসব শিশু কিশোরকে বলা হয় কিশোর অপরাধী।
ক) এসব শিশুর মাঝে সমাজবিরোধী চিন্তা এবং প্রত্যক্ষণ লক্ষ্য করা যায় এবং তারা ব্যাপকভাবে ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপের সাথে জড়িত থাকে।
খ) মেজাজের দিক দিয়ে এরা আক্রমণাত্মক এবং উচ্ছৃংখল প্রকৃতির হয়ে থাকে।
গ) শারীরিকভাবে এরা শক্তিশালী হয়ে থাকে এবং এদের মাঝে দৃঢ়সংকল্প, সাহসী মনোভাব এবং আচরণ লক্ষ্য করা যায়।
ঘ) তারা পরিবার এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি অসহযোগিতামূলক এবং অনমনীয় হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে নতুন কোন কার্যক্রম সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন এবং বিরোধিতা করার প্রবণতা দেখা যায়।
ঙ) তাদের মধ্যে বিষণ্নতামূলক এবং অস্থির আবেগীয় ব্যক্তিত্বের লক্ষণ দেখা যায়। (উচ্চতর শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, বা.উ.বি.পৃষ্ঠা-১৫৫)
কিশোর অপরাধের কারণ: কিশোর অপরাধের জন্য বহুবিধ কারণ দায়ী। কোন নির্দিষ্ট কারণে অপরাধ সৃষ্টি হয় না। তবে অপরাধবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা অপরাধ বিশ্লেষণ করে যে প্রধান প্রধান কারণ আবিষ্কার করেছেন তা নিম্নরূপ-
(১) জৈবিক কারণ, (২) বংশগত কারণ, (৩) মনোবৈজ্ঞানিক কারণ, (৪) পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক কারণ, (৫) সামাজিক কারণ।
আমাদের করণীয়/অপরাধপ্রবণতা দূর করার উপায়: অপরাধ প্রবণতা যদিও একটি বয়সের ধর্ম, তবুও কোন মানুষ এই অপরাধকে সুনজরে দেখে না। তাই যতটা সম্ভব ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যাতে এ প্রবণতা সৃষ্টি না হতে পারে তার জন্য আমাদের আগে থেকেই সতর্ক থাকা উচিত। অপরাধ প্রবণতা দূর করার জন্য দু’ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন: ক) প্রতিরোধমূলক, খ) প্রতিকার বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা।
উপরের বর্ণিত অবস্থা বিবেচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্ত পৌঁছতে পারি যে, শিশুরা দেশ ও জাতির আগামী দিনের দর্পণ। আলোকবর্তিকা। তাদের উপর নির্ভর করে আছে আগামীদিনের ভবিষ্যত্। তাই তাদেরকে সঠিক যত্ন ও পরিচর্যা করে আমাদেরকে তৈরি করতে হবে। শিশুরা যেন নিজেদেরকে বিকশিত করার সবরকম সুযোগ পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তার মৌলিক চাহিদা মিটানোসহ জীবন গড়ার জন্য সুপরামর্শ ও সঠিক পথ নির্দেশ করতে হবে, তাহলেই একটি শিশু অপরাধী না হয়ে সমাজের একজন সুস্থ সরল মানুষ হিসেবে বসবাস করতে পারবে। তাই কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করছে-
“ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে,
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।”
লেখক :সিনিয়র শিক্ষক (মাধ্যমিক বিদ্যালয়), এম.এড শিক্ষার্থী ও গবেষক, বা.উ.বি. কুমিল্লা