আলোকপাত
মৃত্যুর বদ্বীপে বসবাস
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩০
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা (Ambassador Dan W Mozena) বলেছেন, সন্ত্রাসের অক্সিজেন হচ্ছে অর্থ। সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদকে রুখতে হলে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। সোমবার (২৬.০৮.২০১৩) ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে করা এই মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এখন প্রধান ঘটনা সন্ত্রাস। প্রায় সব মানুষ সারাক্ষণ দুষ্কৃতকারীদের ভয়ে থাকেন।
ঘটনার এই বিবরণ দিয়েছেন স্যার আর্থার কোনান ডোয়েল। ঘটনাস্থলকে তিনি ‘ভ্যালি অব ফিয়ার’ (ভয়ের উপত্যকা) আর ‘ভ্যালি অব ডেথ’ (মৃত্যুর উপত্যকা) বলেছেন। লিখেছেন, সেখানে মানুষের মাথার উপরে ভেসে থাকে যে ধোঁয়াশা, তারচেয়েও ঘন আর নিচু হয়ে থাকে খুন হওয়ার আশঙ্কা। ডোয়েল আরও লিখেছেন, সেখানে ‘সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত মানুষের মন ভরে থাকে ভয়ে।’ বাংলাদেশের পরিস্থিতির মতো শোনালেও এই বিবরণ এখানকার কোনও ঘটনার নয়। ‘ভ্যালি অব ফিয়ার’-এর পটভূমি ঔপনিবেশিক আমলের আমেরিকার এমন এক উপত্যকা, যেখানকার মানুষ সন্ত্রাসীদের ভয়ে কম্পমান থাকতেন শুধু রাতের বেলা(সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত)। কিন্তু আমাদের এই বদ্বীপে মানুষকে সন্ত্রস্ত থাকতে হয় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই। এ ভূখণ্ড এখন সত্যি এক ভয়ের বদ্বীপ, মৃত্যুর বদ্বীপ, সন্ত্রাসীদের এক অভয়াশ্রম।
আগে এদের বলা হতো ‘মস্তান’ বা ‘গুণ্ডা’। পাকিস্তানি আমলে প্রথমে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার কাজে এদেরকে ব্যবহার করতে শুরু করে। পরে অবস্থার চাপে অন্যান্য দলও গুণ্ডাবাহিনী গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। গুণ্ডা-মস্তানরাও দেখে, এতে তাদের বিরাট সুবিধা। সরকারি দলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে জেলে যাওয়ার ভয় নেই। বিরোধী দলের সঙ্গে যোগসূত্র রেখে কাজ করলে আরও লাভ। তখন পুলিশে ধরলেই নেতা হিসাবে পদোন্নতি, নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট দলের মনোনয়ন লাভের সুযোগ এবং কারও কারও ক্ষেত্রে মন্ত্রিত্বও।
মোটকথা, গুণ্ডা বা সন্ত্রাসী আর রাজনীতিবিদরা এখন পরস্পরের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, একে অন্যকে ছাড়া চলতে পারে না। এ ব্যাপারে বহুবার শোনা ও বলা একটা গল্প আবার স্মরণ করা যায়। একবার এক সামাজিক অনুষ্ঠানে দুই রাজনীতিবিদের দেখা। এদের একজন সরকারি এবং অন্যজন বিরোধী দলের। পরস্পরের প্রতি স্বাভাবিক সৌজন্য প্রকাশ করে তারা চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কথা শুরু করেন। কথায় কথায় একজন অনুযোগের সঙ্গে বললেন, ‘আপনাদের কর্মীদের কর্মকাণ্ড দেখে ডারউইনের বিবর্তনবাদের সত্যতা বোঝা যায়।’
শ্রোতা বুঝলেন, বক্তা তাদের তত্পরতাকে বাঁদরামো বলছেন। তিনিও ছেড়ে দেয়ার লোক নন। বললেন, ‘তা যা বলেছেন! তবে আপনাদের কাজ-কর্ম দেখে অবশ্য মনে হয় যে, বিবর্তনের প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি!’ স্বভাবে-চরিত্রে মানুষ যে তার ‘পূর্বপুরুষদের’ তুলনায় খুব একটা বদলায়নি, তা সত্য।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জেয়ার্ড ডায়মণ্ড (Jared Diamond) তার ‘তৃতীয় শিম্পাঞ্জীর উত্থান ও পতন’ (The Rise and Fall of the Third Chimpanzee) গ্রন্থে বলেছেন, গত ৭০ লাখ বছরের বিবর্তনের ফলে বানর ও মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে, তা ‘অতি সামান্য।’ তিনি জানান, গরিলা ও মানুষের জীন (gene)-এর ভিন্নতা মাত্র ২.৩ শতাংশ। বানর ও মানুষের ক্ষেত্রে তা আরও কম, শতকরা ১.৬ ভাগ।
সমাজ বা ‘ধর্ম’ এবং রাজনীতির দায়িত্ব হচ্ছে এই পাশবিক প্রবণতাকে দমন করে রাখা। নিজেদেরকে মানুষ পদবাচ্য করতে হলে তা করতেই হবে। শুধু তখনই বলা যাবে যে, আমরা পশু নই, বর্বর নই। বলা যাবে, আমরা মানুষ, সভ্য মানুষ। সত্যিকারের সভ্য জগত্ কেমন, এক প্রাচীন কবি তা বলে গেছেন। বলেছেন, সেখানে গয়না পরা সুন্দরীরাও মধ্যরাতে একা-একা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন। আমরা অতটা আশা করি না। আমাদের আশা একেবারেই সামান্য। রাজনীতিবিদ আর তাদের সমর্থকরা যেন বানর অভিধা বর্জন করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের কোনও উত্তরসূরীকে যেন অনুযোগ করতে না হয় যে, বঙ্গজননী তার সন্তানদেরকে বানর করে রেখেছেন, মানুষ করেননি।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
arunsarkarbd@yahoo.com